নাজিরাবাদে জলাভূমি ভরাট করে মোমোর ‘বেআইনি’ কারখানা তথা গোডাউন। অভিযোগ, নেই পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা। নেই ফায়ার লাইসেন্সও। কিন্তু গোডাউনে মজুত করে রাখা অতিরিক্ত পরিমাণ পাম অয়েল থেকে শুরু করে প্যাকেজিংয়ের জন্য বিপুল দাহ্য পদার্থ। তার উপর ভর্তি ঠান্ডা পানীয় ও এনার্জি ড্রিঙ্ক। পুলিশ ও দমকলের অভিযোগ, ওই দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো গোডাউনে। ভিতর থেকে তালাবন্ধ করে রাখা ছিল মূল গেট। গেটের চাবি ছিল অফিস ঘরে। কিন্তু আগুনের আতঙ্ক ও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় তাঁরা চাবি খুঁজে পাননি। তাই মূল গেট খুলে বের হতে পারেননি।
পিছনের গেট দিয়ে বের হতে চান তাঁরা। কিন্তু তখনই আগুনের প্রচণ্ড তাপে পিছনের গেটের কাছে মোমোর গোডাউনের শেড ভেঙে পড়ে। এছাড়াও পিছনের গেটের কাছে গঙ্গাধর দাসের ডেকরেটার্সের জিনিসপত্র ডাই করে রাখা ছিল। সেখানেও ধরে গিয়েছিল আগুন। তাই ‘ওয়াও মোমা’র তিন কর্মী পঙ্কজ হালদার, বাসুদেব হালদার ও রবিশ হাঁসদা আশ্রয় নেন গোডাউনের অফিসঘরে। কিন্তু তাঁরা এখনও নিখোঁজ। তাঁদেরই একজন বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিলেন, উদ্ধার করা না গেলে পুড়ে যেতে হবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁদেরই কেউ উদ্ধার করতে আসেননি। এই ঘটনার পর পুলিশ ও দমকলের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিরুদ্ধে। যদিও কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, গুদামটি ভাড়া করে চালানো হচ্ছিল। ডেকরেটরের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে মনে করা হচ্ছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আমাদের কর্মীদের বেরনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ২৩টি অগ্নি-নির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা ছিল গোডাউনে। সবরকম ব্যবস্থা করা ছিল। কিন্তু কিছুই করা যায়নি। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাঁদেরই সাহায্যার্থে সবরকম পদক্ষেপ করা হবে।
কারখানার ভিতরের অবস্থা। নিজস্ব চিত্র
পুলিশ ও দমকলের তরফ থেকেই অভিযোগ উঠেছে যে, নরেন্দ্রপুর থানা এলাকার নাজিরাবাদে নামি ব্রান্ডের মোমো কারখানা বেআইনিভাবে চলছিল। ছিল না দমকলের ছাড়পত্র। কীভাবে এতদিন ধরে এত বড় একটা মোমো কারখানা চলছে, তা নিয়ে উঠেছ প্রশ্ন। প্রায় পাঁচ হাজার স্কোয়ার ফুট জায়গা জুড়ে এই কারখানা। এখানে কঁাচা মোমো তৈরির পর তা মজুত করা হত অনলাইন খাবার কোম্পানিগুলিতে। এখান থেকে এই ডেলিভারি হত বিভিন্ন স্টলগুলোতে। কারখানার মধ্যে দিন ও রাত্রে কাজ চলত। মোমো তৈরির কাজে ব্যবহার করা হত প্রচুর পরিমাণ পাম অয়েল। এই দাহ্য পাম অয়েল বেআইনিভাবে মজুত করে রাখার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো গোডাউন তথা কারখানায়। এ ছাড়াও মূল গেটের সামনে ডাঁই করে সাজানো ছিল বিভিন্ন কোম্পানির ঠান্ডা পানীয়, এনার্জি ড্রিঙ্ক থেকে শুরু করে চাউমিনের প্যাকেট। কাঁচের বোতল থেকে শুরু করে নানা সামগ্রী। দমকলের ডিজি রণবীর কুমার জানান, কারখানাটি চলছিল পুরোপুরি বেআইনিভাবে। কোনওরকম ফায়ারের ছাড়পত্র ছিল না ও অডিটও করানো হয়নি। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে এই মোমো কারখানা ও গোডাউনের দুই সুপারভাইজার দাবি করেন, ‘‘আমাদের এখানে কোন কিছু বেআইনিভাবে চলছিল না।”
কারখানার ভিতরে দমকলকর্মীরা। নিজস্ব চিত্র
অভিযোগ উঠেছে, জলাজমি ভরাট করে বেআইনিভাবে গড়ে উঠেছে এলাকার কিছু অংশ। জমির কোনওরকম সরকারি কাগজপত্র ছিল না বলে জানা গিয়েছে পঞ্চায়েতের তরফে। নরেন্দ্রপুর থানার খেয়াদহ দু’নম্বর পঞ্চায়েতের এলাকার মধ্যেই পড়ে যেখানে ঘটেছে নাজিরাবাদ আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এখানেও মানুষের দাবি, আট থেকে দশ বছর ধরে চলছিল এই কারখানাটি। কারখানাটির পাশেই বিরাট আকারে তৈরি হয়েছিল ডেকরেটার্সের মালপত্র রাখার গোডাউন। সেটিও জলাজমি ভরাট করে তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। দিনের পর দিন এলাকা বাড়িয়ে চলছিল কারখানা ও গোডাউন ও কর্তৃপক্ষ। আবার জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, ওই ডেকরেটার্সের থেকে কারখানার কিছুটা অংশ ভাড়া নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। দুটি কারখানাই ছিল লোহার কাঠামো ও টিনের শেড দিয়ে তৈরি। এদিন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম জানান, এখানকার জলাভূমিগুলি ২০০৬ সালে ভরাট করা হয়েছিল। কেউ আইনের উর্ধ্বে নয় সকলকেই শাস্তি পেতে হবে। এখন জলাজমি ভরাট হয় না। রাজ্য সরকার খুবই কড়া ব্যবস্থা নেয়।
অভিযোগ, মূল গেটের সামনে ছিল দু’টি আগুন নেভানোর সিলিন্ডার। কর্মীরা আগুন নেভাবেন কী, আগুনের তাপে সেই সিলিন্ডারই চিঁড়েচ্যাপ্টা। মোমো তৈরির জন্য বেশ কিছু গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করা ছিল সেখানে। তিনটি রান্নাঘরে খাবার গরম করা থেকে শুরু করে মোমো বানানো চলত। সাধারণত, মূল গেট ভিতর থেকে বন্ধই থাকত। মাল নিতে কোনও গাড়ি এলে খুলে দেওয়া হত গেট। চাবি থাকত অফিসের ভিতর। রবিবার রাত তিনটে নাগাদ মোমো কারখানায় একটি মালবাহী গাড়ি আসার কথা ছিল। সেই কারণেই মূল গেট খোলা যায়নি।
