আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর ক্ষত শুকিয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন রোগী। বাইরে থেকে মনে হয়, বিপদ কেটে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তখনই শুরু হয় অন্য এক লড়াই, শরীরে থেকে যাওয়া দাগ, স্বাভাবিক চলাফেরায় সমস্যা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, মানসিক আঘাত, সামাজিক অস্বস্তি বা পুরনো জীবনে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তা। রোগীদের এই দীর্ঘ পথচলায় পাশে থাকার লক্ষ্যেই ডিসান হসপিটাল শুরু করল ‘ফিনিক্স বার্ন সাপোর্ট গ্রুপ’। কর্তৃপক্ষের দাবি, পূর্ব ভারতে এই ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম।
ডিসান হসপিটালের (Desun Hospital) ইন্টারনাল মেডিসিন ও ক্রিটিক্যাল কেয়ারের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. মোহিত খারবান্দার উদ্য়োগেই পথ চলা শুরু ‘ফিনিক্স বার্ন সাপোর্ট গ্রুপ’-এর। এই উপলক্ষে আয়োজিত ‘বার্ন সারভাইভার্স মিট’, যেখানে অগ্নিদগ্ধ রোগী, তাঁদের পরিবারের সদস্য, পরিচর্যাকারী এবং চিকিৎসকেরা একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান সারভাইভাররা। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল ১২ বছরের এক শিশুও।
ভারতে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর দেশে আনুমানিক ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় আগুন-সংক্রান্ত ঘটনায়। বিশ্বে অগ্নিকাণ্ডজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ভারতের। শুধু মৃত্যুই নয়, দগ্ধ হওয়ার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের জীবনে নেমে আসে প্রতিবন্ধকতা। ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সি মহিলাদের ক্ষেত্রে একই বয়সের পুরুষদের তুলনায় অগ্নিকাণ্ডজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি।
চিকিৎসকদের কথায়, গুরুতর অগ্নিদগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালের চিকিৎসা শেষ হওয়া মানেই সুস্থতার পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজন হয় ফিজিওথেরাপি, চলাফেরার প্রশিক্ষণ, শরীরে দাগের চিকিৎসা এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ বিশেষ ডায়েট। তার পাশাপাশি আগুনে পুড়ে যাওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হতে পারে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা সমাজে মেলামেশায় সংকোচ। শরীরে দৃশ্যমান দাগ থাকলে অনেকেই মানুষের প্রশ্ন বা দৃষ্টির মুখোমুখি হতে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন হয়ে পড়ে মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনেরও।
ডিসান হসপিটাল আয়োজিত 'বার্ন সারভাইভার্স মিট'।
এই জায়গাতেই কাজ করবে ‘ফিনিক্স’। চারটি মূল স্তম্ভের উপর তৈরি হয়েছে এই উদ্যোগ। কাউন্সেলিং এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে মানসিক সহায়তা দেওয়া হবে। ফিজিওথেরাপি, স্প্লিন্টিং এবং চলাফেরার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জোর দেওয়া হবে শারীরিক পুনর্বাসনে। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হবে পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ। পাশাপাশি পোড়া দাগের পরিচর্যা, দাগ কমানোর চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শও মিলবে।
ডা. মোহিত খারবান্দা বলেন, ‘প্রতি বছর গুরুতর দগ্ধ রোগীদের বাঁচাতে আমাদের দল আইসিইউতে লড়াই করে। আগের তুলনায় এখন আমরা আরও বেশি রোগীকে বাঁচাতে পারছি। কিন্তু হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অনেকে ভাবেন চিকিৎসা বোধ হয় শেষ। অথচ রোগীর আসল লড়াই তখনই শুরু। ফিনিক্সের উদ্দেশ্য হল এই জায়গাটিকে বদলে দেওয়া। কারণ অগ্নিদগ্ধ অবস্থা থেকে বেঁচে যাওয়া শুধু প্রথম অধ্যায়। তার পরের জীবনটাতেও সমান যত্নের প্রয়োজন।’
‘ফিনিক্স’-এর সঙ্গে যুক্ত হতে কোনও নির্দিষ্ট হসপিটালে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের যে কোনও জায়গায় চিকিৎসা নেওয়া রোগী এবং তাঁদের পরিবার এই উদ্যোগে যোগ দিতে পারবেন। হসপিটাল থেকে ছাড়ার সময় নাম নথিভুক্ত করা যাবে, আবার পরবর্তী সময়েও এই সাপোর্ট গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রতি মাসে থাকবে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ। প্রতি তিন মাস অন্তর আয়োজন করা হবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে বিশেষ ক্লিনিক।
ডিসান হসপিটালের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সজল দত্ত বলেন, ‘পোড়ার ক্ষত শুকিয়ে গেলেই একজন মানুষের লড়াই শেষ হয় না। এই যাত্রায় শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিনিক্সের মাধ্যমে আমরা অগ্নিদগ্ধ রোগী ও তাঁদের পরিবারকে জানাতে চাই, এই লড়াইয়ে তাঁরা একা নন। চিকিৎসক, পরিচর্যাকারী এবং সারভাইভারদের একসঙ্গে এনে প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের পাশে থাকাই আমাদের লক্ষ্য।’
ডিসান হসপিটালের এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া নয়, বরং অগ্নিদগ্ধ রোগীদের জন্য তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পরিসর। যেখানে একজন সারভাইভার প্রয়োজনের সময়ে পাবেন চিকিৎসকের পরামর্শ, মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসনের সুযোগ এবং একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গ।
আগুনে পুড়ে যাওয়া জীবনের একটি কঠিন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে ‘ফিনিক্স’-এর লক্ষ্য নতুন করে পথ চলার সাহস জোগানো।
