হেপাটাইটিস মানেই জন্ডিস, তীব্র অসুস্থতা বা চোখ-মুখ হলুদ হয়ে যাওয়া, এমন ধারণাই এখনও অনেকের মনে গেঁথে রয়েছে। কেউ আবার মনে করেন, এই রোগ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু মানুষেরই হয়। কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা।
হেপাটাইটিস সম্পর্কে এমন বহু ভুল ধারণা রয়েছে, যা আমাদের টেস্ট বা পরীক্ষা করানো থেকে বিরত রাখে। আর সেই সুযোগেই নিঃশব্দে ক্ষতি হতে থাকে লিভারের। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পরীক্ষা না হলে রোগ ধরা পড়তে পড়তেই অনেক ক্ষেত্রে লিভারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ভুল ধারণা ১
হেপাটাইটিস হলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারব
এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর একটি। অনেকেই মনে করেন, জন্ডিস, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমিভাব বা পেটব্যথার মতো উপসর্গ না থাকলে হেপাটাইটিস হওয়ার প্রশ্নই নেই।
কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং সি অনেক বছর, এমনকী কয়েক দশক পর্যন্ত কোনও লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বেঁধে থাকতে পারে। এই সময়ের মধ্যেই ভাইরাসটি ধীরে ধীরে লিভারের কোষ নষ্ট করতে থাকে। ফল হতে পারে লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল হয়ে যাওয়া বা লিভার ক্যানসার। তাই শরীর সতর্কবার্তা দেবে, এই আশায় বসে থাকা নয়, নিয়মিত রক্তপরীক্ষাই রোগটি দ্রুত শনাক্ত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
কাটুক ভ্রান্ত ধারণার মেঘ। ছবি: সংগৃহীত
ভুল ধারণা ২
হেপাটাইটিস শুধু কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
অনেকের ধারণা, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন যাঁরা বা যাঁদের একাধিক যৌনসঙ্গী রয়েছে, এমন মানুষই শুধু হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হন।
আসলে ঝুঁকির পরিধি অনেক বিস্তৃত। জীবাণুমুক্ত না করা ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের যন্ত্র, অন্যের রেজর বা টুথব্রাশ ব্যবহার, রক্ত সঞ্চালন, এমনকী প্রসবের সময় আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে সন্তানের মধ্যেও হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমিত হতে পারে। তাই নিজেকে ঝুঁকির বাইরে ভেবে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।
ভুল ধারণা ৩
একসঙ্গে খেলে বা মিশলে হেপাটাইটিস ছড়িয়ে পড়ে
অনেকেই মনে করেন, আলিঙ্গন, করমর্দন, একই প্লেটে খাওয়া, একই গ্লাসে জল পান করা বা একই বাসন ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস ছড়িয়ে পড়ে।
এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। হেপাটাইটিস বি এবং সি সাধারণ সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে ছড়ায় না। এই ভাইরাস সংক্রমিত রক্ত এবং কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়ায়। অথচ এই ভুল ধারণার কারণেই বহু আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক বৈষম্যের ভয়ে নিজের রোগ লুকিয়ে রাখেন বা পরীক্ষা করাতে দেরি করেন।
ভুল ধারণা ৪
হেপাটাইটিস ধরা পড়লে জীবন শেষ
একসময় এমনটা ভাবার কারণ থাকলেও এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে।
বর্তমানে আধুনিক অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ হেপাটাইটিস সি রোগী কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। আর হেপাটাইটিস বি পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, লিভারের ক্ষতি কমানো এবং দীর্ঘদিন স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করা সম্ভব।
ভ্যাকসিনেই সুরক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
ভুল ধারণা ৫
সব ধরনের হেপাটাইটিস একই
সব ধরনের হেপাটাইটিসের কারণ, সংক্রমণের পথ এবং পরিণতি এক নয়।
হেপাটাইটিস এ এবং ই সাধারণত দূষিত খাবার বা জলের মাধ্যমে ছড়ায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং সি দীর্ঘদিন শরীরে নীরবে থেকে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই সব ধরনের হেপাটাইটিসকে একইভাবে বিচার করা ঠিক নয়।
সময়মতো পরীক্ষা, সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস নিয়ে যত ভুল ধারণা, তার প্রায় সবকটিই রোগ নির্ণয়ে দেরির জন্য দায়ী। উপসর্গের অপেক্ষা করা, নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করা বা সমাজ কী বলবে এই ভেবে পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া কখনওই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতি অনেকটাই হয়ে যায়। তাই সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং দ্রুত চিকিৎসাই হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।
