shono
Advertisement
Mamata Banerjee

সিঙ্গুর থেকে সিবিআই, বারবার সফল! ফের ধরনাই বাংলার আস্থা অর্জনে হাতিয়ার মমতার

বঙ্গ রাজনীতিতে প্রকৃত অর্থে যদি কোনও স্ট্রিট ফাইটার থেকে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার পথে। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ধরনায়।
Published By: Subhajit MandalPosted: 10:24 AM Mar 06, 2026Updated: 10:24 AM Mar 06, 2026

ওরা রথে, আমরা পথে। বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি তথাকথিত রথযাত্রা শুরু করার পর এই স্লোগানই আপ্তবাক্য হয়ে উঠেছে তৃণমূলের। অবশ্য একটু ভুল বলা হল, পথে নামার জন্য তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। বঙ্গ রাজনীতিতে প্রকৃত অর্থে যদি কোনও স্ট্রিট ফাইটার থেকে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার পথে। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ধরনায়। ঠিক ২০ বছর আগে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলের যে ধরনা অনশন মঞ্চ থেকে বঙ্গে পরিবর্তনের সূচনাটা হয়েছিল, সেই একই মঞ্চে আবারও ধরনায় বসতে চলেছেন মমতা। এবারে লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন 'বেআইনিভাবে' বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র করছে, সেটা রুখে দেওয়া।

Advertisement

মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে শুক্রবার দুপুর থেকে ধর্মতলাই ঠিকানা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে যে এলাকায় অনশনে বসেছিলেন সেদিনের বিরোধী নেত্রী, সেখানেই শুরু হবে অবস্থান। রাতেও ধরনাস্থলে থাকবেন তিনি। সিঙ্গুরের মতোই তাঁর এই কর্মসূচিতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এবং সামাজিক সংগঠনগুলিকে শামিল হতে আহ্বান করেছেন। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, "মানুষই যদি ভোট দিতে না পারে, তা হলে কীসের ভোট? ইআরও-রা ফাইনাল করার পরও দিল্লির নির্দেশে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন কোনও দরজা নেই যেখানে গিয়ে ঠক ঠক করিনি। নির্বাচন কমিশন থেকে সুপ্রিম কোর্ট সর্বত্র গিয়েছি। কিন্তু এখনও বহু নাম বাদ। এর বিরুদ্ধেই বাংলার মানুষের ভোটরক্ষার স্বার্থে শুক্রবার থেকে রাস্তায় বসছি। সব জগতের মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ুন। প্রতিবাদ করুন। এটা বাংলার সম্মানের প্রশ্ন। দেখি, কত ধানে কত চাল।"

সাংবিধানিকভাবে সব স্তরের দরজায় কড়া নেড়েছেন তিনি। কিন্তু তারপরও বাংলার প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এর মধ্যে ৬৩ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম স্রেফ ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। আরও ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বিচারাধীন। তাঁদের ভোটাধিকার রক্ষায় এবার পথে নামা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। অতএব, নিজের পরীক্ষিত এবং সফল রাজনৈতিক হাতিয়ার ফের প্রয়োগ করতে চলেছেন মমতা। বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে, যখনই বাংলার মানুষকে চাপে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তখনই মমতা পথে নেমেছেন। এবং প্রতিবার তাঁর ধরনা রাজ্য রাজনীতিতে নয়া ইতিহাস রচনা করেছে।

বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে, যখনই বাংলার মানুষকে চাপে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তখনই মমতা পথে নেমেছেন। এবং প্রতিবার তাঁর ধরনা রাজ্য রাজনীতিতে নয়া ইতিহাস রচনা করেছে।

সময়টা ছিল ২০০৬ সালের ৪ ডিসেম্বর। সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে টানা ২৬ দিনের অনশনে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য রাজনীতিতে তখন পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি হচ্ছে। সেদিনের অনশন মমতাকে সেই পরিবর্তনের নেত্রী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তৎকালীন বাম নেতৃত্বের দম্ভ গুঁড়িয়ে দিতে পরবর্তী পাঁচ বছরের 'রক্তক্ষয়ী' আন্দোলন এবং ৩৪ বছরের বামশাসনের অবসানের ভিত সেদিনের ধরনামঞ্চ থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন মমতা। সেই অনশন মঞ্চে দলমত নির্বিশেষে বাম বিরোধী সকল শ্রেণির মানুষকে শামিল করতে সক্ষম হন মমতা। কার্যত গোটা দেশের রাজনীতিতে কেঁপে গিয়েছিল তৃণমূল নেত্রীর মানসিক দৃঢ়তায়।

