ঘড়ির কাঁটায় তখন সোমবার রাত ১০টা ১৫। পুরুলিয়ার সাঁতুড়ি থানার মোবাইল বেজে উঠল। রিসিভ করামাত্র ডিউটি অফিসার শুনতে পেলে এক পুরুষকণ্ঠ। বলছেন, ‘‘আমি আত্মহত্যা করব। বাপেরবাড়ি থেকে আসছে না স্ত্রী।" একথা শুনেই ঘাবড়ে যান ডিউটি অফিসার। প্রথমে বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। মনে হয়েছিল খানিকটা রঙ্গ-রসিকতা। কিন্তু যখন টের পেলেন 'বউপাগলা' যুবক সত্যিই নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছেন, তখন আর ডিউটি অফিসারের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ওই যুবক সত্যি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ওই অবস্থায় অফিসার কোনওক্রমে তাঁর নাম-ঠিকানা জেনে সাঁতুড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ সুপ্রতীক মণ্ডলকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে টিম সাজিয়ে ঘটনাস্থলে যান তাঁরা। গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন ওই যুবককে। হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে আত্মঘাতী হওয়া থেকে ওই যুবকের জীবন বাঁচাল পুলিশ। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, পুরুলিয়া পুলিশের জরুরি নম্বর বিলি কতটা সফল। সেকথা মানছেন ওই এলাকার মানুষজন।
আত্মহত্যা করতে যাওয়া যুবককে নিয়ে হাসপাতালে পুরুলিয়ার সাঁতুড়ি থানার পুলিশ। সোমবার রাতে। নিজস্ব ছবি
গত শনিবার থেকে পুরুলিয়ার নতুন পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজের উদ্যোগে পুরুলিয়া পুলিশের জরুরি নম্বর বিলির ইনফরমেশন স্লিপ বিতরণ করার কাজ শুরু হয়। ফোন নম্বরটি - ৮১৪৫৫০০২০২। এই জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে থানা ভিত্তিক নম্বর, সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ-সহ জেলা কন্ট্রোল রুমের নম্বর বিলির কাজ চলে। সেই নম্বরই পেয়েছিলেন সাঁতুড়ি থানার পলাশপাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা বছর ছাব্বিশের রাজমিস্ত্রি ওই যুবক। নিজের মানসিক কষ্টের কথা থানার নম্বরে জানান তিনি।
ওই যুবকের ফোনের ২০ মিনিটের মধ্যেই তাঁর কাছে পৌঁছে যায় পুলিশ। কিন্তু এই ২০ মিনিট সময় যে পুলিশের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বুঝতে পারেন কেবল তাঁরাই। আত্মহত্যার পথে পা বাড়ানো ওই যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানেই কোনও অঘটন! তাই ওই সময়ে বারবার তাঁকে ফোন করে যান পুলিশকর্মী। কখনও ফোন কেটে দেন, কখনও তিনি ফোন রিসিভ করেন। আবার কখনও ফোন ধরেনও না। এর মধ্যেই সাঁতুড়ি থানার পুলিশ ওই গ্রামেই ওই যুবককে গাছে ঝুলতে দেখেন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে উদ্ধার করে সঙ্গে সঙ্গে সাঁতুড়ির মুরাড্ডি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করার পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় রঘুনাথপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। এখন খানিকটা সুস্থ রয়েছেন ওই যুবক।
তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে পুলিশ জানার চেষ্টা করছে দাম্পত্য কলহের কারণ ঠিক কী? যতটুকু জানতে পেরেছেন তা খানিকটা এরকম - সংসারে অশান্তির জেরে স্ত্রী রয়েছেন তাঁর বাপের বাড়িতে। ওই যুবক স্ত্রীকে বাপের বাড়িতে আনতে গেলেও তিনি আসেননি। উলটে ঝামেলা বাঁধে। তাই তিনি নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। পুলিশই তাঁর জীবন ফিরিয়ে দিল। তবে পুলিশ কি দাম্পত্য কলহ মেটানোর দায়িত্ব নেবে? সেই আশ্বাস অবশ্য এখনই মিলছে না।
