ডায়াবেটিস আক্রান্ত অনেকেই প্রতিদিন নিতে হয় ইনসুলিন। দিনের পর দিন বারবার সূচ ফোটানো, খাবারের হিসাব রাখা, রক্তে শর্করার ওঠানামা সামলানো— সব মিলিয়ে এই লড়াই অনেকের কাছেই মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। তবে চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন সেই অভিজ্ঞতাই বদলাতে শুরু করেছে। ইনসুলিন পাম্প নামের ছোট্ট একটি যন্ত্র অনেক রোগীর কাছে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে আগের তুলনায় সহজ ও স্বস্তিদায়ক করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগী, যাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ খুব বেড়ে যায় বা কমে যায় বা যাঁরা প্রতিদিন একাধিক ইনজেকশন নিতে নিতে ক্লান্ত— তাঁদের জন্য ইনসুলিন পাম্প কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
ইনসুলিন পাম্প হল শরীরে থাকা ছোট একটি যন্ত্র, যা ত্বকের নিচে লাগানো সরু নলের মাধ্যমে সারাক্ষণ অল্প অল্প করে ইনসুলিন শরীরে পৌঁছে দেয়। এর কাজ অনেকটাই শরীরের স্বাভাবিক ইনসুলিন নিঃসরণের মতো।
নির্দিষ্ট সময় অন্তর জরুরি পরীক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
এই পাম্প সাধারণত দু-ভাবে ইনসুলিন দেয়। সারাদিন অল্প পরিমাণে যে ইনসুলিন দেওয়া হয়, সেটিকে বলা হয় বেসাল ইনসুলিন। আর খাবারের আগে বা পরে অতিরিক্ত যে ডোজ প্রয়োজন হয়, তাকে বলা হয় বোলাস ইনসুলিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনসুলিন পাম্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি ইনসুলিনের মাত্রা আরও নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ফলে রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠানামা কিছুটা কমানো সম্ভব হয়।
কীভাবে কাজ করে এই পাম্প?
পাম্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি নরম প্লাস্টিকের নল। একটি ছোট সূচের সাহায্যে সেই নল ত্বকের নিচের চর্বিযুক্ত অংশে বসানো হয়— সাধারণত পেট বা বাহুতে। পুরো ব্যবস্থাটিকে বলা হয় ইনফিউশন সেট।
বর্তমানে অনেক আধুনিক ইনসুলিন পাম্প কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর (সিজিএম)-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এই ডিভাইস সারাক্ষণ রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। কিছু উন্নত পাম্প আবার সেই তথ্য অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিনের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, এতে সুগার হঠাৎ খুব কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং রোগী তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারেন।
ইনসুলিন ইনজেকশন। ছবি: সংগৃহীত
ইনজেকশনের তুলনায় কি বেশি সুবিধাজনক?
ইনসুলিন ইনজেকশন এবং পাম্প— দুটোই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। তবে কোনটি কার জন্য ভালো হবে, তা নির্ভর করে জীবনযাপন, শারীরিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের উপর।
অনেক রোগীর কাছে ইনসুলিন পাম্প স্বস্তিদায়ক, কারণ এতে বারবার সূচ ফোটানোর প্রয়োজন কমে যায়। পাশাপাশি খাবার, ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে মিলিয়ে ইনসুলিনের মাত্রা সহজে পরিবর্তন করা যায়।
বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন, অথবা যাঁদের হজমজনিত সমস্যা রয়েছে— তাঁদের জন্য পাম্প বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইনসুলিন পাম্প একবার লাগিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। এটি ব্যবহার করলেও নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা জরুরি।
ইনসুলিন পাম্প। ছবি: সংগৃহীত
যদি পাম্পে কোনও ত্রুটি হয় বা নল ব্লক হয়ে যায়, তাহলে শরীরে ইনসুলিন পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে দ্রুত রক্তে শর্করা বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (ডিকেএ)-এর মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া ইনসুলিন পাম্প তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হয়। তারপরও চিকিৎসকদের মতে, ইনসুলিন পাম্প ও সিজিএম-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সহজ করে তুলছে।
অনেক রোগীর কাছে এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং প্রতিদিনের চাপ ও দুশ্চিন্তা কিছুটা কমিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করার একটি নতুন সম্ভাবনা।
