লিভারের রোগ বেশিরভাগ সময়ই চুপিসারে বাসা বাঁধে। ব্যথা বা বড় কোনও উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই শরীর ছোট ছোট কিছু সংকেত পাঠাতে শুরু করে। চোখের রং বদলে যাওয়া, হাতের তালু লাল হয়ে ওঠা, অকারণে চুলকানি বা সহজেই কালশিটে পড়া, এমন কিছু পরিবর্তনই হতে পারে লিভারের অসুখের প্রথম সতর্কবার্তা। তাই এই লক্ষণগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
লিভারের রোগ কেন নীরব ঘাতক?
লিভারকে বলা হয় শরীরের 'নীরব অঙ্গ'। কারণ, লিভার অনেকটা ক্ষতি হওয়ার পরও দীর্ঘদিন নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে ফ্যাটি লিভার, ভাইরাল হেপাটাইটিস বা লিভার সিরোসিসের মতো রোগ অনেক সময় বেশ দেরিতে ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই শরীর হাত, চোখ ও ত্বকের মাধ্যমে কিছু সূক্ষ্ম সংকেত দিতে শুরু করে। সেই লক্ষণগুলো সময়মতো চিনতে পারলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
শুরুতেই ধরা পড়লে কমে রোগের জটিলতা। ছবি: সংগৃহীত
শরীরের অন্যতম কর্মব্যস্ত অঙ্গ
শুধু খাবার হজমই নয়, শরীরের ৫০০-রও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত লিভার। রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে বের করা, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি, পিত্তরস উৎপাদন এবং ভিটামিন ও খনিজ সঞ্চয়, সবই এই একটি অঙ্গের দায়িত্ব। তাই লিভারের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে গোটা শরীরেই পড়ে।
কোন লক্ষণগুলো আপনাকে সতর্ক করবে?
চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
চোখের সাদা অংশ বা ত্বকে হলুদ আভা দেখা দিলে তা জন্ডিসের লক্ষণ হতে পারে। লিভার ঠিকমতো বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলেই এমনটি হয়। এটি লিভারের গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
কোনও কারণ ছাড়াই যদি হাতের তালু দীর্ঘদিন লালচে থাকে, সেটি পালমার এরিথেমা হতে পারে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস, সিরোসিস বা গুরুতর ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু এই লক্ষণ দেখেই লিভারের রোগ নিশ্চিত করা যায় না। গর্ভাবস্থা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসেও এমন হতে পারে। তাই অন্য উপসর্গ থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
সমস্যা হতে পারে গভীরে। ছবি: সংগৃহীত
অকারণে তীব্র চুলকানি
ত্বকে কোনও র্যাশ নেই, অথচ হাতের তালু, পায়ের পাতা বা শরীরের বিভিন্ন অংশে অসহ্য চুলকানি হচ্ছে? এর পেছনেও লিভারের সমস্যা থাকতে পারে। লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে পিত্তলবণ জমে গিয়ে এমন চুলকানি হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি রাতে বেড়ে যায় এবং ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটায়।
সহজেই কালশিটে পড়া
সামান্য ধাক্কাতেই শরীরে কালশিটে পড়ে যাচ্ছে বা কোনও আঘাত ছাড়াই নীলচে দাগ দেখা দিচ্ছে? লিভার রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করে। সেই ক্ষমতা কমে গেলে সহজেই রক্তক্ষরণ বা কালশিটে পড়তে পারে।
ত্বক ও নখেও মিলতে পারে ইঙ্গিত
লিভারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় আরও কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যেমন—
- নখ অস্বাভাবিক সাদা হয়ে যাওয়া
- আঙুলের ডগা মোটা হয়ে যাওয়া
- মুখ, গলা বা বুকে মাকড়সার জালের মতো সূক্ষ্ম রক্তনালি দেখা দেওয়া
- ত্বক অকারণে কালচে হয়ে যাওয়া
এই লক্ষণগুলো একা লিভারের রোগের প্রমাণ নয়। তবে একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সামান্য আঘাতেই! ছবি: সংগৃহীত
কখন আর অপেক্ষা নয়?
উপরের কোনও লক্ষণের সঙ্গে যদি দীর্ঘদিন ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব, পেট বা পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাব গাঢ় হলুদ রঙের হওয়া বা মল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
ফ্যাটি লিভার, ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং দীর্ঘদিনের মদ্যপানের কারণে হওয়া লিভারের রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক লিভার ফাংশন টেস্ট, আলট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
লিভারকে ভালো রাখার সহজ উপায়
সুস্থ লিভারের জন্য খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই। সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন, নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা কোনও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না। যাঁদের ফ্যাটি লিভার, স্থূলতা বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
অবহেলায় বাড়ে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
শরীরের ছোট সংকেত, বড় সতর্কবার্তা
লিভারের রোগ শুরুতেই খুব কমই জানান দেয়। তাই চোখ, হাত বা ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে তুচ্ছ ভাববেন না। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করলে ফ্যাটি লিভার, ভাইরাল হেপাটাইটিসসহ অনেক লিভারের রোগকেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
