হরিশ রানার জন্য বদলেছে দেশের ইতিহাস। এই প্রথম নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন মেনে নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু মুম্বইয়ের আনন্দ দীক্ষিতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একটু হলেও আলাদা। কারণ, তাঁর বাবা-মা এখনও ‘মিরাকল-এর আশায় অপেক্ষমাণ। দিন গুনছেন কখন ছেলে একবার চোখের পাতা ফেলবে বা এক বার হাতটা নাড়বে। কিংবা মুখ ফুটে বলবে একটি শব্দ! আর তাই বছরের পর বছর কেটে গেলেও হাসপাতালের বিল বাড়তে বাড়তে ৪ কোটি টাকার ঘর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা ‘প্যাসিভ ইউথেনিসিয়া’ চেয়ে আদালতের দরজায় কড়া নাড়ছেন না। নাড়তে চানও না।
গত প্রায় ২.৫ বছর ধরে শয্যাশায়ী আনন্দ। মাথা থেকে পা, গোটাটাই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। অচেতন, অসাড়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, ‘পার্সিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’। বছর পঁয়ত্রিশের আনন্দ শ্বাস নেন ট্র্যাকিওস্টোমি টিউবের সাহায্যে, আর খাবার খান গ্যাসট্রোজেজুনোস্টোমি টিউবের সাহয্যে। তাঁর এই পরিণতি ২০২৩ সালের এক দুর্ঘটনার জেরে। সে বছর ২৯ ডিসেম্বর আনন্দের স্কুটার ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সেই দিনই নতুন বাইক কিনেছিল সে। কিন্তু স্বপ্নের যান ডেকে আনে গভীর দুঃস্বপ্ন। দুর্ঘটনার ফলে মারাত্মক আহত হয় সে। তার পরই এই করুণ পরিণতি।
অথচ সন্তানের চিকিৎসার জন্য চেষ্টার কসুর করেনি দীক্ষিত পরিবার। ছেলে যাতে সুস্থ হয়ে ওঠে, তার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল। কখনও কোকিলাবেন, কখনও লোটাস। লড়াই করেছেন দাঁতে দাঁত চেপে। কিন্তু লাভ হয়নি। আনন্দের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে দীক্ষিত পরিবারে পরপর ঘটে গিয়েছে অঘটন। ডেভলপার এবং বিএমসি-র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে দ্বিতীয় পক্ষ, মুম্বইয়ে তাঁদের একমাত্র বাড়ি ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে পরিবারটিকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে হয়, বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। তবু ছেলের চিকিৎসায় কোনও ফাঁক আসতে দেননি তাঁরা। আইনি বিবাদ অবশ্য এখনও মেটেনি। চলছে। চিকিৎসার খরচও বাড়তে বাড়তে এখন আকাশচুম্বী। চার কোটি টাকা পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও দীক্ষিত পরিবারের কোনও সদস্য চান না, হরিশের বাবা-মায়ের মতো, আনন্দের জন্য নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন করতে। সরকারের সাহায্য চাইতে। কিংবা আদালতের কাছে হাত পাততে।
আনন্দের বাবার দাবি, ২৭ মাস ধরে ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জোগাতে তাঁদের কাঁধে চেপেছে ঋণের বোঝা। ইনসিওরেন্স সংস্থার তরফে তাঁদের উপর ন্যস্ত হয়েছে ৫০ লক্ষ টাকার অতিরিক্ত ঋণ। কীভাবে তা মেটাবেন, উত্তর নেই কারও কাছে। আনন্দের বাবার কথায়, ‘‘আমরা আর্থিকভাবে নিঃস্ব। তবু নিজের সবকিছু দিয়ে দিয়েছি ছেলের মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাকটা আর একবার শুনব বলে।’’ আর মা বলছেন, ‘‘আমি এখনও মিরাকলের অপেক্ষায়। আমাদের ঘর চলে গিয়েছে। ছেলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি। তবু আমার বিশ্বাস জেগে আছে। একদিন আমার ছেলে ঠিক জেগে উঠবে।’’
