শরীরজুড়ে তীব্র জ্বালাপোড়া। বাইরে থাকলেই যেন বাড়ছে যন্ত্রণা। তাই স্বস্তি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলে ডুবে থাকতে হচ্ছে ১৬ বছরের এক কিশোরকে। মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে কৌতূহল। চিকিৎসকদের প্রাথমিক সন্দেহ, এমন অস্বাভাবিক উপসর্গের পিছনে থাকতে পারে বিরল রোগ এরিথ্রোমেলালজিয়া (Erythromelalgia)।
কী এই বিরল রোগ?
এরিথ্রোমেলালজিয়া এমন একটি বিরল সমস্যা, যেখানে স্নায়ু এবং ত্বকের ক্ষুদ্র রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকলাপে সমস্যা তৈরি হয়। ফলে শরীরের কোনও অংশ হঠাৎ অস্বাভাবিক গরম হয়ে যেতে পারে, ত্বক লাল হয়ে যায়, ফুলে ওঠে এবং শুরু হয় তীব্র জ্বালাপোড়া বা ব্যথা।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পা ও হাত। তবে বাহু, পায়ের নীচের অংশ, কান এমনকী মুখেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের জন্য উপসর্গ থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে।
সারাক্ষণ জলেই! ছবি: সংগৃহীত
আগুনের মতো জ্বালা, সঙ্গে লাল এবং ত্বকে তীব্র গরমের অনুভূতি
এই রোগে আক্রান্ত জায়গায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপসর্গ হল তীব্র জ্বালাপোড়া। অনেকের মনে হতে পারে যেন ত্বক পুড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আক্রান্ত অংশ লাল হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক গরম লাগা এবং ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
কখনও জ্বালাপোড়ার আগে বা সঙ্গে ঝিনঝিনি ও চুলকানিও হতে পারে। হতে পারে অতিরিক্ত ঘাম। আবার উপসর্গ কমে যাওয়ার পর সেই অংশ অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে নীলচে বা ধূসর দেখাতে পারে।
গরমে কেন বাড়ে যন্ত্রণা?
এরিথ্রোমেলালজিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, উষ্ণতা উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। গরম আবহাওয়া, উষ্ণ ঘর, ব্যায়াম, আঁটসাঁট জুতো বা পোশাক, মানসিক চাপ বা শরীরে জলের ঘাটতি অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়ায়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝাল খাবার, ক্যাফেইন বা মদ্যপানও ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই কারণেই ঠান্ডা পরিবেশ বা ঠান্ডা জলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। মুর্শিদাবাদের কিশোরটির পুকুরে দীর্ঘক্ষণ থাকার পিছনেও এমন কারণ থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে শুধু এই উপসর্গ দেখে এরিথ্রোমেলালজিয়া নিশ্চিত করা যায় না।
জল থেকে উঠলেই কষ্ট। ছবি: সংগৃহীত
জিনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে?
সব ক্ষেত্রে এই রোগের নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি বংশগত হতে পারে। SCN9A নামের একটি জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে বংশগত এরিথ্রোমেলালজিয়ার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। এই জিনের পরিবর্তন স্নায়ুর মাধ্যমে ব্যথার সংকেত পৌঁছনোর প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
আবার অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার ফল হিসেবেও এরিথ্রোমেলালজিয়া দেখা দিতে পারে। তাই রোগ নির্ণয়ের সময় চিকিৎসকেরা অন্য কোনও অন্তর্নিহিত রোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখেন।
কীভাবে ধরা পড়ে?
এরিথ্রোমেলালজিয়া শনাক্ত করার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই। রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষার উপরই মূলত নির্ভর করেন চিকিৎসকেরা। উপসর্গের সময় আক্রান্ত অংশ পরীক্ষা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে রক্তপরীক্ষা, জিনগত পরীক্ষা এবং অন্য কোনও রোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আরও কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে।
ঠান্ডা জলে স্বস্তি মিললেও সাবধান
জ্বালাপোড়া কমাতে ঠান্ডা জল আরাম দিতে পারে। কিন্তু বরফ, অতিরিক্ত ঠান্ডা জল বা দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা জলে ডুবে থাকা নিরাপদ নয়। এতে ত্বকের ক্ষতি, ক্ষত তৈরি হওয়া এমনকী টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
তাই বারবার জ্বালাপোড়া, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক গরম লাগা বা ফোলার মতো সমস্যা হলে নিজে থেকে ঠান্ডা জলে ডুবে থাকার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ বিরল রোগ হলেও, সঠিক রোগ নির্ণয় হলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার পথ রয়েছে।
