প্রচণ্ড গরম মানেই শুধু ঘাম, ক্লান্তি বা হিটস্ট্রোক নয়। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, দীর্ঘ সময় তাপপ্রবাহের মধ্যে থাকলে শরীরের হাড়, পেশি, সন্ধিস্থল এবং চলাফেরার ক্ষমতার উপরও মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ, আর্থারাইটিস রোগী এবং যাঁদের হাড় বা সন্ধিস্থলের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেকটাই বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে দ্রুত জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরে তৈরি হয় ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা, যা সরাসরি পেশির কার্যক্ষমতা এবং জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়াকে প্রভাবিত করে।
চড়ছে তাপমাত্রার পারদ। ছবি: সংগৃহীত
সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট কমে গেলে দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। যেমন—
- হঠাৎ পেশিতে টান
- শরীরে দুর্বলতা
- হাঁটাচলায় অস্বস্তি
- শরীরে ব্যথা
- সন্ধিস্থল শক্ত হয়ে যাওয়া
- ভারসাম্য হারানোর প্রবণতা
চিকিৎসকদের বক্তব্য, ডিহাইড্রেশনের কারণে জয়েন্টের স্বাভাবিক লুব্রিকেশনও কমে যেতে পারে। ফলে যাঁদের আগে থেকেই আর্থারাইটিস বা জয়েন্ট ক্ষয়ের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যথা ও আড়ষ্টভাব আরও বাড়তে পারে।
কেন বাড়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি?
তীব্র গরমে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে, মনোযোগ কমে যায়। এর ফলে অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের পড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকেই মচকানো, লিগামেন্ট ইনজুরি এমনকী ফ্র্যাকচারের মতো গুরুতর সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই বিপদ আরও বেশি। কারণ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব, পেশির শক্তি এবং শরীরের ভারসাম্য স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। তার উপর চরম গরমে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়লে সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
শুধু হিটস্ট্রোক নয়, কাহিল জয়েন্ট ও পেশি! ছবি: সংগৃহীত
কারা সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকবেন?
এই গরমে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
- প্রবীণ মানুষ
- আর্থারাইটিস রোগী
- অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
- রোদে কাজ করেন যাঁরা
- নির্মাণ শ্রমিক
- খেলোয়াড় ও শরীরচর্চা করেন যাঁরা
- ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষেরা
গরমে কি বাড়তে পারে আর্থারাইটিসের সমস্যা?
আর্থারাইটিস রোগীদের কথায়, প্রচণ্ড গরমে তাঁদের জয়েন্টের ব্যথা ও শক্তভাব বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিহাইড্রেশন জয়েন্টের সমস্যা বাড়ায়, ফলে নড়াচড়ার সময় অস্বস্তি বাড়ে। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমে শরীরে চাপ বাড়লে প্রদাহও বাড়তে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময় এসিতে বসে থাকা ও কম শারীরিক নড়াচড়ার কারণেও পেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে।
জরুরি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
- সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করুন
- শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখুন
- দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলুন
- হালকা ও সুতির পোশাক পরুন
- মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিন
- হালকা স্ট্রেচিং বা শরীরচর্চা করুন
- ফল, ডাবের জল, টক দই ও শাকসবজি বেশি খান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বারবার পেশিতে টান, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা হাঁটতে সমস্যা হয়, তাহলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছরই বাড়ছে হিটওয়েভের প্রকোপ। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে শরীরের উপর এর প্রভাবও। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন চরম গরমে থাকলে শুধু শরীর ক্লান্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পেশির শক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য, জয়েন্টের কার্যক্ষমতা এবং শরীরের ভারসাম্যও। তাই এই গরমে শুধু বাইরে বেরনো কমালেই হবে না, শরীরকে ভেতর থেকেও সুস্থ ও হাইড্রেটেড রাখা জরুরি।
