জীবন বাঁচানোর জন্য যে রক্তের প্রয়োজন, সেই রক্তই যদি নিয়মের বাইরে সংগ্রহ, মজুত বা বিক্রি হয়, তা হলে বিপদ শুধু আইনের নয়, সরাসরি স্বাস্থ্যেরও। পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর ইতিমধ্যেই রক্তের কারবারের তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ, কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক বেআইনিভাবে রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান বিক্রি করেছে। সূত্রের খবর, অন্তত ছ’টি ব্লাড ব্যাংক তদন্তের আওতায় রয়েছে। আরও ১১টি কেন্দ্রকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রক্তদান শিবির আয়োজন থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া এবং বর্ধমান-সহ একাধিক জেলায় পরিদর্শনের সময় বিপুল পরিমাণ প্লাজমা সংগ্রহ ও মজুতের তথ্য সামনে এসেছে বলে খবর। সেই প্লাজমা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং গুজরাটে পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। রক্তদান শিবির আয়োজন এবং রক্তদাতা সংগ্রহের জন্য আর্থিক সুবিধা বা দামি উপহার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলেই জানা যাবে, কোথায় নিয়ম ভাঙা হয়েছে এবং এর পিছনে কারা রয়েছে।
রক্তদান বাঁচায় প্রাণ। ছবি: সংগৃহীত
বেআইনি রক্ত বিক্রিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কোথায়?
রক্ত কোনও সাধারণ পণ্য নয়। একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে সংগ্রহ করা রক্ত সরাসরি অন্য একজন অসুস্থ মানুষের শরীরে যেতে পারে। তাই রক্তের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সামান্য গাফিলতিও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
রক্ত সংগ্রহের আগেই দাতার স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার ইতিহাস যাচাই করা প্রয়োজন। সংগ্রহের পর রক্তে বিভিন্ন সংক্রমণের পরীক্ষা করতে হয়। এরপর রক্তকে প্রয়োজন অনুযায়ী লোহিত রক্তকণিকা, প্লেটলেট ও প্লাজমার মতো উপাদানে ভাগ করে নির্দিষ্ট নিয়মে সংরক্ষণ ও পরিবহণ করতে হয়।
এই পুরো ব্যবস্থার কোনও একটি ধাপে নিয়ম ভাঙলে রক্তের গুণমান এবং রোগীর নিরাপত্তা, দু’টিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কোন কোন সংক্রমণের পরীক্ষা জরুরি?
ভারতে রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় সংগৃহীত রক্তের বাধ্যতামূলক পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়ার মতো রক্তের মাধ্যমে ছড়াতে পারে এমন সংক্রমণ।
অর্থাৎ, শুধু রক্ত সংগ্রহ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। সেই রক্ত নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করতে একাধিক পরীক্ষার প্রয়োজন। পাশাপাশি সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিবহণও জরুরি।
ব্লাড ট্রান্সফিউশন। ছবি: সংগৃহীত
কেন স্বেচ্ছায় রক্তদানকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়?
ভারতের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় স্বেচ্ছায় এবং বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানকে নিরাপদ রক্ত সরবরাহের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। রক্তদানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন জড়িয়ে পড়লে পুরো ব্যবস্থাটিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রক্তের প্রয়োজনও নিরন্তর। দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসবজনিত জটিলতা, ক্যানসার, থ্যালাসেমিয়া-সহ নানা পরিস্থিতিতে রক্ত বা তার উপাদানের প্রয়োজন হয়। তাই নিরাপদ রক্তের পর্যাপ্ত জোগান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক ইউনিট রক্তে একাধিক রোগীর উপকার
রক্ত সংগ্রহের পর তা সবসময় সম্পূর্ণ রক্ত হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী একটি রক্তদানের নমুনা থেকে লোহিত রক্তকণিকা, প্লেটলেট এবং প্লাজমা আলাদা করা যায়। ফলে একজনের দেওয়া রক্তের বিভিন্ন উপাদান একাধিক রোগীর চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে। তবে প্রতিটি উপাদানের সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের নিয়ম আলাদা। বিশেষ করে প্লাজমার মতো উপাদান সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পরিবহণেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলতে হয়।
বন্ধ হোক বেআইনি কার্যকলাপ। ছবি: সংগৃহীত
তদন্তে কোথায় নজর?
রাজ্যে ওঠা অভিযোগ তাই শুধু বেআইনি লেনদেনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রক্তদাতার নিরাপত্তা, সংগৃহীত রক্তের মান এবং সেই রক্ত গ্রহণকারী রোগীর জীবন। তদন্তে অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে কোথায় নজরদারির ঘাটতি ছিল, কীভাবে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহের নিয়ম ভাঙা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেগুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রক্তদান একটি মানবিক উদ্যোগ। সেই রক্ত যাতে নিরাপদে প্রকৃত প্রয়োজনমতো রোগীর কাছে পৌঁছয়, তার জন্য গোটা ব্যবস্থার উপর কঠোর নজরদারি জরুরি। এই ঘটনা একটি কথাই মনে করাচ্ছে, রক্তের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন।
