গরমের ছুটি মানেই একসময় ছিল মাঠে খেলা, সাইকেল চালানো বা বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে মোবাইল, ট্যাব ও ল্যাপটপ। সকাল থেকে রাত— গেমিং, সোশাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং বা অনলাইন ক্লাসে ডুবে থাকছে নতুন প্রজন্ম। দেখতে নিরীহ অভ্যাস মনে হলেও এর নিঃশব্দ প্রভাব পড়ছে মেরুদণ্ডে।
চিকিৎসকদের মতে, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে ‘টেক্সট নেক’ নামে পরিচিত এক ধরনের সমস্যা, যার মূল কারণ দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
কী এই ‘টেক্সট নেক’?
মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করার সময় অধিকাংশ মানুষই অজান্তে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখেন। এই ভঙ্গি দীর্ঘ সময় বজায় থাকলে ঘাড় ও উপরের মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টেক্সট নেক’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের মাথার ওজন প্রায় ১০ থেকে ১২ পাউন্ড। কিন্তু মাথা যত নিচের দিকে ঝুঁকে যায়, ঘাড়ের উপর সেই ওজনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, স্মার্টফোন দেখার সময় মাথা বেশি নিচু হলে ঘাড়কে প্রায় ৬০ পাউন্ড পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ বহন করতে হতে পারে।
মোবাইলে ডুব! ছবি: সংগৃহীত
কেন বেশি ঝুঁকিতে কিশোর-কিশোরীরা?
শিশু ও কিশোরদের শরীর তখনও বেড়ে ওঠার পর্যায়ে থাকে। হাড়, পেশি ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন তৈরি হওয়ার এই সময়েই যদি দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
বর্তমানে অর্থোপেডিক ক্লিনিকগুলিতে এমন অনেক কিশোর আসছে, যাদের ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধ ঝুঁকে যাওয়া, মাথাব্যথা, উপরের পিঠে অস্বস্তির সমস্যা দেখা যাচ্ছে। একসময় যেসব সমস্যা মধ্যবয়স বা বৃদ্ধ বয়সে দেখা যেত, সেগুলিই এখন কম বয়সিদের মধ্যেও ধরা পড়ছে।
শুধু ঘাড় নয়, প্রভাব পড়ছে গোটা শরীরে
ভুল অঙ্গবিন্যাসের প্রভাব শুধুমাত্র মেরুদণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে কুঁজো হয়ে বসে থাকলে শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। কমে যেতে পারে মনোযোগের ক্ষমতা। এমনকী ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ফলে ক্লান্তি, পেশির টান এবং দৈনন্দিন কাজে অস্বস্তি বাড়তে থাকে।
ছুটির দিনেই বাড়ছে বিপদ
স্কুল খোলা থাকলে কিছুটা হলেও শারীরিক নড়াচড়া হয়। কিন্তু ছুটির সময় অনেক শিশুই দিনের বড় অংশ ঘরের ভেতরে কাটায়। মোবাইল হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা, সোফায় কুঁজো হয়ে বসা বা ভুল ভঙ্গিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখা— এই অভ্যাসগুলো সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। পাশাপাশি কমে যাচ্ছে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা।
এই অভ্যাসই ডেকে আনছে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
সমাধান রয়েছে সহজ অভ্যাসেই
প্রযুক্তি আজকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই স্ক্রিন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে ব্যবহার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তনই বড় সুরক্ষা দিতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, মোবাইল বা ট্যাব যতটা সম্ভব চোখের সমতলে ধরে ব্যবহার করা উচিত। একটানা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর উঠে দাঁড়ানো, হাঁটাচলা করা এবং শরীর স্ট্রেচ করা জরুরি। পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু সময় মাঠে খেলা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বা হাঁটার মতো শারীরিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা প্রয়োজন।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
যদি ঘন ঘন ঘাড়ে ব্যথা হয়, কাঁধে টান অনুভূত হয়, মাথাব্যথা বাড়ে, শরীর কুঁজো হয়ে যেতে শুরু করে বা পিঠে অস্বস্তি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। এগুলি টেক্সট নেক বা অঙ্গবিন্যাসজনিত সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
প্রযুক্তির যুগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও স্বাস্থ্যকর স্ক্রিন-অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে মেরুদণ্ড অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
