কখন একটি সিদ্ধান্ত শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিকতার কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়? যখন একজন ১৫ বছরের কিশোরী, শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আদালতের দ্বারস্থ হয় নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে, তখন সেই প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় সেই কঠিন বাস্তবকেই সামনে এনেছে, যেখানে ৩১ সপ্তাহের গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিশোরীর মানসিক সুস্থতা ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়ে।
একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু গর্ভধারণ যখন সাত মাসে পৌঁছে যায়, তখন বিষয়টি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে জটিল নৈতিক প্রশ্নও।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট একটি ১৫ বছরের কিশোরীকে ৩১ সপ্তাহে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, তাকে এই গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হলে তার মর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, কিশোরী তীব্র মানসিক চাপে ছিল, এমনকী আত্মহত্যার চেষ্টার কথাও উঠে এসেছে।
এই রায় সংশ্লিষ্ট পরিবারকে স্বস্তি দিলেও, একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, গর্ভাবস্থার শেষের দিকে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনওই সহজ নয়।
ছবি: সংগৃহীত
৩১ সপ্তাহে গর্ভপাত মানে কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ৩১ সপ্তাহে গর্ভপাত আর সাধারণ অ্যাবরশন নয়। এই সময়ে ভ্রূণ অনেকটাই পরিণত হয় এবং মায়ের শরীরের বাইরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ফলে প্রক্রিয়াটি অনেকটা আগাম প্রসব (প্রিটার্ম ডেলিভারি)-এর মতো হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত এই পর্যায়ে গর্ভপাত করতে হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, এমনকী অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়তে পারে। শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি মানসিক অভিঘাতও কম নয়।
কিশোরী মায়েদের ঝুঁকি বেশি
১৫ বছর বয়সে শরীর পুরোপুরি গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত থাকে না। তাই এ সময় গর্ভধারণে রক্তাল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া বা প্রসবজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে।
গর্ভপাত করালেও এই ঝুঁকিগুলো পুরোপুরি এড়ানো যায় না, বরং প্রক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী নতুন জটিলতা যোগ হতে পারে।
মানসিক চাপ, অদৃশ্য কিন্তু গভীর
১৫ বছরে গর্ভধারণ শুধু শারীরিক নয়, গভীর মানসিক চাপও তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে থাকে ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ এবং কখনও কখনও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। এই পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও অত্যন্ত জরুরি।
ছবি: সংগৃহীত
গর্ভপাত নাকি আগাম জন্ম?
২৮ সপ্তাহের পর গর্ভপাত করলে অনেক ক্ষেত্রেই জীবিত শিশুর জন্ম হতে পারে, যাকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা (এনআইসিইউ)-এর সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এখানেই তৈরি হয় আরেকটি জটিলতা, একদিকে মায়ের অধিকার ও সুস্থতা, অন্যদিকে ভ্রূণের সম্ভাব্য জীবন। এই দ্বন্দ্বের সমাধান নেই।
সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়?
এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়, যেখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তারা মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, গর্ভাবস্থার সময়কাল এবং ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
বিতর্ক থামছে না
এই রায় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সাত মাসের গর্ভাবস্থায় এসে গর্ভপাতের বদলে দত্তক দেওয়ার মতো বিকল্পও বিবেচনা করা যেতে পারত। তবে অন্যপক্ষের যুক্তি, একজন ১৫ বছরের কিশোরীর ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ও মানসিক সুস্থতাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৩১ সপ্তাহে গর্ভপাতের অনুমতি কোনও সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে আইন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
