আজ ৮ মে। বিশ্ব ওভারিয়ান বা ডিম্বাশয় ক্যানসার দিবস। চিকিৎসকরা বলছেন, পেট ফাঁপা, অম্বল, তলপেটে অস্বস্তির মতো সাধারণ উপসর্গকেও হালকাভাবে নেবেন না। ডিম্বাশয়ের ক্যানসারকে এখনও অনেকেই বয়সজনিত রোগ বলেই মনে করেন। ফলে কম বয়সি নারীদের মধ্যে এই রোগ নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক কম। আর সেই কারণেই পেট ফাঁপা, গ্যাস-অম্বল, তলপেটে ভারী ভাব, অল্প খাওয়াতেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি বা অস্বস্তির মতো উপসর্গকে অনেকেই সাধারণ শারীরিক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। চিকিৎসকদের মতে, এই অবহেলাই অনেক সময় রোগ ধরা পড়তে দেরি করায়।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বয়স বাড়লে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে ঠিকই, তবে তরুণীদের ক্ষেত্রেও এই রোগ অসম্ভব নয়। বরং কম বয়সে উপসর্গকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতাই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বয়স কম মানেই ঝুঁকিহীন নয়। ছবি: সংগৃহীত
কম বয়সেও হতে পারে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার অনেক সময় জার্ম সেল টিউমার বা কিছু বিশেষ ধরনের এপিথেলিয়াল টিউমারের আকারে দেখা দেয়। এই ধরনের ক্যানসার তুলনামূলক বিরল হলেও উপসর্গ একেবারেই থাকে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সাধারণ হজমের সমস্যা বা হরমোনের পরিবর্তন বলে মনে করা হয়।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, কম বয়সি নারীদের মধ্যে সচেতনতা কম থাকায় উপসর্গ শুরু হলেও সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ তাঁদের মনে হয়, এই বয়সে ক্যানসারের সম্ভাবনা খুব কম। চিকিৎসকদের মতে, বহু নারী প্রথমে সমস্যাগুলোকে গ্যাস, বদহজম, স্ট্রেস, মাসিকের সমস্যা বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের প্রভাব বলে ধরে নেন। অনেক রোগীই বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম এটা শুধু অ্যাসিডিটির সমস্যা।'
যেসব লক্ষণকে অবহেলা করছেন অনেকেই
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার মানেই তীব্র ব্যথা বা কষ্ট, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং রোগের শুরুর দিকে কিছু খুব সাধারণ উপসর্গই বারবার দেখা দিতে পারে, যেমন-
- বারবার পেট ফাঁপা
- গ্যাস-অম্বলের মতো জ্বালা বা অস্বস্তি
- অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া
- তলপেটে চাপ, ব্যথা বা ভারী ভাব
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
- মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন
- মাসিকে অনিয়ম
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপসর্গগুলো এতটাই সাধারণ যে বেশিরভাগ নারী তা গুরুত্ব দেন না। তাঁদের কথায়, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, সাধারণ মানুষের জন্য কোনও নির্দিষ্ট নিয়মিত স্ক্রিনিং টেস্ট নেই। তাই উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসর্গ কত দিন ধরে চলছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে একই সমস্যা থাকলে, ডায়েট পরিবর্তন বা ওষুধ খেয়েও উপশম না মিললে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসর্গকে উপেক্ষা নয়। ছবি: সংগৃহীত
দ্রুত রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার সুযোগও বাড়ে
চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসার ফল অনেক ভালো হতে পারে। কিন্তু উপসর্গগুলো সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বা হরমোনজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত আলট্রাসাউন্ড, টিউমার মার্কার ব্লাড টেস্ট বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট করাতে পারেন। অনেক সময় রিপোর্ট স্বাভাবিকও আসতে পারে। তবে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের কথায়, গত কয়েক বছরে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন এসেছে। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি এখন টার্গেটেড থেরাপি এবং PARP ইনহিবিটরের মতো আধুনিক চিকিৎসা রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে।
যে কোনও সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নারীর ক্ষেত্রে বংশগত কারণেও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। পরিবারে স্তন ক্যানসার বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে BRCA1 এবং BRCA2 জিন মিউটেশনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, BRCA1 এবং BRCA2 মিউটেশন কম বয়সে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। এখন সচেতনতা ও জেনেটিক টেস্টিং কিছুটা বাড়লেও ভারতে এখনও বহু পরিবারের এই বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই! বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে ঝুঁকি, স্ক্রিনিং এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, বহু নারী নিজের শরীরের সমস্যার চেয়ে কাজ, পরিবার ও দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে শরীরের ছোট ছোট সতর্কবার্তাগুলো অজান্তেই উপেক্ষিত থেকে যায়। বিশ্ব ডিম্বাশয় ক্যানসার দিবসে (World Ovarian Cancer Day) বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা, দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। শরীরের নীরব সংকেতও অনেক সময় বড় বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
