ক্যানসার সংক্রামক নয়, এটাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু প্রকৃতি মাঝে মাঝেই ব্যতিক্রমের নজির গড়ে। এবার বিজ্ঞানীরা এমনই এক বিরল ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে কোনও ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী নয়, ক্যানসারের জীবিত কোষই এক মাছ থেকে অন্য মাছে ছড়িয়ে পড়ছে।
'নেচার' পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণা ক্যানসার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশ্বাস, এই ক্যানসার মানুষের জন্য কোনও ঝুঁকি তৈরি করে না।
মিষ্টি জলের মাছে প্রথম সংক্রামক ক্যানসার
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট ও কানাডার কুইবেকের সীমান্তে অবস্থিত লেক মেমফ্রেমাগগ। এই হ্রদে বসবাসকারী ব্রাউন বুলহেড ক্যাটফিশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসার দেখা যাচ্ছিল।
প্রথমে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, প্রতিটি মাছের শরীরে আলাদাভাবে ক্যানসার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আক্রান্ত মাছের টিউমার ও সুস্থ টিস্যুর ডিএনএ বিশ্লেষণ সেই ধারণা বদলে দেয়।
গবেষকেরা দেখেন, বিভিন্ন মাছের টিউমারে একই ধরনের বিপুল জিনগত পরিবর্তন রয়েছে, অথচ সেই পরিবর্তন তাদের সুস্থ কোষে নেই। অর্থাৎ, প্রতিটি মাছে নতুন করে ক্যানসার তৈরি হয়নি। বরং বহু আগে তৈরি হওয়া একটি ক্যানসার কোষের বংশধারা এক মাছ থেকে অন্য মাছে ছড়িয়ে আজও টিকে রয়েছে। এটিই বিশ্বের প্রথম মিষ্টি জলের মাছে সংক্রামক ক্যানসারের প্রমাণ।
ব্রাউন বুলহেড ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত
সংক্রামক ক্যানসার আসলে কী?
সাধারণ ক্যানসারে শরীরের নিজের কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটে এবং সেই কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে টিউমার তৈরি করে। কিন্তু সংক্রামক ক্যানসারের ক্ষেত্রে ক্যানসারের জীবিত কোষই একটি প্রাণীর শরীর ছেড়ে অন্য প্রাণীর শরীরে গিয়ে বেঁচে থাকে এবং সেখানেই নতুন টিউমার তৈরি করে। অর্থাৎ, এখানে সংক্রমণের জন্য কোনও জীবাণুর প্রয়োজন হয় না। ক্যানসারের কোষই সংক্রমণের বাহক।
প্রকৃতিতে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর আগে শুধু কুকুর, তাসমানিয়ান ডেভিল এবং কয়েকটি সামুদ্রিক শামুকজাতীয় প্রাণীতে এমন ক্যানসারের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল একটি মিষ্টি জলের মাছ।
কীভাবে ছড়াচ্ছে এই ক্যানসার?
এর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও অজানা। তবে গবেষকদের ধারণা, প্রজনন মরশুমে মাছগুলো যখন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে, তখন জীবিত ক্যানসার কোষ এক মাছ থেকে অন্য মাছে চলে যেতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হল, জলে ভেসে থাকা ক্যানসার কোষ। মাছ ত্বক, ফুলকা ও মুখ দিয়ে অনবরত জল নেয় আর ছাড়ে। ফলে জলের সঙ্গে ক্যানসার কোষও অন্য মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
হ্রদের তলদেশের পলিতেও কিছু সময় এই কোষ বেঁচে থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। যেহেতু ব্রাউন বুলহেড ক্যাটফিশ তলদেশে বাস করে এবং তাদের শরীরে আঁশ নেই, তাই সেখান থেকেও সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এসবই এখনও অনুমান। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কতটা ভয়ের? ছবি: সংগৃহীত
মাছের জন্য কতটা ভয়াবহ?
২০১২ সালে প্রথম এই ক্যানসারের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে, ২০১৫ সালে, লেক মেমফ্রেমাগগের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্রাউন বুলহেড ক্যাটফিশে রোগের লক্ষণ দেখা যায়।
তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে সংক্রামক ক্যানসারের আচরণ এক নয়।
তাসমানিয়ান ডেভিলের সংখ্যা এই রোগে ভয়াবহভাবে কমে গেলেও কুকুরের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগটি নিজে থেকেই সেরে যায়। এখন বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন, একই ক্যানসার উত্তর আমেরিকার অন্য মিষ্টি জলের হ্রদেও ছড়িয়েছে কি না।
আমাদের কি ভয়ের কারণ রয়েছে?
উত্তর, না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অন্যের জীবিত কোষকে দ্রুত ফরেন বডি হিসেবে শনাক্ত করে ধ্বংস করে দেয়। তাই সাধারণ পরিস্থিতিতে একজন মানুষের ক্যানসার অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে না।
গবেষণায় আরও নিশ্চিত হয়েছে, এই রোগের পেছনে কোনও ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী নেই। ক্যানসারের কোষই এখানে সংক্রমণের একমাত্র উৎস। ফলে এটি কোনও নতুন সংক্রামক রোগ নয়, বরং প্রকৃতির এক অত্যন্ত বিরল জৈবিক ব্যতিক্রম।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?
এই আবিষ্কার শুধু একটি বিরল ক্যানসারের গল্প নয়। এটি বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্নও তুলে ধরেছে। ক্যানসার কীভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে? কীভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়? আর কীভাবেই বা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে বেঁচে থাকতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পারলে ভবিষ্যতে ক্যানসারের বিবর্তন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। পাশাপাশি, মিষ্টি জলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও এই গবেষণা নতুন দিশা দেখাতে পারে।
