বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ওবেসিটি বা স্থূলতা। সারা বিশ্ব এখন স্থূলতার খপ্পরে। চলছে স্থূলতার মহামারী। ভারতও তার ব্য়তিক্রম নয়। সামনে এল এক অস্বস্তিকর তথ্য। আজ বিশ্ব স্থূলতা দিবসে ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশন প্রকাশিত 'ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি অ্য়াটলাস ২০২৬' অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুর নিরিখে এখন চিনের পরেই রয়েছে ভারত! দেশে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি ৪ কোটিরও বেশি শিশু ও কিশোর স্থূলতায় আক্রান্ত। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হারে শিশুদের স্থূলতার হার বাড়ছে, বিশেষজ্ঞদের মতে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশনের এই তথ্য় দেশের জনস্বাস্থ্য়কে ঠেলে দিচ্ছে নতুন এক চ্যালেঞ্জের দিকে।
ওবেসিটির অন্য়তম কারণ সেডেন্টারি লাইফস্টাইল। ছবি: সংগৃহীত
দ্রুত বদলাচ্ছে চিত্র
একসময় ভারতের মূল লড়াই ছিল অপুষ্টির বিরুদ্ধে। এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। অপুষ্টি ও অতিপুষ্টি, দুই সমস্যাই একসঙ্গে দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের হিসেবে ভারতে ৫–১৯ বছর বয়সী ৪১.৩২ মিলিয়ন (৪ কোটিরও বেশি) শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত। তার মধ্যে—
৫–৯ বছর বয়সী শিশু: ১৪.৯২ মিলিয়ন (প্রায় দেড় কোটি)
১০–১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী: ২৬.৪০ মিলিয়ন (২ কোটি ৬৪ লক্ষ)
বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুদের স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য় মাত্রা রাখা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এখন পরবর্তী লক্ষ্য ২০৩০ সাল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জন্য অনেক বেশি কঠোর পদক্ষেপ ও নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি
শিশুদের স্থূলতা শুধু বাড়তি ওজনের বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যতে একাধিক জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে একাধিক মেটাবলিক ডিজিজ দ্রুত বাড়বে।
- মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ, যা আগে ফ্যাটি লিভার নামে পরিচিত ছিল, ৮.৩৯ মিলিয়ন (৮৩ লক্ষ ৯ হাজার) থেকে বেড়ে ১১.৮৮ মিলিয়নে (প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ) পৌঁছাতে পারে।
- উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, ৬ মিলিয়নের (৬০ লাখ) বেশি শিশুকে প্রভাবিত করতে পারে।
- উচ্চ রক্তচাপ প্রায় ৪.২১ মিলিয়ন (৪২ লাখ) শিশুর মধ্যে দেখা যেতে পারে।
- হাইপারগ্লাইসেমিয়া, যা ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সংকেত, প্রায় ২০ লাখ তরুণকে আক্রান্ত করতে পারে।
যে অসুখগুলো একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন কম বয়সেই ধরা পড়ছে।
ছবি: সংগৃহীত
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
গবেষকদের মতে, একক কোনও কারণ নয়, জীবনযাপন ও পরিবেশগত পরিবর্তন একসঙ্গে ইন্ধন জোগাচ্ছে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১১–১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর রয়েছে শরীরচর্চায় অনীহা।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন: চিনি-যুক্ত পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, যেমন ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুডের প্রতি শিশুদের ঝোঁক বাড়ছে।
স্কুলে পুষ্টিকর খাবারের সীমাবদ্ধতা: মাত্র ৩৫.৫ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায়।
প্রাথমিক পুষ্টির ঘাটতি: প্রায় ৩২.৬ শতাংশ শিশু যথাযথ মাতৃদুগ্ধ পায় না।
মাতৃস্বাস্থ্যজনিত কারণ: প্রজননক্ষম ১৩.৪ শতাংশ নারীর বিএমআই বেশি এবং ৪.২ শতাংশ টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে ওজন বৃদ্ধি ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
স্থূলতায় লুকিয়ে একাধিক রোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
সমাধান কোন পথে?
পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া এবং অল ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সিং রিসার্চ ইন ওবেসিটি-র মতো সংস্থাগুলি বলছে, এই প্রবণতা থামাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি–
- চিনি-যুক্ত পানীয় থেকে শিশুদের দূরে রাখা। প্রয়োজনে এ ধরনের পানীয়ে কর আরোপ করা যেতে পারে।
- কমাতে হবে ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুডের প্রতি আসক্তি। শিশুদের টার্গেট করে জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপনে দরকার কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
- প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্থূলতাকে অবহেলা করা চলবে না।
- শিশুরা বাড়ির পাশাপাশি যাতে স্কুলেও সঠিকমাত্রায় পুষ্টিকর খাবার পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- ছোট থেকেই শরীরচর্চাকে অভ্য়েসে পরিণত করতে হবে।
মূল লক্ষ্য একটাই, স্থূলতা প্রতিরোধ। কারণ শৈশবের স্থূলতা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে তা সারাজীবন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
