সন্তান জন্মের পর একজন মা তাঁর শিশুকে স্তন্যদুগ্ধ পান করান, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মাতৃদুগ্ধই যদি আর এক নবজাতকের প্রাণ বাঁচানোর আশ্রয় হয়ে ওঠে? ঠিক সেই মানবিক উদাহরণই তৈরি করলেন ভারতের প্রাক্তন ব্যাডমিন্টন তারকা জ্বালা গুট্টা।
সম্প্রতি এক্স-এ করা একটি পোস্টে তিনি জানান, মাতৃত্বের প্রথম এক বছরে তিনি প্রায় ৬০ লিটার বুকের দুধ হায়দরাবাদ ও চেন্নাইয়ের সরকারি হাসপাতালে দান করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু প্রশংসাই কুড়োয়নি, নতুন করে সামনে এনেছে ডোনার ব্রেস্টমিল্ক ও মিল্ক ব্যাংকের গুরুত্বও।
জ্বালা লিখেছেন, মাত্র ১০০ মিলিলিটার ডোনার মিল্ক ১ কেজি ওজনের অপরিণত শিশুকে কয়েক দিন পর্যন্ত পুষ্টি জোগাতে পারে। নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা এনআইসিইউ-তে ভর্তি অসংখ্য নবজাতকের জন্য এই দুধই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
জ্বালা গুট্টা। ছবি: সংগৃহীত
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডোনার ব্রেস্টমিল্ক?
চিকিৎসকদের মতে, মাতৃদুগ্ধ শুধুই খাবার নয়, নবজাতকের জন্য একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রতিরোধক। এতে থাকে অ্যান্টিবডি, এনজাইম ও নানা রোগপ্রতিরোধকারী উপাদান, যা শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং শরীরের স্বাভাবিক বিকাশে সাহায্য করে।
বিশেষ করে প্রিম্যাচিওর বা অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এই শিশুরা জন্মের পর নানা জটিলতার ঝুঁকিতে থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি রোগ হল 'নেক্রোটাইজিং এন্টারোকোলাইটিস' (এনইসি)। এই রোগে শিশুর অন্ত্রে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতীও হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব শিশু মাতৃদুগ্ধ বা স্ক্রিনিং করা ডোনার মিল্ক পায়, তাদের মধ্যে এনইসি হওয়ার ঝুঁকি বিশেষ উপায় তৈরি ফর্মুলা মিল্ক খাওয়া শিশুদের তুলনায় অনেকটাই কম।
বাড়ছে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের গুরুত্ব। ছবি: সংগৃহীত
যখন মা নিজে শিশুকে স্তন্যপান করাতে পারেন না
সব মা সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না। সিজারিয়ান ডেলিভারি, অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক চাপ, প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি বা অন্য জটিলতার কারণে অনেক সময় দুধ আসতে দেরি হয়। সেই কঠিন সময়ে ডোনার মিল্কই নবজাতকের জন্য লাইফলাইন হয়ে দাঁড়ায়।
এই কারণেই বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে তৈরি হয়েছে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক। এখানে সুস্থ মায়েরা স্বেচ্ছায় স্তন্যদুগ্ধ বা বুকের দুধ দান করেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নিরাপত্তার সমস্ত নিয়ম মেনে সেই দুধ সংগ্রহ, পাস্তুরাইজেশন ও সংরক্ষণ করা হয়। পরে তা এনআইসিঅই-তে ভর্তি শিশুদের দেওয়া হয়।
এক মায়ের সামান্য দানই আর এক ছোট্ট প্রাণকে দিতে পারে নতুন জীবন। ছবি: সংগৃহীত
সচেতনতার অভাব এখনও বড় সমস্যা
ভারতে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। ফলে নিরাপদ ডোনার মিল্কের প্রয়োজনও ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এখনও অনেক মানুষ জানেন না যে বুকের দুধও দান করা যায় এবং তা একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
রক্তদানের মতোই ব্রেস্টমিল্ক ডোনেশনও এক নিঃস্বার্থ মানবিক উদ্যোগ। একজন মায়ের স্তন্যদুগ্ধ অন্য এক নবজাতকের কাছে হতে পারে জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি ওষুধ।
জ্বালা গুট্টা তাঁর পোস্টে আবেদন জানিয়েছেন, যাঁরা স্তন্যদুগ্ধ দান করতে আগ্রহী, তাঁরা নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতাল বা নিবন্ধিত মিল্ক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
কারণ, এক মায়ের সামান্য দানই হয়তো আর এক ছোট্ট প্রাণকে নতুন জীবন উপহার দিতে পারে।
