গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষার দিকে এগোনো যায় যত, ততই সাপের ভয় বাড়ে। বাড়ির কোন আনাচ-কানাচে যে ঢুকে বসে থাকতে পারে বিষধর সাপ, সামান্য ভুলচুকে ছোবল বসাতে পারে— সে ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় গৃহস্থকে। সাপের বিষের চিকিৎসা থাকলেও, মুখের সামনেই যদি ফণা তুলে দাঁড়ায় ভয়াবহ এক সরীসৃপ, কারই বা ভয় করবে না?
কিন্তু যদি বলি এমন এক গ্রামের (snake village) গল্প, যেখানে ভয় তো দূরের কথা, নিশ্চিন্তে সহাবস্থান করে সাপ ও মানুষেরা, তবে কি বিশ্বাস করবেন? এ কোনও সিনেমার গল্প নয়। একেবারে জলজ্যান্ত বাস্তব। বাইরের বিশ্বের কাছে তা আজগুবি লাগলেও, এ গল্প যাদের নিয়ে, তাদের কাছে দিনের আলোর মতো স্বাভাবিক।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ গ্রামের মানুষ সাপের সঙ্গেই বেড়ে ওঠে বলে তাদের গতিপ্রকৃতিকে বোঝে অন্তর দিয়ে। ফলে সহাবস্থানে কোনও অসুবিধা হয় না। এমনকী, এখানকার মানুষকে সাপে কামড়েছে বলেও শোনাই যায় না তেমন।
কুকুর-বিড়ালের মতোই সহজভাবে গ্রাম জুড়ে বাস করে ভয়ানক বিষধর সাপ।
মহারাষ্ট্রের সোলাপুর জেলার শেতফল গ্রামের। স্থানীয়রা একে ‘সাপেদের গ্রাম’ বলেই চেনে। সাপেদের যে ভয় পাওয়া যেতে পারে, তা বুঝি জানাই নেই গ্রামের মানুষের। কুকুর-বিড়ালের মতোই সহজভাবে গ্রামজুড়ে বাস করে ভয়ানক বিষধর সাপ। যে-সে নয়, স্বয়ং গোখরো সাপেদের আস্তানা এই গ্রাম। যাদের দোদুল্যমান কল্কা-আঁকা ফণা দেখলে আমার-আপনার বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবে, তাদেরকেই রীতিমতো আদর-যত্ন করে থাকতে দেয় শেতফলবাসী। এখানকার প্রত্যেক গৃহস্থ বাড়িতেই নাকি সাপেদের বিশ্রামের জন্য আলাদা করে বরাদ্দ করা থাকে নির্দিষ্ট স্থান।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ গ্রামের মানুষ সাপের সঙ্গেই বেড়ে ওঠে বলে তাদের গতিপ্রকৃতিকে বোঝে অন্তর দিয়ে। ফলে সহাবস্থানে কোনও অসুবিধা হয় না। এমনকী, এখানকার মানুষকে সাপে কামড়েছে বলেও শোনাই যায় না তেমন। তারাও বুঝি মানুষের গতিপ্রকৃতিকে বুঝে নিয়েছে এতকাল ধরে। কেবল নিয়ম-আচারের বেড়াজাল নয়, ভালোবাসাই এখানে মূলমন্ত্র।
সাপেদের যে ভয় পাওয়া যেতে পারে, তা বুঝি জানাই নেই গ্রামের মানুষের।
স্বাভাবিকভাবেই এ গল্প জানাজানি হতে, বাইরের পৃথিবী আগ্রহী হয়েছে এমন আশ্চর্য মানব-প্রাণী বন্ধন সম্পর্কে জানতে। আর তাই ইদানীংকালে গ্রামে আনাগোনা ঘটেছে সাহসী পর্যটকদের। তবে পর্যটকদের প্রতি বেশ কড়া গ্রামবাসী। তারা যেন এখানে এসে কোনওভাবেই সাপেদের উত্যক্ত না করে, বিরক্ত না করে, তা জানিয়ে দেওয়া হয় শুরুতেই। ধরে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, শেতফলে এসে গোখরোদের ছুঁতেও পারবে না বাইরের লোক। কোনও রকম বাড়তি পরীক্ষানিরীক্ষা নয়, কেবলমাত্র অনাবিল আগ্রহই যেন হয় পর্যটকদের শেতফলে আসার কারণ— এ কথা জানিয়ে নিতে চান গ্রামবাসী।
বর্তমান দ্রুতগ্রামী প্রযুক্তির সময়ে দাঁড়িয়েও যে কি অদ্ভুতভাবে মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটায় এই গ্রাম, তা সত্যিই বিস্ময় জাগায়। অজানা প্রকৃতির প্রতি সম্ভ্রমও জাগায় বটে।
