Advertisement
সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি মুজিবকে, কী হয়েছিল অবিভক্ত পাকিস্তানের শেষ নির্বাচনে?
একটা সাইক্লোন বদলে দেয় সব সমীকরণ। এই নির্বাচনের ফলাফলেই তৈরি হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত।
১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানে জন্মলগ্ন থেকে সুদীর্ঘ ২৩ বছর কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। গভর্নর জেনারেল আর সামরিক বাহিনীর প্রধানরাই ২৩ বছর পাকিস্তান শাসন করেছেন।
পাকিস্তানের জন্মের এক বছরের এক বছরের মধ্যেই 'কায়েদ-ই-আজম' মহম্মদ আলি জিন্নাহর মৃত্যু হয়। জিন্নাহর পর সেই স্তরের নেতা আর পাকিস্তানে কেউ ছিলেন না। তাছাড়া জিন্নাহরও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘোরতর অনীহা ছিল। লিয়াকত আলি খান প্রধানমন্ত্রী হলেও তিনি মূলত ছিলেন জিন্নাহর আলোয় আলোকিত। ১৯৫১ সালে তাঁকেও খুন হয়ে যেতে হয়।
এরপর শুরু হয় ক্ষমতা দখলের মাৎস্যন্যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে পাকাপোক্তভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি পাকিস্তানে। ফলে দীর্ঘ সামরিক শাসন জারি হয়, ক্ষমতা দখল করেন ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান। কিন্তু আয়ুব খানের অপশাসনের জেরে গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতনের পরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করেই নির্বাচন ঘোষণা করেন।
১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের ভোটগ্রহণ হয়। ’৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানের অন্য চারটি প্রদেশের ন্যায় একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে জাতীয় পরিষদের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসন এবং পশ্চিম পাকিস্তান পায় ১৩৮টি আসন।
এখানে তৎকালীন পাকিস্তানের ভূগোল জানাটা জরুরি। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান; করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ, কোয়েট্টা-সহ পাকিস্তানের রাজনীতি-অর্থনীতির ভরকেন্দ্র। যার মূল ভাষা উর্দু। অন্যদিকে উপেক্ষিত পূর্ব পাকিস্তান। বাংলাভাষী। অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া সেই অর্থে বড় শহর নেই।
সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ভাষাগত অত্যাচার। পাকিস্তান গঠনের পর জিন্নাহর অঘোষিত এজেন্ডা ছিল দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। তিনি মনে করতেন, এক ভাষা-এক সংস্কৃতির মাধ্যমে সম্পৃক্ত না করলে ভৌগলিকভাবে এত দূরত্বে থাকা দেশের দুই অংশকে শাসন করা সম্ভব নয়। জিন্নাহ জীবিত থাকাকালীন প্রথমবার ঢাকা সফরে গিয়েই যেভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুর নাম ঘোষণা করতেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। জাগ্রহ হয় বাঙালি অস্মিতা।
পূর্ব পাকিস্তানে সেই বাঙালি অস্মিতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলা, অপশাসন আমজনতার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হওয়া শুরু করেছিল, ১৯৭০ আসতে আসতে সেই ক্ষোভ গনগনে আঁচে পরিণত হয়। গোটা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পশ্চিম বিরোধী হাওয়া তৈরি হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের অবিসংবাদী নেতা হিসাবে উঠে আসেন শেখ মুজিবর রহমান।
এরই মধ্যে প্রকৃতির খেলাও পক্ষে যায় মুজিবের। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তান উপকূলে আছড়ে পড়ে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা'। আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় বলে পরিচিত হয়ে রয়েছে এই সাইক্লোন। যার ফলে কার্যত লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় গোটা পূর্ব পাকিস্তান। সেদিন ওই ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ যায় ৫-৭ লক্ষ মানুষের। বহু গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আহত হন লক্ষ লক্ষ মানুষ। অথচ, সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে বাঁচাতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি।
ফলে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর কাছে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে যায়, অবিলম্ব স্থায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এভাবেই বেঘোরে মরতে হবে। এর মধ্যেই মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ ৬ দফা নির্বাচনী ইস্তেহার ঘোষণা করে। যাতে তুলে ধরা হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বঞ্চনা। পরে সেই ঘোষণাপত্রকে ঐতিহাসিক বলে দাবি করে আওয়ামি। সেবারের নির্বাচন মূলত দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তান বনাম পশ্চিম পাকিস্তানের লড়াই।
সেবার মোট ২৪টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। আওয়ামি লিগ পূর্ব পাকিস্তানের সবকটি আসনে প্রার্থী দাঁড় করালেও পশ্চিমে মনোনয়ন দিয়েছিল মাত্র ৮ জনকে। এদের কেউই জিততে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানের দল পিপিপি প্রার্থী দেয় ১২০ আসনে। তাঁরা পশ্চিমে প্রার্থী দেয়নি। ফলপ্রকাশ হলে দেখা যায় পূর্ব পাকিস্তানে একচেটিয়াভাবে জয়ী হয় আওয়ামি। ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পায় ১৬০টি আসন। পশ্চিম পাকিস্তানে জে কে ভুট্টোর পিপিপি পায় ৮১ আসন। যার অর্থ ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায় আওয়ামি লিগ।
সেখানেই শুরু হয় আসল টুইস্ট। হিসাব মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিরিখে সরকার গঠন করার কথা শেখ মুজিবের। কিন্তু প্রভাবশালী পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা সেটা মানতে চাননি। পিপিপি প্রধান ভুট্টো সাফ বলে দেন, পিপিপি পশ্চিম পাকিস্তান তথা প্রাদেশিক পরিষদের দুটো প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, আর, শেখ মুজিব মাত্র একটি প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন। তাই তাঁর সরকার গঠনের অধিকার নেই। তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করা হলে গোটা পূর্ব পাকিস্তান অচল করে দেবেন তিনি। বিরোধী দলের আসনে বসার বদলে তিনি জাতীয় পরিষদ দু’ভাগ করে দুই অংশে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তোলেন। যার ফলে বিতর্কের জেরে কোনও সরকার গঠনই হয়নি।
Published By: Subhajit MandalPosted: 08:07 PM Feb 11, 2026Updated: 08:35 PM Feb 11, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
