বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যার নিরিখে ভারত বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। অনেকের মতে, ভারত ডায়াবেটিসের রাজধানী। ভারতীয়দের এই ডায়াবেটিসের খপ্পরে পাড়ার জন্য দায়ী মূলত সেডেন্টারি লাইফস্টাইল বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। কিন্তু বর্তমানে সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে আঙুল ওঠছে ভাতের দিকে! প্রায়ই ভাতকে 'ডায়েটের শত্রু' বলা হয়। বহু রোগীকেই চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বলতে শোনা যায়, তাঁরা ভাত খাওয়া বন্ধ করেছেন, তবুও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। চিকিৎসকদের মতে, সমস্যা ভাতে নয়। সমস্যা আমাদের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে। ভাত একা কখনও মূল অপরাধী নয়- আসল প্রশ্ন হল, ভাতের সঙ্গে আমরা কী খাচ্ছি এবং কীভাবে খাচ্ছি।
ফাইল ছবি
সমস্যা ভাতে নয়, পুরো প্লেটে
আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটের বড় অংশ জুড়ে থাকে ভাত বা রুটি। সঙ্গে থাকে ডাল, সবজি, ভাজা, মাছ বা ডিম, কখনওবা মিষ্টি। গোটা থালায় কোন খাবার কতটা পরিমাণে থাকছে, সেটাই আসল বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্বোহাইড্রেট বেশি, অথচ পর্যাপ্ত প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির ঘাটতি থাকে। প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করার শোষণ ধীর করে। ফলে একই পরিমাণ ভাত খেলেও শর্করার ওঠানামা আলাদা হতে পারে, যদি তার সঙ্গে যথেষ্ট প্রোটিন ও সবজি থাকে। অর্থাৎ, ভাত নয়, তার 'সঙ্গী'ই আসল পার্থক্য তৈরি করে।
ডায়াবেটিসের তিন বড় কারণ
১. দীর্ঘদিন ধরে প্রোটিনের ঘাটতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩০–৪০ গ্রাম প্রোটিন খান, অথচ প্রয়োজন প্রায় তার দ্বিগুণ। আমাদের শরীরে গ্লুকোজের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান ভরসা হল পেশি। পর্যাপ্ত প্রোটিন না পেলে পেশির ক্ষয় ও শক্তি কমতে থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। পেশি রক্ত থেকে প্রায় ৮০% পর্যন্ত গ্লুকোজ গ্রহণ করে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চয় করে এবং কাজের শক্তির জোগান দেয়। ইনসুলিন এবং ব্যায়াম- উভয় প্রক্রিয়াই পেশিতে গ্লুকোজ শোষণ বাড়ায়, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সাহায্য করে।
২. সেডেন্টারি লাইফস্টাইল বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন
আগেকারদিনে মানুষ বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাবার খেলেও তাঁরা শারীরিক পরিশ্রম করতেন। এখন ডেস্ক-ভিত্তিক কাজ, দীর্ঘ যাতায়াত ও স্ক্রিন-নির্ভর জীবন সেই ভারসাম্য নষ্ট করেছে। পেশি না বাড়লে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহারের জায়গাও থাকে না।
ফাইল ছবি
৩. খাবারের সময়ের অনিয়ম
ঘনঘন খাওয়া বা দেরিতে রাতের খাবার ইনসুলিনের মাত্রাকে দীর্ঘক্ষণ বাড়িয়ে রাখে। এতে শরীর ফ্যাট বার্ন বা চর্বি পোড়ানোর স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে না। তাই শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন খাচ্ছেন সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কী করলে মিলবে উপকার
ভাত বাদ দেওয়ার বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন—
১. ব্রেকফাস্ট থেকে ডিনার, প্রতি সময়ই প্লেটে থাকুক অন্তত ২৫–৩০ গ্রাম প্রোটিন
২. আগে প্রোটিন ও সবজি, পরে শর্করা জাতীয় খাবার খান
৩. ডিনারের পর পরবর্তী খাবারের মাঝে বেশ খানিকটা সময় বিরতি রাখার চেষ্টা করুন
৪. নিয়মিত রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং বা ব্য়ায়াম করে পেশি ও পেশির শক্তি বাড়ান
সঠিক খাবারের প্লেট নির্বাচন করুন, সেডেন্টারি লাইফস্টাইল ত্যাগ করুন। তাহলে ভাত নিজে থেকেই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস আসলে একটি মেটাবলিক সমস্যা। এটি নির্ভর করে পেশির পরিমাণ, ইনসুলিনের কার্যকারিতা, শারীরিক সক্রিয়তা ও খাদ্যাভ্যাসের উপর। ভাতকে একা দায়ী করলে সমস্যার আসল কারণ আড়ালেই থেকে যাবে।
