নন্দিতা রায়, নয়াদিল্লি: ২০২৫-এর শেষটা হয়েছিল বিহারে বিপুল জয় দিয়ে। সেই রেশ ছাব্বিশে বাংলার বিধানসভা ভোটেও থাকবে বলেই বিজয়োৎসবের সময় ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপি শীর্ষ নেতারাও বলতে শুরু করেছিলেন, বিহারের পর বাংলাও দখল করা হবে। সেকথা ১০০ শতাংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্ব। শোনা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ নির্বাচনী রণকৌশল তৈরি করেছে বিজেপি। দলীয় সূত্রের খবর, এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাংলাকে এবার ‘হাই প্রাইঅরিটি স্টেট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষেই কলকাতায় এসেছিলেন অমিত শাহ। তিনদিনের সফরে বঙ্গ বিজেপি নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, ছাব্বিশের ভোটে বড় ইস্যু হতে চলেছে অনুপ্রবেশ। বাংলার অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশিদের অবৈধ প্রবেশ এবং তাতে শাসকদলের পরোক্ষ মদতের অভিযোগে বারবার আক্রমণ করেছেন অমিত শাহ। সেই ছকেই সাজানো হচ্ছে বঙ্গদখলের রণকৌশল। সূত্রের খবর, অমিত শাহের পরিকল্পনার মূল ভিত্তি চারটি ইস্যু - বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ, নারী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক হিংসা এবং দুর্নীতি। বিজেপির দাবি, এই ইস্যুগুলিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। প্রতিটি জেলা ও বিধানসভা কেন্দ্রে এই চার বিষয়কে সামনে রেখে আলাদা তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে আরও খবর, অনুপ্রবেশ ইস্যুকে বিজেপি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছে। সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছে না - এই অভিযোগকে জোরালোভাবে তুলে ধরার নির্দেশ রয়েছে। পাশাপাশি জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রশ্নটিও প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে চলেছে। দুর্নীতির প্রশ্নে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করার পরিকল্পনা রয়েছে। রোজভ্যালি, এসএসসি, গরু পাচার, রেশন, মনরেগা, পুরসভা ও পুরনিগম নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাগুলিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় বিজেপি। একাধিক তৃণমূল নেতার নাম প্রচারে সামনে আনার কৌশলও নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
এছাড়া কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত নিয়ে নির্দিষ্ট বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করাও অমিত শাহের পরিকল্পনার অংশ। বিজেপির অভিযোগ, মোদি সরকারের একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প রাজ্য সরকার আটকে দিচ্ছে। আয়ুষ্মান ভারত, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, উজ্জ্বলা ও জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পের তথ্য বুথ স্তরে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিক স্তরেও বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সূত্র জানাচ্ছে, অমিত শাহ নিজে রাজ্যের সংগঠনের রিপোর্ট নিচ্ছেন। দুর্বল জেলা নেতৃত্বে রদবদল, নতুন মুখ তুলে ধরা এবং বুথ স্তরে কর্মীদের আরও সক্রিয় করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের অন্তর্কলহ এবং বিরোধী শিবিরের অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে বাংলায় বিজেপির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক লড়াই। বিজেপির অন্দরমহলের বার্তা স্পষ্ট, এবার লক্ষ্য শুধু বিরোধিতা নয়, রাজ্যের ক্ষমতা দখল।
