সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: পরশুরাম ত্রেতা যুগে মমলেশ্বর শিব মন্দির স্থাপন করেছিলেন। দ্বাপরে পাণ্ডবেরা এর জীর্ণোদ্ধার করেছিলেন। এখানে আছে দুশো গ্রাম ওজনের একটি গমের দানা, ভীমের বাদ্যযন্ত্র আর এক অখণ্ড জ্যোতি। এই অগ্নিকুণ্ডটি মহাভারতের সময়কাল থেকে নিরন্তর জ্বলে চলেছে। আজ পর্যন্ত কেউ কোনও দিন এর আগুন নিভতে দেখেনি। লোকবিশ্বাস, এক অত্যাচারী রাক্ষসকে ভীম বধ করেন। তাঁর সেই বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে অগ্নিকুণ্ড নির্মাণ করে ধুনি জ্বালানো হয়েছিল। সেই ধুনি আজ অবধি নেভেনি। সেদিনের সেই ধুনিই আজকের এই অমর অগ্নিকুণ্ড।

পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সেই শিব মন্দির যেখানে মহাভারতের সময়কালের কিছু আশ্চর্য জিনিস রয়েছে। আর আছে একটি অমর অগ্নিকুণ্ড। লোকবিশ্বাস, এটি মহাভারতের সময়কাল থেকে নিরন্তর জ্বলে যাচ্ছে। পাণ্ডবেরা মহাদেবের তপস্যার জন্য দ্বাপর যুগে এটি করেছিলেন। আর তখন থেকেই এই কুণ্ডের আগুন একভাবেই জ্বলে যাচ্ছে। সবাই বলে এটা এক দৈব ঘটনা। কে পাঁচ হাজার বছর ধরে এর আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে? সবাই দেখে সারাক্ষণ আপনা হতে জ্বলতে থাকে আগুন। কাঠ না থাকলে এক চামচ ভস্মেও আগুন জ্বলতে থাকবেই। কখনও হয়তো পূজারি বা অন্য কেউ এসে অগ্নিকুণ্ডে এক-আধখানা কাঠ নিক্ষেপ করেন। এর বেশি কেউ কিছু করেন না।
এই অমর অগ্নিকুণ্ডের পিছনে একটি আখ্যান রয়েছে
ভীম এখানে এক রাক্ষস মেরেছিলেন। যখন পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসে এখানে-ওখানে লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, থাকবার জায়গার সন্ধান করছিলেন, তখন কিছুদিনের জন্য এখানে এক বাড়িতে এসে লুকিয়েছিলেন। এটি একটি পাহাড় সংলগ্ন গ্রাম। সেই সময় এক রাক্ষস এই গ্রামে পাহাড়ি গুহায় ডেরা জমিয়েছিল। প্রতিদিনই রাক্ষস গ্রামে ঢুকে মানুষ মারত। তার অত্যাচার ও ভয় থেকে বাঁচবার জন্যে গ্রামের লোকে সেই রাক্ষসের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করেছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী সেই রাক্ষসের কাছে প্রতিদিন একজন করে মানুষকে পাঠানো হবে। রাক্ষস শুধুমাত্র সেই মানুষটিকেই মেরে খাবে। পরিবর্তে রাক্ষস কোনওদিন গ্রামে ঢুকবে না।
বিনা শক্তি ক্ষয়েই রাক্ষস প্রতিদিন ডেরাতে বসেই মুখের খাবার পেতে লাগল। একদিন গ্রামের এক ঘরের ছেলের পালা এল, যে ঘরে পাণ্ডবেরা অতিথি হয়ে লুকিয়েছিলেন। সেই ছেলেটির মাকে কাঁদতে দেখে পাণ্ডবেরা কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি সব জানিয়ে বললেন, আজ আমার নিজের ছেলেকেই রাক্ষসের কাছে পাঠাতে হবে। তাকে রাক্ষস মেরে খাবে। অতিথি হিসাবে ধর্ম রক্ষার্থে যুধিষ্ঠির গৃহকত্রীর ছেলেকে যেতে দিলেন না। তার জায়গায় ভীমকে রাক্ষসের কাছে পাঠালেন। ভীম সেই রাক্ষসের সামনে হাজির হলে রাক্ষস ও ভীমের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বাধে। ভীম যুদ্ধে জয়ী হন এবং রাক্ষসকে বধ করে তার কবল থেকে গ্রামবাসীদের চিরমুক্তি প্রদান করেন।
বলা হয়ে থাকে ভীমের রাক্ষসের ওপর বিজয় লাভকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে অগ্নিকুণ্ড নির্মাণ করে ধুনি জ্বালানো হয়েছিল। সেদিনের সেই ধুনিই আজকের এই অমর অগ্নিকুণ্ড। এটির অবস্থান মমলেশ্বর মহাদেব মন্দিরে। এই মমলেশ্বর মহাদেব মন্দির হিমাচলপ্রদেশের কারাসোগা উপত্যকার মমেল গ্রামে অবস্থিত।
