ডিজিটাল যুগে কলম আর খাতার জায়গা দখল করেছে কিবোর্ড, ট্যাব আর টাচস্ক্রিন। অফিসের নোট থেকে ক্লাসরুমের পড়া, সব কিছুই এখন দ্রুত টাইপ করে ফেলার অভ্যাস। কিন্তু প্রযুক্তির এই গতির মাঝেই গবেষণা বলছে, হাতে লেখার অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে সক্রিয় করে, যা টাইপিং করতে পারে না।
২০২৪ সালে নরওয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যাড্রে এল. এইচ. ভ্যান ডার মেয়ার প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হাতে লেখা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনেক বেশি ও সক্রিয় সংযোগ তৈরি করে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি জার্নালে।
হাতের লেখায় সচল মস্তিষ্ক। ছবি: সংগৃহীত
কী বলছে গবেষণা?
৩৬ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উপর এই গবেষণা চালানো হয়। তাঁদের একদলকে ডিজিটাল পেন দিয়ে হাতে লিখতে বলা হয়, অন্যদল একই শব্দ কিবোর্ডে টাইপ করেন। হাই-ডেনসিটি ইইজি স্ক্যানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মনোযোগ, ভাষা বোঝা, স্মৃতি, শারীরিক নড়াচড়া ও দৃশ্যগত উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো বেশি কাজ করছিল।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, হাতের লেখার সময় থিটা ও আলফা ব্রেন ওয়েভের কার্যকলাপ বাড়ে। এই ব্রেন ওয়েভগুলো শেখা, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ, হাতে লেখা শুধু তথ্য লিখে রাখা নয়, বরং মস্তিষ্ককে আরও গভীরভাবে তথ্য গ্রহণ ও মনে রাখতে সাহায্য করে।
টাইপিংয়ের পাশাপাশি হাতের লেখার অভ্যাসও থাকুন। ছবি: সংগৃহীত
কেন হাতের লেখা এত কার্যকর?
হাতে লেখা একটি জটিল শারীরিক ও মানসিক প্রক্রিয়া। লিখতে গেলে একসঙ্গে কাজ করে-
- চোখের দৃষ্টি
- আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া
- হাতের নিয়ন্ত্রণ
- স্পর্শের অনুভূতি
- প্রতিটি অক্ষরের গঠন তৈরি করার ক্ষমতা
এই পুরো প্রক্রিয়া মস্তিষ্কে তৈরি করে 'সেন্সরিমোটর' সংযোগ। ফলে মস্তিষ্ক একই সঙ্গে অনুভব করে, দেখে এবং নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যদিকে, টাইপিংয়ে বেশিরভাগ সময় একই ধরনের বোতাম চাপার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সেখানে অক্ষরের গঠন তৈরি করার কাজ থাকে না। তাই মস্তিষ্কের সক্রিয়তাও তুলনামূলক কম হয়।
শেখার ক্ষেত্রে হাতের লেখার গুরুত্ব
গবেষকদের মতে, হাতে লেখার ধীর গতি আসলে একটি বড় সুবিধা। কারণ ধীরে লিখতে গেলে মানুষকে তথ্য বুঝে নিতে হয়, বেছে নিতে হয় এবং মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে-
- স্মৃতিশক্তি বাড়ে
- বানান শেখা সহজ হয়
- তথ্য দীর্ঘদিন মনে থাকে
- শেখা বিষয় আরও ভালোভাবে বোঝা যায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লাসে নোট নেওয়া বা নতুন কিছু শেখার সময় হাতে লেখা এখনও সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি।
হাতের লেখার যেন ভুলে না যাই। ছবি: সংগৃহীত
তাহলে কি টাইপিং খারাপ?
একেবারেই নয়। আধুনিক জীবনে টাইপিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত যোগাযোগ, বড় লেখা তৈরি বা ডিজিটাল কাজের ক্ষেত্রে টাইপিংয়ের বিকল্প নেই। তবে গবেষণা বলছে, শেখা ও মনে রাখার ক্ষেত্রে হাতের লেখার আলাদা শক্তি রয়েছে। অর্থাৎ,-
- শেখার জন্য হাতে লেখা
- গতির জন্য টাইপিং
দুটোরই আলাদা প্রয়োজন ও গুরুত্ব রয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক, শিশুদের হাতের লেখার অভ্যাস বজায় রাখা খুব জরুরি। কারণ এটি শুধু লেখার দক্ষতা নয়, মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার ক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই উপকার কেবল খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল পেন দিয়ে ট্যাব বা টাচস্ক্রিনে লেখার সময়ও একই ধরনের ইতিবাচক প্রভাব দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, মূল বিষয়টি হল- হাত দিয়ে অক্ষর তৈরি করার অভ্যাস।