২০০৬ সালে ধর্মতলায় মতার অনশন। ফাইল ছবি।

কাট টু ২০১৯। ভোটের আগে ফের বাংলার 'প্রশাসনে'র উপর আক্রমণ। এবারে কোনওরকম ওয়ারেন্ট ছাড়াই কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই অভিযান। সিবিআই অভিযোগ তুলেছিল, সারদা চিটফান্ড মামলার তদন্তকারী হিসাবে তিনি যা যা তথ্য প্রমাণ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, সেগুলোর সবটা নাকি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। ঠিক লোকসভা ভোটের আগে সারদার মতো পুরনো মামলায় সিবিআইয়ের হঠাৎ সক্রিয় হওয়া রাজনৈতিক মহলের অনেককেই চমকে দিয়েছিল। তাছাড়া মমতা তথা রাজ্য প্রশাসনের কাছে সেটা ছিল সাংবিধানিক ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, কলকাতার ক্ষমতাসীন পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে কোনওরকম ওয়ারেন্ট ছাড়া এভাবে সিবিআই হানা এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা, আসলে রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ। এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবমাননা। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে সেদিন আবারও পথে নামেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। আবারও সেই ধর্মতলা-আবারও সেই ধরনা। মুখ্যমন্ত্রীর সেই ধরনার সুফল, রাজীব কুমারকে স্পর্শ করতে পারেনি সিবিআই। সেদিনের সেই ধরনা সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী মুখ হিসাবে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে মমতাকে। সেবার মমতার ধরনা মঞ্চে চন্দ্রবাবু নায়ডু, ফারুখ আবদুল্লাদের মতো ভিনরাজ্যের নেতারাও এসেছিলেন। অধুনা যে ইন্ডিয়া জোটের মঞ্চ, সেটা সেসময় ইউনাইটেড ইন্ডিয়া নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

২০১৯ সালে কেন্দ্রের প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে ধরনা মমতার। ফাইল ছবি।

এরপরও ধরনায় বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অতীতে এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ২০২১ সালে যখন তিনি ভাঙা পায়ে গোটা রাজ্যে দাপিয়ে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, তখন কমিশনের আচমকা খাড়া। এবার, ২৪ ঘণ্টার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর প্রচারে নিষেধাজ্ঞা। সেই 'অন্যায়ে'র প্রতিবাদেও জননেত্রী বেছে নিয়েছিলেন ধরনার পথ। সেবার গান্ধীমূর্তির পাদদেশে ২৪ ঘণ্টা একাকী নীরব প্রতিবাদ করেন মমতা। গান গেয়ে, ছবি এঁকে। সেই প্রতিবাদে যে গোটা রাজ্যের মানুষও শামিল হয়েছিল, সেটার প্রমাণ একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। এসবের মাঝেও একাধিকবার বিভিন্ন ইস্যুতে মমতার ধরনা-অবস্থান দেখেছে রাজ্যবাসী। সিঙ্গুরে জমি ফেরানোর দাবিতে ২০০৮ সালের ২৪ আগস্ট টানা ১৫ দিন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে অবস্থান করেছিলেন মমতা। এমনকী দিল্লিতেও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।

গান্ধীমূর্তির পাদদেশে একাকী প্রতিবাদ মমতার। ফাইল ছবি।

এবার ২০২৬। রাজ্যের একটা বড় অংশের ভোটারের উপর আশু সংকট। প্রতিবাদের সব রাস্তা যখন বন্ধ, তখন সেই ধরনার পথে মমতা। স্থান, আর পাত্র এক। সময় আর ইস্যু আলাদা। ফলাফলটাও কি আগের প্রতিবারের মতো সুদূরপ্রসারী হবে? ভুলে গেলে চলবে না, মমতা যখনই ধরনায় বসেছেন রাজ্য রাজনীতি উথালপাথাল হয়েছে। মমতা যখনই ধরনায় বসেছেন, সেটার ফল সুদূরপ্রসারী হয়েছে। আজ যখন বঙ্গবাসীর একটা বড় অংশের সামনে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই, তখন মমতা এভাবে ধর্মতলার রাজপথে বসে পড়লে, সেটারও যে সুদূরপ্রসারী ফলাফল হতে চলেছে, তা অনুধাবন করতে হয়তো রাজনৈতিক জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement