shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

অভয়া আবেগে ভোটের অঙ্ক পানিহাটিতে! রত্না-কলতানের লড়াইয়ে কোথায় দাঁড়িয়ে তৃণমূল?

পানিহাটিতে ভোটের ফলাফল যাই হোক, আগামী দিনে এই কেন্দ্র বঙ্গ রাজনীতিতে একটা নজির রাখবে।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 06:58 PM Apr 17, 2026Updated: 07:38 PM Apr 17, 2026

লোকসভা হোক বা বিধানসভা, নির্বাচনী লড়াইয়ে সব কেন্দ্রের সমান গুরুত্ব থাকলে কোনও কোনওটা নিজস্ব চরিত্রের কারণেই বাড়তি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ছাব্বিশে ভোটে (West Bengal Assembly Election) তেমন এক নজরকাড়া কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পানিহাটি। অত্যন্ত এক মর্মান্তিক, আলোড়ন ফেলা ঘটনা ঘিরে আপাত সাদামাটা কেন্দ্রটি চলে এসেছে প্রচারের আলোয়। বছর দুই আগে আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের খবর ধাক্কা দিয়েছিল গোটা সমাজকে। জাস্টিস, রাতদখল, জুনিয়ার ডাক্তারদের আন্দোলন - হাজার হাজার মানুষের সংঘবদ্ধ ও স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদে সেদিন যে পানিহাটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, তাকে কেন্দ্র করেই বোধহয় তৈরি হচ্ছিল আজকের নির্বাচনী ক্ষেত্র। নাহলে কেনই বা ধর্ষণ, খুনের ঘটনায় একজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়ার পরও সুবিচার নিয়ে সংশয় থাকবে নির্যাতিতার পরিবারের? সেই সুবিচারের দাবিতে নির্বাচনের প্রায় শেষ ধাপে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়ে প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হবেন নির্যাতিতার মা? পানিহাটির ভোট অঙ্ক আজ কেবল রাজনৈতিক নয়, সমাজের জ্বলন্ত সমস্যা, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধটাই এখানকার যুদ্ধের মূল ইস্যু। ছাব্বিশের নির্বাচনে তাই হটস্পট পানিহাটি।

Advertisement

যে কারণে পানিহাটি আজ বঙ্গ রাজনীতিতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল গত প্রায় দেড় বছরে, তার কেন্দ্র এই এলাকাই। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখানে সবার মুখে মুখে একটাই কথা শোনা যায় - 'জাস্টিস', 'সুবিচার'। এই শব্দগুলোকে ধারালো আন্দোলনের রূপ দিয়ে ফের বঙ্গ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল বামেরা। হাজার হাজার বাম যুব, ছাত্র সংগঠনের নেতানেত্রীরা একজোট হয়েছিলেন।

বারাকপুর থেকে বিটি রোড ধরে সোজাসুজি এগোতে থাকলে সোদপুর মোড়। তার বাঁ দিকেই চোখে পড়বে পানিহাটি পুরসভা। এইই সেই এলাকা। আর ডানপাশে গঙ্গার দিকে বেশ খানিকটা। এর বাইরেও খানিকটা অংশ এই বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। তবে যে কারণে পানিহাটি আজ বঙ্গ রাজনীতিতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল গত প্রায় দেড় বছরে, তার কেন্দ্র এই এলাকাই। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখানে সবার মুখে মুখে একটাই কথা শোনা যায় - 'জাস্টিস', 'সুবিচার'। এই শব্দগুলোকে ধারালো আন্দোলনের রূপ দিয়ে ফের বঙ্গ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল বামেরা। হাজার হাজার বাম যুব, ছাত্র সংগঠনের নেতানেত্রীরা একজোট হয়েছিলেন। কিন্তু এমন তো নয় যে পাড়ার মেয়ে, ভাবী ডাক্তারের সঙ্গে সেদিন তাঁর নিজের হাসপাতালে ঘটে যাওয়া নারকীয় অন্যায়ের কোনও বিচার হয়নি। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কলকাতা পুলিশ অভিযুক্ত হিসেবে যাকে গ্রেপ্তার করেছিল, সেই সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কেই পরে তদন্তে নেমে সিবিআইও মূল অভিযুক্ত বলেই চার্জশিট দেয়। শিয়ালদহ আদালতের বিচারে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তাহলে ফের কেন সুবিচারের দাবিতে এখনও চোখের জল মুছে সজোরে দাবি করছে নির্যাতিতার পরিবার ও পানিহাটিবাসী? এর উত্তরও এতদিনে সকলের জানা। মূল অভিযোগ হল, একা সঞ্জয় রায় নয়, আর জি কর হাসপাতালে এই জঘন্য অপরাধের নেপথ্যে আরও কেউ বা কারা জড়িত, যাদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসকদল। হয়ত তাই নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথের উপলব্ধি, ক্ষমতায় না গেলে সুবিচার পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভোটের লড়াই তো রাজনীতির।

