Advertisement
কবিগুরুর প্রেতচর্চা, প্ল্যানচেটে সাড়া দিয়েছিলেন সুকুমার-মধুসূদন! এসেছিলেন নতুন বউঠানও
কেন বারবার মৃতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইতেন বিশ্বকবি? রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আরও গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করার সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে। যা এক মহাজীবনের আরও নতুন কোনও দিককে তুলে ধরতে পারে।
তরুণ বয়সে তিনি লিখেছিলেন ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান’। ভানুসিংহের ছদ্মনামে ‘মরণ’ কবিতার সেই উপলব্ধির পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বয়স বাড়লে ক্রমেই বুঝেছিলেন মৃত্যুর কর্কশতা। আপনজনদের সান্নিধ্যের তাড়না তাঁকে বসিয়েছিল প্রেতচর্চার আসরে। মৃত্যুর মাঝে অনন্তের প্রবাহকে খুঁজে ফিরলেও আপনজনদের হারানোর শোক যে তাঁকেও আকুল করেছিল, তা বোঝা যায় তাঁর প্রেতচর্চার এই অভ্যাসের দিকে ফিরে তাকালে।
তবে একথাও ঠিক, কম বয়স থেকেই প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতাও হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। সেকথা বলতে গেলে আরেকটু পিছিয়ে যেতে হবে। রবীন্দ্রনাথের জন্মের অব্যবহিত পরে ১৮৬৩ সালে প্রথম প্রেতচক্র অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। আয়োজক প্যারীচাঁদ মিত্র। 'আলালের ঘরের দুলাল'-এর লেখকের পর পূর্ববঙ্গের যশোরেও এক প্রেতচক্র তৈরি হয়। সেখানে আসতেন দীনবন্ধু মিত্র ও সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ একাই নন, অনেকেই উৎসাহী ছিলেন পরলোকের রহস্য সন্ধানে।
এই তালিকায় আরও এক নাম হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজদাদা ছিলেন স্বল্পায়ু এক মানুষ। যিনিজোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির শাসন, শিক্ষা এবং শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এরই সমান্তরালে ঠাকুরবাড়িতে প্রেতচর্চার সূচনাও হয় তাঁরই হাতে। কিন্তু ১৮৮৪ সালে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে তখনকার মতো থমকে যায় ঠাকুরবাড়ির প্রেতচর্চা।
শোনা যায় কিশোর রবির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল সদ্যমৃত মাইকেল মধুসূদন দত্তের। প্ল্যানচেটের নাম তিনি দিয়েছিলেন প্রেতবাণীবহ চক্রযান। সেখানেই 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর স্রষ্টার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা খোদ বিশ্বকবিই বলেছিলেন প্রমথনাথ বিশীকে। কিন্তু সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন পরলোকের অস্তিত্বে? মৈত্রেয়ী দেবীকে তিনি বলেছিলেন, ''পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই? কতটুকু জানো। জানাটা একটুকু, না-জানাটাই অসীম।''
আমেরিকায় মারগারি রেক্স নামে এক মহিলার সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি বলেছিলেন, ''মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আমার আশা ও বিশ্বাসের শেষ নেই।'' এর থেকে পরিষ্কার, জীবন ও মৃত্যুর মতোই মৃত্যু-পরবর্তী সময় নিয়েও তাঁর কেবল কৌতূহলই নয়, ছিল তীব্র অনুসন্ধিৎসা। তবে তরুণ বয়সে প্ল্যানচেট করলেও আটষট্টি বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের প্রেতচর্চা এক অন্য মাত্রা পায়। কেননা সেই সময় তিনি এক ‘মিডিয়ামে’র সংস্পর্শে আসেন।
মিডিয়াম অর্থে প্রেতচক্রে ডাক পাওয়া আত্মা যার দেহে ভর করে বা অন্যভাবে যার মাধ্যমে যোগাযোগ করে বাকিদের সঙ্গে। কবির বন্ধু ও বহু কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক মোহিতচন্দ্র সেনের মেয়ে উমা দেবী ছিলেন সেই মিডিয়াম। তরুণী বুলার (উমা দেবীর ডাকনাম) মধ্যে এই বিশেষ ক্ষমতার কথা জানতে পেরে নতুন করে রবীন্দ্রনাথ কৌতূহলী হন প্রেতচর্চায়।
প্রশান্ত মহলানবীশ, নন্দলাল বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অজিতকুমার চক্রবর্তী, মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষরাও ছিলেন কবিগুরুর সঙ্গী। প্রায় মাসদুয়েক সময়কালে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়েছিল বহু চেনা মানুষদের সঙ্গে। অমিতাভ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা’র মতো বই থেকে জানা যায়, সেই সব সাক্ষাৎ লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল মোটা খাতায়। মিডিয়াম উমার হাতে থাকত কাগজ পেনসিল। আত্মার সব কথা তিনি লিখে চলতেন প্ল্যানচেট চলাকালীন।
ওই খাতা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁর ‘নতুনদা’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ, প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ও হিতেন্দ্রনাথ, স্ত্রী মৃণালিনী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ। এসেছিলেন তাঁর ‘নতুন বউঠান’ও। কিন্তু তিনি তাঁর পরিচয় দেননি। যদিও রবীন্দ্রনাথ নিঃসংশয় ছিলেন, তিনিই এসেছেন। কেবল আত্মীয়রাই নন, অনুজপ্রতিম সুকুমার রায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রিয় পাত্ররাও এসেছিলেন সেই প্রেতচক্রের আহ্বানে।
প্ল্যানচেটে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন দু’লাইনের কবিতা- ”আমার আজও কিরে, সেই আবরণ আছে রে।/ এ যেন কোন অজানা পথ, শেষ নাহি রে।” ওপারের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল মৃত্যুর পরে জীবাত্মা কোনও পরিবেশ ও জগতের মধ্যে অবস্থান করে, তাদের মানসিক অবস্থা কেমন থাকে তা নিয়েও। বাদ যায়নি একেবারে ‘সাংসারিক’ প্রসঙ্গও। সুকুমার রায় কবিগুরুকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর ছেলেকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে নেওয়ার জন্য।
Published By: Biswadip DeyPosted: 06:28 PM May 08, 2026Updated: 06:48 PM May 08, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
