ব্রেল পদ্ধতিতে নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত খুঁটিনাটি জানতে পারবেন দৃষ্টিহীনরা। রাতদিন জেগে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ টি আসনের ব্রেলের কাজ করছেন এ রাজ্যের তিনটি ব্রেল প্রেস। তার মধ্যে একটি বেহালায়, বাকি দুটি বারুইপুর এবং নরেন্দ্রপুর। তবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রেল প্রেস। রাজ্যে ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ১৯৩ টি আসনের পুরো কাজটাই করছে নরেন্দ্রপুরের এই প্রেস। আর তা পৌঁছে যাচ্ছে রাজ্যের সাগর থেকে পাহাড় - সমস্ত জায়গায়।
সারা রাজ্যেই চলছে বিধানসভা নির্বাচনের (Bengal Election 2026) তোড়জোড়। হাতে গোনা কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে ভোট প্রক্রিয়া। আর তার মধ্যে শুক্রবার থেকে প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে পৌঁছতে শুরু করেছে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তৈরি ব্রেল ভোটার স্লিপ। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে দৃষ্টিহীন ভোটারদের জন্য নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ ব্যবস্থা। প্রতিটি বিধানসভার জন্য গড়ে ২০০ থেকে আড়াইশো ভোটার স্লিপ তৈরি করতে হচ্ছে। আর সবটাই নির্ভুলভাবে ব্রেল প্রেসে তৈরি হচ্ছে। আর এই নির্দিষ্ট হরফে হাত স্পর্শ করেই দৃষ্টিহীন মানুষরা বুঝে যাবেন তাঁদের প্রার্থীর যোগ্যতা, বয়স, নাম সবটাই।
ভোটার স্লিপের ব্রেল পদ্ধতির কাজ চলছে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রেল বিভাগে। নিজস্ব ছবি
যখন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট হতো তখন আলাদা করে ব্রেল ব্যালট ছাপাতে হতো। সেই পদ্ধতির পরিবর্তন হওয়ার পর যখন ইভিএম মেশিনে ভোটদান শুরু হল তখন ইভিএমে আলাদা কাগজের সঙ্গে দৃষ্টিহীন ভোটারদের জন্য ব্রেলের পছন্দের প্রতীক এবং ভোটারের নাম দেওয়া থাকে, যা থাকে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে। দৃষ্টিহীন ভোটাররা ইভিএম মেশিনে গিয়ে বোতাম চাপলেই নির্দিষ্ট স্থানে ভোট সম্পন্ন হয়। এতদিন এই সমস্ত পদ্ধতিগুলি সম্পর্কে মোটামুটি সমস্ত দৃষ্টিহীন ভোটাররা অবগত হয়েছেন। এবার আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এই সমস্ত দৃষ্টিহীন ভোটারদের জন্য। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভোটার স্লিপ ব্রেল পদ্ধতিতে তৈরি। অর্থাৎ ব্রেল পদ্ধতিতে ভোটার স্লিপের ব্যবহার।
ভোটার স্লিপের ব্রেল পদ্ধতির কাজ চলছে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রেল বিভাগে। নরওয়ে তৈরি এই মেশিনের মাধ্যমে ছাপা হচ্ছে ভোটার স্লিপ। যথেষ্ট কষ্ট এবং সময়সাপেক্ষ এই কাজ করে যাচ্ছেন গুটি কয়েক কর্মী। প্রথমে আলাদাভাবে কম্পিউটারে টাইপ করে প্রতিটি ভোটারদের জন্য আলাদা আলাদা স্লিপ ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে লোকসভা বা বিধানসভা কেন্দ্র, পার্ট নম্বর সবই থাকছে সেখানে। যা একেবারে অভিনব। ফলে কারও সাহায্য ছাড়াই দৃষ্টিহীন ভোটার নিজে থেকে বুঝিয়ে নিতে পারবেন, তাঁর কোথায় ভোটকেন্দ্র হয়েছে। ভোটার স্লিপে তাঁর নাম ও এপিক নাম্বার কোথায় আছে। প্রথম দফায় যে সমস্ত ভোটকেন্দ্রগুলিতে ভোট হবে ইতিমধ্যেই সেই সমস্ত জায়গাতে এই ভোটার স্লিপ পৌঁছাতে শুরু করেছে। আর এই পুরো কাজটি খতিয়ে দেখছেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্লাইন্ড বয়স অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল স্বামী মহানন্দাজি মহারাজ।
পুরো কাজটি খতিয়ে দেখছেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্লাইন্ড বয়স অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল স্বামী মহানন্দাজি মহারাজ। নিজস্ব ছবি
এ বিষয়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রেইল বিভাগের সিনিয়ার রিজোনাল ম্যানেজার অরূপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও বিভিন্ন বই এবং ব্রেল সংক্রান্ত অন্য কাজও আমরা করে থাকি। তবে ভোটের সময় নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে আমাদের এই কাজ শেষ করতে হয়। অতিরিক্ত কাজ হিসেবে এই কাজ শেষ করতে যথেষ্ট সময় দিতে হয়, প্রত্যেক কর্মীকে। রাতদিন খেটে তবেই এই কাজ সময়মতো দেওয়া সম্ভব হয়। অন্যান্য কাজ বিশেষ করে পাঠ্য বই তৈরি থেকে আরও যে কাজগুলো করা হয়, সেগুলোও সেই সময় বন্ধ রাখতে হয়। স্কুল-কলেজের কাজের চাপ বেড়েই চলেছে।'' তার মধ্যে ব্রেল পদ্ধতিতে ভোটের বিভিন্ন তথ্য ভোটারদের জানাতে নির্বাচন কমিশন অনেক বেশি ব্রেলের উপর নির্ভর করছেন। সে কারণেই ব্রেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কয়েকজন কর্মী নিয়েই নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের রেল বিভাগ অংশগ্রহণ করেছেন গণতন্ত্রের এই মহাযজ্ঞে। আর গণতন্ত্রের এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা অংশগ্রহণ করতে পেরে খুশি।
