লাল শান্তিনিকেতনে চায়ের আড্ডাটা নেই। ঐতিহ্যবাহী কালোর দোকানে রাজনৈতিক চর্চা, উত্তাপ এখন অতীত। ভাঙাচোরা দেওয়ালে এখন ভোট প্রচার যুদ্ধ। রতনপল্লির 'কালোর চায়ের দোকান'-একসময়ের প্রাণবন্ত আড্ডাকেন্দ্র। আজ তা শুধুই স্মৃতির পাতায়। লেবু মেশানো লাল চায়ের কাপে ভর করে যে উষ্ণতা, যে তর্ক-বিতর্ক আর রাজনৈতিক চর্চা একদিন মুখর করে রাখত এই প্রাঙ্গণ। তা এখন অতীতের আবছা প্রতিধ্বনি মাত্র। ভাঙাচোরা, জরাজীর্ণ দেওয়াল আজ যেন সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোরই নীরব সাক্ষী।
ঐতিহ্যে ভরপুর এই চায়ের দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে বহু ইতিহাস। ১৯৪০ সালে মহাত্মা গান্ধী শান্তিনিকেতনে এসে এই দোকানে চা পান করেছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিঙ্কর বেইজ, নন্দলাল বসু থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অমর্ত্য সেন, সুনীতি পাঠক, সুপ্রিয় ঠাকুর সহ অসংখ্য গুণীজনের পদচারণায় মুখর ছিল এই স্থান। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও এটি ছিল বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
একসময় লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনের আগে গুণীজন প্রবীণ আশ্রমিকদের এখানে বসত জমজমাট চায়ের আড্ডা। তর্ক-বিতর্কে উত্তপ্ত হয়ে উঠত পরিবেশ। রাজনৈতিক আলোচনায় প্রাণ পেত দোকানটি। কিন্তু আজ সেই উষ্ণতা মলিন। দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আড্ডার রেওয়াজও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়েছে। এখন ভগ্নপ্রায় দেওয়াল জুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারলিখন। যেন আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে নিঃশব্দ প্রচারযুদ্ধ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, "রতনপল্লির কালোর দোকান সকলের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়। এখন দোকানটি না থাকলেও তার দেওয়ালই যেন রাজনৈতিক বার্তার বাহক হয়ে উঠেছে।"
প্রবীণ বাসিন্দা শান্তভানু সেন ও সুব্রত সেন মজুমদার স্মৃতিচারণ করে বলেন, "১৯১৮ সাল থেকে এই দোকান শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতির অংশ ছিল। আমরা প্রতিদিন সকালে-সন্ধ্যায় এখানে আড্ডা দিতাম। আজ সবই নস্টালজিয়া। আক্ষেপ হয়, সেই দিনগুলো আর ফিরে আসবে না।" প্রথমে আশ্রম প্রাঙ্গণের ভিতরেই এই চায়ের দোকান ছিল। পরে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর সেটি স্থানান্তরিত হয় রতনপল্লিতে। ভুবনডাঙার বাসিন্দা কালিপদ দলুই, যিনি 'কালো' নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মদন দলুই কিছুদিন দোকানটি চালালেও, কয়েক বছর আগে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
আজ আর নেই সেই মাটির উনুন, কাঠের বেঞ্চ, কিংবা চায়ের কাপে ভেসে ওঠা প্রাণবন্ত আলোচনা। রয়েছে শুধু ভাঙা কাঠামো আর স্মৃতির ভার। তবু, সবকিছুর পরেও শান্তিনিকেতনের 'কালোর চায়ের দোকান' তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বে এখনও অমলিন। নীরবতায়ও যেন বলে চলে এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প। ঐতিহ্য হারিয়ে রাজনৈতিক পোস্টারে ঢাকা 'কালোর চায়ের দোকান'। ভগ্ন দেওয়াল জুড়ে স্থান পেয়েছে রাজনৈতিক প্রচার। সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে গেলেও, এই দোকান আজও শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়া। স্মৃতিতে অমলিন ঐতিহ্যবাহী আড্ডাস্থল।
