মহাভারতে মহাপরাক্রমশালী দুর্যোধনকে বধ করতে তাঁর লৌহ শরীর ছেড়ে দুর্বল উরুতে আঘাত হেনেছিলেন ভীম। একইভাবে বিশ্বের 'ত্রাস' আমেরিকাকে বাগে আনতে তার দুর্বল স্নায়ুতে আঘাত হেনেছে ইরান। বিশ্বের তৈল ধমনী হরমুজ বন্ধ করে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে শত্রুর সঙ্গে এঁটে উঠতে গেলে মহাশক্তিধর হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শত্রুর দুর্বলতম জায়গা খুঁজে বের করে সেখানে মারণ আঘাত আনা। এই অঙ্কে পিছিয়ে নেই ভারতও। ভবিষ্যতে কখনও যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় সেক্ষেত্রে ভারতের হাতেও রয়েছে এমনই কৌশলগত অস্ত্র।
আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার অর্থ অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে ধ্বংস করা। ফলে কোনও দেশই চায় না এই অসম যুদ্ধে নিজেকে জড়াতে। তবে দিনে দিনে গোটা বিশ্বে মার্কিন আগ্রাসন যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে তাতে সতর্ক গোটা বিশ্ব। আমেরিকার দুর্বল স্নায়ু খুঁজে বের করে তার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে বিশ্বের দেশগুলি। হরমুজের কথাই যদি ধরা যায়, গোটা বিশ্বের ২৫ শতাংশ জ্বালানির রপ্তানি হয় এই প্রণালী থেকে। যুদ্ধের জেরে এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে শিরে সংক্রান্তি অবস্থা আমেরিকার। হুড়মুড়িয়ে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। চাপ বাড়ছে আমেরিকার। দাম নিয়ন্ত্রণে যে ইরানের উপর তারা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল যুদ্ধের মাঝেই তাদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। হরমুজ উদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প। হামলার ঝুঁকির ভয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া যাতায়াত করছে না কোনও জাহাজ।
অদূর ভবিষ্যতে যদি কখনও কোনও দানবের বিরুদ্ধে ভারতকে যুদ্ধে নামতে হয় সেক্ষেত্রে দিল্লির হাতে রয়েছে মালাক্কা প্রণালী। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত এই প্রণালী ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থল।
যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি না হলেও চিনের হাতে রয়েছে আমেরিকার আরও এক দুর্বল প্রাণ ভোমরা। প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান পৃথিবীর প্রধান চালিকাশক্তি এখন বিরল খনিজ। আমেরিকার মাথায় ‘টুপি’ পরিয়ে এই খনিজ প্রক্রিয়াকরণের সহজ ও সস্তা পদ্ধতি রপ্ত করেছে চিন। হয়ে উঠেছে বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিশ্বের একছত্র অধিপতি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের বিরল খনিজকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা। পশ্চিম-সহ কার্যত গোটা বিশ্ব এক্ষেত্রে চিন নির্ভর। এক্ষেত্রে আমেরিকাও চিনের উপর নির্ভরশীল। রিপোর্ট বলছে, মার্কিন যুদ্ধ বিমান এফ-৩৫ তৈরিতে প্রয়োজন পড়ে ৪ টনের বেশি রেয়ার আর্থ। মার্কিন নৌসেনার মিসাইল ডেস্ট্রয়ার আর্লে বার্ক ক্লাসে এর প্রয়োজন পড়ে ২ টন। ডুবোজাহাজ ভার্জিনিয়া ক্লাসে প্রয়োজন হয় ৪ টন। আমেরিকার যাবতীয় মারণাস্ত্র টিকে রয়েছে এই বিরল খনিজের উপর। অর্থাৎ এর অভাবে আমেরিকার অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। তাই দাপাদাপি যতই করুক চিনকে বিশেষ চটাতে যায় না আমেরিকা।
চিন-ইরানের পাশাপাশি ভারতের হাতেও রয়েছে এমন কৌশলগত অস্ত্র। অদূর ভবিষ্যতে যদি কখনও কোনও দানবের বিরুদ্ধে ভারতকে যুদ্ধে নামতে হয় সেক্ষেত্রে দিল্লির হাতে রয়েছে মালাক্কা প্রণালী। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত এই প্রণালী ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থল। বিশ্ব ২৫ শতাংশ বাণিজ্য চলে এই পথেই। শুধু তাই নয় চিনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই পথের উপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের ভৌগলিক অবস্থান প্রাকৃতিকভাবেই দিল্লিকে ভারত মহাসাগরের প্রহরীতে পরিণত করেছে। সংকটকালে ভারত এখানে বাণিজ্য ও সামরিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ইতিমধ্যেই গ্রেট নিকোবার প্রকল্প এবং গ্যালাথিয়া উপসাগরীয় বন্দরের মাধ্যমে আন্দামান ও নিকোবার অঞ্চলে ভারত নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করেছে। এটি শুধু বন্দর নয় এক কৌশলগত দুর্গ।
চিন হয়ে উঠেছে বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিশ্বের একছত্র অধিপতি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের বিরল খনিজকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা।
ভারত যদি কোনওভাবে এই সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেয় সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটবে। বাধ্য হয়েই জাহাজগুলিকে তখন যেতে হবে ঘুরপথে। যার হয়ে উঠবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। রাতারাতি আকাশ ছোঁবে তেলের দাম। কাঁচামাল ও সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহ আকার নেবে। যা আমেরিকা তো বটেই ঘুম ছোটাবে গোটা বিশ্বের।
