Advertisement
শ্যামাপ্রসাদ-দুর্গাচরণ থেকে দিলীপ ঘোষ, বঙ্গ বিজেপির উত্থানে নীরবে কাজ করেছেন সংঘের বহু নেতা
আজ বঙ্গ বিজেপি মহীরুহ। কিন্তু সেই মহিরুহের গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই পাঁচের দশকে শ্যামাপ্রসাদের হাত ধরে।
২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গে বিজেপির অঙ্কুরিত চারাগাছ ফুলে-ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময়ের জনপ্রতিনিধিহীন দল এখন রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু আজ যে দল এত ফুলে ফেঁপে উঠেছে সেটার নেপথ্যে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম রয়েছে আরএসএসের। অবশ্য এ রাজ্যে হিন্দুত্ববাদের শিকড় আরও গভীরে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই কলকাতায় দাঁড়িয়ে গোটা দেশে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বীজ বপন করেছিলেন। যে মেদিনীপুরকে আজ শুভেন্দু অধিকারী নিজের ‘গড়’ হিসাবে পরিচয় দেন, সেখানেও সেই পাঁচের দশকে দাপিয়ে জনসংঘের সংগঠন করে গিয়েছেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ঝাড়গ্রামের মতো আসন থেকে সাংসদও হয়েছেন তিনি।
১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জনসংঘের স্থাপনা করে বার্তা দিয়েছিলেন দেশের জন্য বাঁচতে হবে, দেশের জন্য মরতে হবে। তিনিই বলেছিলেন, রাষ্ট্রই সর্বোপরি এই মন্ত্র নিয়ে চলতে হবে। শ্যামাপ্রসাদই বাংলাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে লড়াই করেছিলেন। বঙ্গে জনসংঘের প্রতীকে প্রথম সাংসদ হন শ্যামাপ্রসাদই।
১৯৫২ সালে কলকাতা সাউথ-ইস্ট থেকে জিতেছিলেন স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেবারই মেদিনীপুর-ঝাড়গ্রাম থেকে জিতেছিলেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেসময় আদিবাসী অধ্যুষিত আসনগুলিতে বিজেপির সেই জয় রীতিমতো চমকপ্রদ ছিল। দীর্ঘদিন রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দুর্গাচরণবাবু।
আচার্য দেবপ্রসাদ ঘোষের মতো নেতা, যিনি কিনা জনসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছিলেন, তাঁর সংগঠনের ভিত্তিও ছিল বাংলা। হরিপদ ভারতী, তপন শিকদার, বিজয় কুমার মণ্ডলের মতো নেতাদের অবদানের কথাও ভোলার নয়। বিজেপি প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গের প্রথম সভাপতি ছিলেন হরিপদ ভারতী। দমদম থেকে দু'বার লোকসভার সাংসদ হয়েছেন তপন শিকদারও।
আজকের বাংলায় যে বিজেপি মহীরুহ সেটার আদর্শগত ভিত্তি কিন্তু পুরনো। সমস্যা হল, ৩৪ বছরের বামশাসনে তথাকথিত লিবেরাল ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির আমদানি বঙ্গে হিন্দুত্ববাদী এবং জাতিয়তাবাদী রাজনীতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দেশভাগের যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো যে বাংলা সংঘের জন্য উর্বর ভূমি হতে পারত, সেটাই দীর্ঘদিন সেভাবে সোনার ফসল ফলাতে পারেনি।
বঙ্গের এই 'পাকে' গেরুয়া পদ্ম ফোটাতে গত কয়েক বছরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে সংঘ পরিবারও। রাজ্যে পরিবর্তনের স্রোতে ক্ষমতায় এলেও সেভাবে সংগঠন সেভাবে শক্তিশালী নয়। সেই সাংগঠনিক কাজটা করে গিয়েছে সংঘের কর্মীরা। তাছাড়া বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মাধ্যমে আরএসএস সরাসরি জনমত গঠন করেছে। ছোট ছোট স্কুল, ব্রতচারী শিক্ষা কেন্দ্র, এসব তৈরি করে তৃণমূল স্তরে হিন্দুত্বের প্রচার করেছে সংঘ। যার অবদান বিজেপির জয়ে অপরিসীম।
আরএসএস দীর্ঘদিনই জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী, রাজবংশী এলাকায় কাজ করছিল। তবে বঙ্গে পদ্ম ফোটাতে হলে শুধু যে সংঘের সংগঠন যথেষ্ট নয়, সেটা আরএসএসও জানত। সেকারণেই বিজেপির মূল সংগঠনে নজর দেওয়া। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরই বঙ্গে বিজেপির ডালপালা বিস্তার শুরু। সেসময় রাহুল সিনহা একা কুম্ভের মতো দীর্ঘদিন রাজ্য বিজেপির দুয়ার আগলে ছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভার আগে সেই ভার যায় দিলীপ ঘোষের হাতে।
দিলীপ দীর্ঘদিন ধরে আরএসএসের প্রচারক। ছোটবেলায় থেকে ঘরছাড়া হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন দিলীপ। বাংলায় আসার আগে আন্দামানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেখানে সাফল্য পাওয়ার পরই দিলীপকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি করা হয়। এবং বছর ছয়েকের দায়িত্বে রীতিমতো চমকে দেন দিলীপ। তাতে অবশ্য খানিকটা কৃতিত্ব ছিল মুকুল রায়েরও।
বঙ্গে বিজেপির আসনসংখ্যা শূন্য থেকে ৭৭ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অনেকটাই দিলীপের। ২০১৯ লোকসভায় রাজ্যে দলকে ১৮ জন সাংসদও দেন দিলীপ। বস্তুত তাঁর আমলেই বাংলার সর্বস্তরের দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজেপি। এরপর সুকান্ত মজুমদারও দলের সংগঠন বৃদ্ধি করেছেন। সেটা অবশ্য দিলীপের রেখে যাওয়া ভিতের উপরই।
বঙ্গ বিজেপির আজকের এই মহীরুহ রুপের নেপথ্যে দু'জনের অবদান অনস্বীকার্য। একজন শমীক ভট্টাচার্য। মার্জিত ভদ্রলোক হিসাবে তাঁর পরিচিতি বিজেপিকে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে ঘরে ঢুকতে সাহায্য করেছে। দ্বিতীয়জন, শুভেন্দু অধিকারীর। বঙ্গে যে হিন্দুত্বে জোয়ার, সেটার নেপথ্যে শুভেন্দু যে রাজ্যের সব প্রান্তে ঘুরে ঘুরে প্রচার করেছেন, তার কৃতিত্ব রয়েছে।
Published By: Subhajit MandalPosted: 04:54 PM May 09, 2026Updated: 04:54 PM May 09, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