পানিহাটি (Panihati) কেন্দ্রে এবার পুরোদমে ত্রিমুখী লড়াই - তৃণমূল, বিজেপি এবং সিপিএম। এই সমীকরণ বোঝার আগে চলুন, বিধানসভা কেন্দ্রের কিছু খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া যাক। এই কেন্দ্রের মোট ভোটার প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৪৯ ও মহিলা ৫১ শতাংশ। এখানে মুসলিম ভোটার মোটামোটি ৪ থেকে ৫ শতাংশ। তবে এসআইআরে এখানে বেশ ভালো নামই বাদ পড়েছে - মৃত, স্থানান্তরিত নিয়ে প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি। নিকাশি, জল জমার সমস্যা এখনও নিত্যসঙ্গী এখানকার বাসিন্দাদের। তবে ছাব্বিশের ভোটে এই সমস্ত ইস্যুই গৌণ হয়ে যাচ্ছে। যা মুখ্য, তা হল অভয়াকে কেন্দ্র করে নারী নিরাপত্তার বিষয়টি। আর সেই ইস্যুকে প্রথম উসকে দিয়েছে বামফ্রন্ট। এখানে সিপিএমের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে কলতান দাশগুপ্তর নাম, যিনি আর জি করের কন্যার সুবিচারের দাবিতে আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। 'বোনে'র সুবিচার চেয়ে পথের আন্দোলন করতে গিয়ে মিথ্যা মামলায় তাঁকে জেলেও থাকতে হয়েছে। পানিহাটির রণাঙ্গনে সেই মুখকে এগিয়ে দেওয়া বামেদের কৌশল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।

পানিহাটি কেন্দ্রে প্রচারের সমস্ত আলো কেড়ে নিচ্ছেন একজনই, তিনি বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথ। 'মেরুদণ্ড বিক্রি নেই', 'জাস্টিস ফর অভয়া', 'শক্তিরূপেণ' শাড়ি-ব্লাউজে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি জিতলে পানিহাটি জিতবে। করজোড়ে এলাকাবাসীর কাছে রত্নাদেবী বলছেন, ‘‘আমি যা হারিয়েছি, তা তো হারিয়েইছি। আমার ঘর শূন্য থাকবে। নতুন করে কিছু পাওয়ার নেই আমার। কিন্তু আমার আপনাদের অনেক কিছু দেওয়ার আছে। আমি বিধানসভায় গিয়ে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বলতে পারব। আমার জয় মানে আপনাদেরই জয়।''

তুলনায় এখানকার প্রার্থী বাছতে গিয়ে তৃণমূল এত হিসেবনিকেশ করেনি। বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষকে ফের টিকিট দিতে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বয়সের কারণে তিনি অব্যাহতি চান। ফলে এখানে নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে প্রার্থী করা হয়েছে। এলাকাবাসীর কাছে তিনি 'পুচিদা'। পাড়ার পরোপকারী ছেলে বলে পরিচিত। সেই ইমেজ আর বাবার সংগঠনের জোরে প্রচার চালাচ্ছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তো বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথ, কীভাবে দেখছেন ভোটের লড়াইকে? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে জোড় হাতে তীর্থঙ্করবাবু বলছেন, ‘‘কাকিমা তাঁর মতো করে লড়েছেন এতদিন। সেসময় আমরাও তো এই বিচারের দাবিতে সরব ছিলাম। আজও কাকিমা লড়ছেন, আমার তাঁকে নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু কাকিমা, আপনার দলের বিরুদ্ধেও যে কিছু বলব না, তেমন তো নয়। এটা রাজনীতির লড়াই। বিজেপি যেভাবে বাংলার সংস্কৃতি নষ্ট করে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। প্রচার বলতে আমার আলাদা করে কিছু করার নেই। এখানে সবাই আমাকে চেনেন, জানেন। বরাবর আমি পাড়ায় থাকি। এখন সেই চেনা মানুষগুলোর কাছে আরও বেশি করে যাচ্ছি, তাঁরা আশীর্বাদ করছেন।''

তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ 'পাড়ার ছেলে'। ছবি: ফেসবুক।

প্রায় একই বক্তব্য সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তেরও। তিনিও বলছেন, ‘‘বিজেপি প্রার্থী নন, প্রতিদ্বন্দ্বী নন। কাকিমা (রত্না দেবনাথ) আমার কাছে সবসময় কাকিমাই থাকবেন। এই সম্পর্কটা ভোটের ময়দানে কোনও প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু সুবিচারের দাবিতে আমাদের লড়াইটা চলবে। ওই ঘটনায় জড়িত যাঁরা এখনও স্রেফ শাসকদলের ছত্রছায়ায় আজ নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার, শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা দাবিতে সরব থাকব। এছাড়া রাজ্যের যা যা সমস্যা - কর্মসংস্থান, শিক্ষা দুর্নীতি, সেসব নিয়ে আমরা মানুষের দরবারে যাচ্ছি। বোঝাচ্ছি, বামপন্থাই একমাত্র বিকল্প।''

