অর্ণব আইচ:মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগের পরেই তদন্তে তৎপর কলকাতা পুলিশ। প্রতীক জৈনের বাড়ি ও আইপ্যাকের অফিস থেকে নথি চুরিতে ‘অভিযুক্ত’ ইডি আধিকারিকদের শনাক্তকরণ শুরু করল পুলিশ। দুই জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর যে জওয়ান ও আধিকারিকরা ছিলেন, তাঁদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপরেই আজ শনিবার সকালে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ আধিকারিকরা। বাড়ির যাবতীয় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ এবং ডিভিআর সংগ্রহ করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতীক জৈনের বাড়ির পরিচারিকা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও বয়ান পুলিশের তরফে রেকর্ড করা হয়েছে বলে খবর। পুলিশ সূত্রে খবর, শনাক্তকরণের পর 'অভিযুক্ত'দের নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া পুলিশ শুরু করবে বলেই খবর।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টা নাগাদ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আধিকারিকরা লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালাতে শুরু করলেও তার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর ইডি মেল করে তল্লাশি সম্পর্কে কলকাতা পুলিশকে জানায়। তল্লাশির খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালেই দফায় দফায় পুলিশ আধিকারিক, এমনকী ডিসি (সাউথ) নিজেও প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান। তিনি ইডি আধিকারিকদের কথা বলার চেষ্টা করেন। ওই পুলিশকর্তার সঙ্গেও ইডি ও সিআরপিএফ ধাক্কাধাক্কি করে, এমনকী, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা কলকাতা পুলিশের কর্তা ও আধিকারিকদের দিকে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যান বলেও অভিযোগ।
পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে শেক্সপিয়র সরণি থানা ও বিধাননগরের ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানার পুলিশ তৃণমূলের নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য ও নথি চুরির তদন্ত শুরু করেছে। ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ৩(৫) ধারায় অপরাধমূলক সমান অভিপ্রায়, (৩০৩)২ ধারায় চুরি, ৩৩২(সি) ধারায় ঘরে অনুপ্রবেশ ও আইটি আইনে ৬৬ ধারায় মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে আচমকাই আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে হানা দেন ইডির আধিকারিকরা। খবর পেয়েই সেখানে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সুপ্রিমোর অভিযোগ অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন সংক্রান্ত দলীয় নথি ও বৈদ্যুতিন নথি ছিল লাউডন স্ট্রিটের বহুতল অভিজাত আবাসনে প্রতীক জৈনের বাড়ি ও সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দপ্তরে।
প্রতীকের বাড়িতে অজ্ঞাতপরিচয় ইডি আধিকারিক ও সিআরপিএফ আধিকারিকরা অনুপ্রবেশ করেন। নথিগুলি বাড়ি ও অফিসের ভিতর থেকে চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে অনলাইনে তথ্য পাচার করা হয়েছে বলেও পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে, শেক্সপিয়র সরণি থানায় পুলিশের পক্ষে স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকাল ন’টার পরই খবর পেয়ে শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশ প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে পৌঁছে যায়। সাধারণত কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি অথবা বাইরের রাজ্যের পুলিশ তল্লাশি চালানোর সময় স্থানীয় থানাকে জানিয়ে আসে। এই ক্ষেত্রে ইডি পুলিশকে না জানিয়ে তল্লাশি করতে আসে। থানার এক সার্জেন্ট খবর পেয়ে কয়েকজন পুলিশকর্মীকে নিয়ে সেখানে যান। অজ্ঞাতপরিচয় ইডি আধিকারিকরা ও উর্দি পরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্মীরা পুলিশকে বাধা দেন। তাঁদেরও ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দেখানো হয়নি পরিচয়পত্রও। তিনি তল্লাশির জন্য আদালতের ওয়ারেন্ট আছে কি না, জানতে চাইলে তাঁকে ধাক্কাও দেওয়া হয়।
এর পর ডিসি (সাউথ) প্রিয়ব্রত রায় শেক্সপিয়র সরণি থানার অতিরিক্ত ওসি ও কয়েকজন আধিকারিককে নিয়ে প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে ঢুকে ইডি আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। ইডি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকদের সঙ্গে পুলিশকর্তা ও আধিকারিকরা বচসা ও বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, কয়েকজন সিআরপিএফ জওয়ান তাঁদের দিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে যান। এমনকী, ডিসি (সাউথ) ও অন্য আধিকারিকদের ধাক্কা দেওয়া হয়। প্রথমে তল্লাশির ব্যাপারে কিছু না জানালেও বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার পর ইডি মেল করে কলকাতা পুলিশকে তল্লাশির কারণ সম্পর্কে জানায়। বৃহস্পতিবার সকাল ১১ট ২০ মিনিটে শেক্সপিয়র সরণি থানায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, বেআইনি অনুপ্রবেশ, পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই খবর লালবাজারে যাওয়ার পর পদস্থ পুলিশকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। তিনি ইডির সঙ্গে কথা বলেন। এক ইডি আধিকারিক নিজের পরিচয়পত্র দেখালেও তাঁদেরও ভিতরে যেতে দেওয়া হয়নি।
