Advertisement
বাংলাদেশ-নেপালের মতো উন্মত্ত সরকার বিরোধিতা নয়, কোন মাস্টারস্ট্রোকে অনন্য ভারতের জেন জি?
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে, সরকার না পালটে, অরাজকতা না ছড়িয়েও যে জেন জি সাফল্য পায়-শিক্ষা দিল ভারত।
জেন জি বিপ্লব। গতবছর থেকেই গোটা বিশ্বের চর্চায় উঠে এসেছে এই শব্দবন্ধ। তিরিশের কম বয়সি তরুণ প্রজন্মের ডাকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল একটা দেশের সরকার। জেন জি প্রতিবাদে নেপালে কমিউনিস্ট সরকারের অবসান হয়। একই ছবি বাংলাদেশেও। পড়ুয়া এবং তরুণদের হিংসাত্মক আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তাহলে একই অঞ্চলের দেশ হয়েও ভারতে ছবিটা অন্যরকম কেন?
আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় যুবসমাজ বা জেন জির কোনও তফাত নেই। সরকারি নীতির বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়েছে প্রত্যেকটি দেশের তরুণরা। পুলিশের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছে। নিজেদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ময়দান ছেড়ে নড়েনি। সেকারণেই ককরোচ জনতা পার্টির গায়ে ছেটানো হয়েছে 'ডিপ স্টেট' কাদা। বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে এই 'আরশোলা' তথা জেন জি।
নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর থেকে ভারতে শুরু হয় তরুণদের বিক্ষোভ। নেপাল বা বাংলাদেশেও আন্দোলনের শুরুটা এরকমই ছিল। বাংলাদেশে আন্দোলনের শুরু কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, নেপালের আন্দোলনের কারণ সোশাল মিডিয়ায় কড়াকড়ি। অর্থাৎ আন্দোলনের জন্মলগ্নেও প্রতিবেশীদের থেকে খুব একটা আলাদা ছিল না ভারতের যুবসমাজ। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি দেশগুলির থেকে ভারতীয় জেন জিকে আলাদা করেছে তাদের কাজের ধরণ।
বাংলাদেশ এবং নেপাল-দুই দেশেই প্রতিবাদের নামে কার্যত অরাজকতা শুরু করে তরুণ প্রজন্ম। তাদের দাবি তখন স্রেফ কোটা ব্যবস্থা বা সোশাল মিডিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শাসনব্যবস্থা, নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধেই তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধানদের বাড়িতে হামলা-তারুণ্যের ভয়ংকর ছবি দেখেছে বাংলাদেশ এবং নেপাল দুই দেশই। প্রাণ বাঁচাতে হাসিনা এবং কেপি শর্মা ওলিকে পালাতে হয়েছিল।
ঠিক এখানেই একেবারে অন্যরকম বার্তা দেয় ভারতের তরুণ প্রজন্ম। মহাত্মা গান্ধীর দেশ ভারত। সেদেশের নাগরিকরা বেছে নেয় জাতির জনকের দেখানো অহিংসার পথ। শান্তিপূর্ণ অবস্থান শুরু হয় যন্তর মন্তরে। অনশন-সংসদ ভবন অভিযানের মতো একাধিক কর্মকাণ্ড করেছে ভারতের জেন জি, কিন্তু কোথাও হিংসার আঁচ ছিল না। পুলিশের সঙ্গে রীতিমতো মজা করতে দেখা গিয়েছে প্রতিবাদীদের। জলকামানের জলে আনন্দে নাচের দৃশ্য গোটা দুনিয়ায় ভাইরাল।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবি থেকে একচুল নড়েনি জেন জি। অথচ পুরো আন্দোলনটাই মোটের উপর শান্তিপূর্ণ। কীভাবে সেটা সম্ভব হল? প্রথমত, ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এদেশের মানুষ জানেন, ভোটবাক্সের মাধ্যমে সরকার ভাঙাগড়ার ক্ষমতা এখনও রয়েছে তাঁদের হাতে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজের পছন্দমতো সরকার গড়তে পারবেন। তাই আন্দোলনকারীদের তরফে কখনই নৈরাজ্য তৈরির চেষ্টা করা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করেছে তরুণ নেতৃত্ব।
দ্বিতীয়ত, নেপাল বা বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেনি ভারতের জেন জি। তাই সরকার বদলে ফেলার চেষ্টা ছিল না প্রতিবাদীদের। আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেন কেরিয়ার তৈরির পথ মসৃণ হয়। নিজের জীবন সুরক্ষিত করা এবং মেধার যথাযথ মূল্য পাওয়া-এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল ভারতের জেন জি আন্দোলন। দাবি মিটতেই আন্দোলনও শেষ হয়েছে।
নেপাল বা বাংলাদেশের থেকে ভারতের আয়তন অনেক বড়। প্রশাসনের ক্ষমতার বিস্তারও অনেকখানি। ফলে দেশজুড়ে যুবসমাজের একত্রিত হওয়া যথেষ্ট কঠিন। তাছাড়াও প্রতিবাদীদের গায়ে এফআইআর তকমা লেগে যাওয়ার 'ভয়' কাজ করেছে জেন জির মনে। নিজেদের কেরিয়ারটুকু সুরক্ষিত করতে তারা পথে নেমেছিল, 'পুলিশি ঝামেলা' ডাকতে নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে, অহিংসভাবে, সরকার না পালটে, অরাজকতা না ছড়িয়েও যে জেন জি সাফল্য পায়-শিক্ষা দিল ভারত।
Published By: Anwesha AdhikaryPosted: 06:42 PM Jul 26, 2026Updated: 06:57 PM Jul 26, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