আর জি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ কলতান দাশগুপ্ত এখানকার সিপিএম প্রার্থী। ছবি: ফেসবুক

তবে পানিহাটি কেন্দ্রে প্রচারের সমস্ত আলো কেড়ে নিচ্ছেন একজনই, তিনি বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথ। 'মেরুদণ্ড বিক্রি নেই', 'জাস্টিস ফর অভয়া', 'শক্তিরূপেণ' শাড়ি-ব্লাউজে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি জিতলে পানিহাটি জিতবে। করজোড়ে এলাকাবাসীর কাছে রত্নাদেবী বলছেন, ‘‘আমি যা হারিয়েছি, তা তো হারিয়েইছি। আমার ঘর শূন্য থাকবে। নতুন করে কিছু পাওয়ার নেই আমার। কিন্তু আমার আপনাদের অনেক কিছু দেওয়ার আছে। আমি বিধানসভায় গিয়ে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বলতে পারব। আমার জয় মানে আপনাদেরই জয়।''

এখানেই আসল অঙ্ক। রাজনীতির হিসেব বলছে, যে অভয়া কাণ্ড নিয়ে বামেরা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলল, তাঁদের সঙ্গে না থেকে রত্নাদেবী কেন বিজেপির মতো দলের প্রার্থী হলেন? মেয়ের অপরাধীদের আড়াল করার যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন কলকাতা পুলিশের বিরুদ্ধে, ঠিক ততটা অভিযোগ তো থাকে সিবিআইয়ের বিরুদ্ধেও। কারণ, আর জি করে ধর্ষণ-খুনের নিষ্পত্তি করেছে সিবিআই। তা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারে অধীনস্ত। তবে সিবিআই কি সঠিক বিচার দিতে পেরেছে?

বিজেপি প্রার্থী অভয়াজননী রত্না দেবনাথ। ছবি: ফেসবুক

এই প্রশ্ন তুলেও রত্নাদেবীর বিজেপি প্রার্থী হওয়া স্থানীয় মানুষজনের অনেকেই ভালোভাবে নিচ্ছেন না। তাঁদের সকলের বক্তব্য, ‘‘মেয়ে হারানোর শোক আমরা সবাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। কিন্তু রাজনীতি তো রাজনীতির জায়গায়। আবেগ দিয়ে কি ভোটের লড়াই হয়?'' কেউ কেউ বাঁকা মন্তব্যই করছেন - ‘‘মেয়ের আবেগ উনি ভোট ময়দানে কাজে লাগাচ্ছেন।'' আবার এলাকায় বরাবর সিপিএমের হয়ে কাজ করা এক যুবক মেনে নিচ্ছেন, পানিহাটির ভোটে অভয়াই ফ্যাক্টর। তাঁর কথায়, ‘‘ঘরে ঘরে মহিলারা সবাই অভয়ার জন্য আজও কাঁদে। তাঁদের কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন নেই। কিন্তু এবার তাঁরা রত্নাদেবীকে সরাসরি সমর্থন করবেন ভোটের মাধ্যমে। বামেরা কিছু বেশি ভোট পাবে। আর তৃণমূল তৃতীয় স্থানে নেমে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।''

আবার কোনও কোনও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে, অঙ্কটা উলটোও হতে পারে। অর্থাৎ অভয়া ইস্যুতে ভোট হলে তা ভাগাভাগি হবে বিজেপি ও সিপিএমের মধ্যেই। যাঁরা রত্নাদেবীর ভোটে দাঁড়ানো ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না, তাঁদের সমর্থন নিশ্চিতভাবেই আন্দোলনকারী কলতান দাশগুপ্তের দিকে থাকবে। তাতে সুবিধা হতে পারে তৃণমূলেরই। ফলাফল যাই হোক, আগামী দিনে পানিহাটি কিন্তু একটা নজির রাখবে। অভয়া আবেগের প্রতিফলন যদি ব্যালট বাক্সে সেভাবে না হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে ক্ষমতার সিঁড়ি ধরে সুবিচার পাওয়ার ধারণা তৈরি হয়েছিল রত্নাদেবীর, তা ব্যর্থ। আর তিনি জিতে সত্যিই শেষমেশ সুবিচার পাইয়ে দিতে সফল হলে তাঁর মন্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হবে - ক্ষমতায় গেলে সুবিচার পাওয়া যায়। যা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার জন্য খুব ভালো লক্ষণ হবে না।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement