এক যুগ আগে ত্রাসের নাম ছিল ‘ব্লু হোয়েল’। সময়ের চাকা ঘুরলেও মরণখেলার নেশা যে কাটেনি, সম্প্রতি গাজিয়াবাদের তিন কিশোরীর মৃত্যু তার প্রমাণ। দশ তলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে তিন বোনের রহস্যমৃত্যু ফের সামনে আনল ডিজিটাল আসক্তির কঙ্কালসার রূপ। ১২, ১৪ এবং ১৬ বছরের তিন কিশোরীর এই চরম সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আদতে কী তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। যদিও মেয়েগুলির বাবা চেতন কুমার ‘কোরিয়ান গেম’-এর আসক্তিকেই দায়ী করছেন।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি ডায়েরি ও সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে। সেখানে লেখা ছিল, ‘মাম্মি, পাপা সরি’। পুলিশি তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনার রাতে মই বেয়ে বারান্দায় উঠেছিল তারা। প্রতিবেশীরা রাত সোয়া দুটো নাগাদ তাদের পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখেন। বাবা চেতন কুমারের দাবি, ওই দিনই ছিল গেমটির ‘ফাইনাল টাস্ক’। মনোবিদদের মতে, এই ধরনের গেমে এক প্রকার ‘বীরত্ব’ কাজ করে, যেখানে মৃত্যুকেও তুচ্ছ মনে হয়।
উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোট
এই ভয়াবহ প্রবণতা নিয়ে পাভলভ ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই প্রবণতা বর্তমানে ভয়ংকর আকার নিতে শুরু করেছে। একে বলা হচ্ছে ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’। ইমপালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার-এর স্প্রেকটামের মধ্যেই পড়ে। ডা. বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যায়, কিশোর-কিশোরীরা তীব্র উত্তেজনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি নিস্তেজ হয়ে শুধু গেমের জয়ের উন্মাদনা কাজ করছে। যা চাই তাই পেয়ে যাওয়ার অভ্যেস থেকে ‘না পাওয়া’ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে আজকের প্রজন্ম। জীবনের কোনও সুদূর লক্ষ্য না থাকায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনা না পেলে তারা মৃত্যুকে সহজ বিকল্প হিসেবেই বেছে নিচ্ছে।
প্রতীকী ছবি
ডা. বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি দায়ি করেছেন অভিভাবকদের ‘অজ্ঞতাজনিত প্রশ্রয়’কে। সেই সঙ্গে আঙুল তুলেছেন মুনাফালোভী কর্পোরেট বিশ্ব ও রাষ্ট্রের নির্লিপ্ত ভূমিকার দিকে। তিনি মনে করেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে রাষ্ট্র আজ নতিস্বীকার করে আছে, তাই তারা কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আনছে না। এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। মাধ্যমিকের আগে সন্তানদের হাতে কোনওভাবেই স্মার্টফোন দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করে কঠোর আইন প্রণয়নই এখন একমাত্র পথ। বিশ্বজুড়ে আকর্ষণের কেন্দ্রে আসার এই অসুস্থ আকাঙ্ক্ষা রুখতে না পারলে আগামী প্রজন্ম আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা।
