গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা (জিআইএনএ)-র উদ্যোগে প্রতি বছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার পালিত হয় বিশ্ব অ্যাজমা দিবস। দিনটি পালনের মূল লক্ষ্য অ্যাজমা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। এবারের থিম- অ্যাজমা আক্রান্ত সবার জন্য প্রয়োজন অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনহেলার। কিন্তু এই ইনহেলার নিয়েই রয়েছে অজস্র ভুল ধারণা। যা অসুখকে আরও জটিল করে তোলে।
অ্যাজমা মানেই কি আজীবনের কষ্ট? আর ইনহেলার মানেই কি নির্ভরতার ফাঁদ? এই দুই প্রশ্নই এখনও বহু মানুষের মনে ভয় তৈরি করে। অথচ বাস্তবটা একেবারেই উলটো। আজ বিশ্ব অ্যাজমা দিবসে বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা, ইনহেলার নিয়ে প্রচলিত ভয় ও ভুল ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এগুলি নিরাপদ, কার্যকর এবং একেবারেই আসক্তি তৈরি করে না। বরং সময়মতো ইনহেলার ব্যবহার শুরু করলে অ্যাজমা ও সিওপিডি রোগীদের তীব্র অ্যাটাক কমে এবং জীবনযাত্রার মান অনেকটাই উন্নত হয়।
উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
অ্যাজমা: জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে বড় স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির একটি অ্যাজমা। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, সাঁই সাঁই শব্দ- এই লক্ষণগুলো অনেক সময়ই অবহেলায় চাপা পড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬২ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে ভুগছেন এবং প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই অসুখ।
সমস্যা শুধু রোগ নয়, সমস্যা ভুল ধারণা
চিকিৎসায় অগ্রগতি হলেও ইনহেলার নিয়ে ভুল ধারণা অনেক রোগীকেই সময়মতো চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে। পালমোনোলজিস্টদের মতে, এই ভয় ও দ্বিধাই অনেক সময় অসুখকে আরও জটিল করে তোলে। তাঁদের মতে, ইনহেলারই অ্যাজমা ও সিওপিডি নিয়ন্ত্রণের মূল অস্ত্র। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ব্যবহারে লক্ষণ কমে, ফুসফুসের ক্ষতিও রোধ হয়।
মিথ ১: ইনহেলার আসক্তি তৈরি করে
সত্যি: এটি সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, একবার ইনহেলার শুরু করলে সারাজীবন তার উপর নির্ভর করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনহেলার কখনওই আসক্তি তৈরি করে না। বরং এটি রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে নিরাপদ উপায়গুলির একটি। ইনহেলড ওষুধ আসক্তিকর নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে রোগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত জরুরি।
ইনহেলার সবচেয়ে নিরাপদ। ছবি: সংগৃহীত
মিথ ২: ইনহেলার শুধু গুরুতর রোগীদের জন্য
সত্যি: আরেকটি বড় ভুল, ইনহেলার নাকি শুধু গুরুতর রোগীদের জন্য। এই ধারণার জন্যই অনেক রোগী চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন। কিন্তু অ্যাজমার ক্ষেত্রে দেরি মানেই ঝুঁকি। শুরুতেই ইনহেলার ব্যবহার করলে শ্বাসনালির প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে, হঠাৎ অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমে এবং ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি এড়ানো যায়। সহজ করে বললে, ইনহেলার তাড়াতাড়ি শুরু, তত বেশি সুরক্ষা।
মিথ ৩: ট্যাবলেট ইনহেলারের চেয়ে বেশি কার্যকর
সত্যি: অনেকে ট্যাবলেটকে বেশি শক্তিশালী মনে করেন। কিন্তু বাস্তবটা ভিন্ন। ইনহেলার সরাসরি ফুসফুসে ওষুধ পৌঁছে দেয়, যেখানে সমস্যার উৎস। ফলে খুব কম ডোজেই দ্রুত কাজ করে। অন্যদিকে ট্যাবলেট সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই আধুনিক চিকিৎসায় ইনহেলারই প্রথম পছন্দ।
মিথ ৪: স্টেরয়েড ইনহেলার বিপজ্জনক
সত্যি: স্টেরয়েড শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু ইনহেলারে ব্যবহৃত স্টেরয়েড সম্পূর্ণ ভিন্ন, এগুলি কম মাত্রায়, ফুসফুসে সরাসরি কাজ করে এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ইনহেলার নিরাপদ।
চিকিৎসকের পরামর্শে নিলে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ছবি: সংগৃহীত
সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার কেন জরুরি?
শুধু ইনহেলার ব্যবহার করলেই হবে না, সঠিক পদ্ধতিও জানতে হবে। অনেক রোগী ঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার করতে পারেন না, ফলে ওষুধ ফুসফুসে পৌঁছায় না। এই কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ব্যবহার শেখা অত্যন্ত জরুরি।
ভারতে বাড়ছে অ্যাজমা
ভারতে অ্যাজমা ক্রমশ বাড়ছে। দূষণ, ধূমপান- এ সব কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। আইসিএমআর-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শ্বাসযন্ত্রের রোগ অন্যতম বড় অসুস্থতার কারণ। এর সঙ্গে ইনহেলার নিয়ে ভুল ধারণা সমস্যাকে আরও বাড়াচ্ছে।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরা
সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার করলে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কমে শ্বাসকষ্ট, সহজ হয় দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং বাড়ে আত্মবিশ্বাস। মিথ আর ভয়কে দূরে সরান। ইনহেলার নির্ভরতা তৈরি করে না, বরং আপনাকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে সাহায্য করে।
বিশ্ব অ্যাজমা দিবস ২০২৬-এর বার্তা একটাই- ইনহেলার নিয়ে ভয় নয়, দরকার সচেতনতা। ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে অ্যাজমা আর ভয় নয়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি রোগ।