কাছাকাছি পরিচিত জায়গার নাম মান্ডি। মন্দিরটি ভগবান শিব ও পাঁচ হাজার বছর ধরে জ্যোতি জ্বলছে মমলেশ্বর মহাদেব মন্দিরে মাতা পার্বতীর নামে সমর্পিত। পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস কালে এই মন্দিরেই তাঁরা তপস্যাও করতেন। এই মন্দিরের আলাদা একটি স্থানে টানা লম্বা একই বেদিতে পরপর পাঁচটি বিশেষ শিবলিঙ্গ রয়েছে। এই পাঁচটি শিবলিঙ্গের স্থাপনা ও পুজো করেছিলেন স্বয়ং পঞ্চপাণ্ডব। এখানে পাঁচ ভাই একসঙ্গে পাশাপাশি বসে ভগবান শিবের আরাধনা করতেন।
এই মন্দিরে আরও অসংখ্য শিবলিঙ্গের দেখা মেলে। তার মধ্যে একটি বিশেষ শিবলিঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। যেটা দেখলে অসম্পূর্ণ মনে হবে। কেননা এটি অধরা শিবলিঙ্গ। একে ৮১ নম্বর শিবলিঙ্গ হিসেবে গণনা করা হয়ে থাকে।
অধরা শিবলিঙ্গের পিছনেও একটি আখ্যান রয়েছে
এই মন্দিরকে পাণ্ডবেরা দ্বিতীয় কাশী তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা এখানে ৮০টা শিবলিঙ্গ গড়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁরা যখন ৮১ নম্বর শিবলিঙ্গ গড়তে বসলেন তখনই বিপত্তি বাধল। পাণ্ডবেরা যখন ৮১ নম্বর শিবলিঙ্গটি বানাতে বসলেন তখনই এক অপরিচিত মহিলা সেই স্থানে এসে ধান কুটতে শুরু করেন। আসলে ইনি ছিলেন মা অন্নপূর্ণা। তিনি দ্বিতীয় কাশী চাননি। পাণ্ডবেরা সেই অপরিচিতা মহিলাকে দেখে ভাবলেন মহিলাটি যদি তাঁদের চিনে ফেলেন, তাহলে তাঁদের অজ্ঞাতবাস খণ্ডন হয়ে যাবে, আবার নতুন করে তাহলে শুরু করতে হবে অজ্ঞাতবাস। এই ভয়ে তাঁরা তখনই ৮১ নম্বর শিবলিঙ্গ অসম্পূর্ণ রেখেই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান। ৮১ নম্বর শিবলিঙ্গ আর দ্বিতীয় কাশী কোনওটাই শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। সেই শিবলিঙ্গ আজও দেখতে পাওয়া যাবে।
মন্দিরে একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শিত হয়ে থাকে। প্রাচীনকাল থেকে লোকেরা এটিকে ভীমের ঢোলক বলে জানে। বিশাল আকারের ঢোলক। ভীমের কাঁধেই সাজে। পুরাতত্ত্ববিদেরাও এর প্রাচীনত্ব নিয়ে নিঃসন্দিহান। জনশ্রুতি, তাড়াহুড়োয় স্থান ত্যাগ কালে ভীম তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্রটি সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা আর মনে করতে পারেননি। বাদ্যযন্ত্রটি ভীম শিবকে বাজিয়ে শোনাতেন। বাজনার তালে তালে ভীম নৃত্য করেও শিবকে দেখাতেন। বাদ্যযন্ত্রটি তখন থেকেই এখানে শিবের পাশে মর্যাদার সঙ্গেই ঠাঁই করে নিয়েছে। এই মন্দিরে পাণ্ডবদের স্মৃতি বিজড়িত আরও একটি জিনিস তাঁদের সময় থেকেই শোভা পেয়ে আসছে।
জিনিসটি শুধু নিজেই শোভা পাচ্ছে না, মন্দিরে থেকে মন্দিরেরও শোভা বাড়াচ্ছে। আর নিজেকে বিশ্বমাঝে ভারতের গৌরবময় অতীতকেই মেলে ধরে আছে। পৌরাণিক মান্যতা অনুসারে পাণ্ডবেরাই এটি এখানে সুরক্ষিত করেছিলেন। জিনিসটি হল-একটি গমের দানা।
মন্দিরে শোভা পাচ্ছে দুশো গ্রাম ওজনের একটি গমের দানা
গমের দানাটি উপরে কাচ ঢাকা একটি কাঠের বাক্সে সুরক্ষিত রয়েছে। মন্দিরে যে-ই আসে সে-ই এই দানা দেখে যায়। চোখে দেখেও বিশ্বাস করা কঠিন হয় যে দ্বাপর যুগে এক-একটা গমের ওজন ছিল দেড়শো-দুশো গ্রাম। দাঁড়ি-পাল্লায় চাপালে ৫/৬টি গমে এক কেজি ওজন হয়ে যাবে। পৌরাণিক মান্যতা অনুসারে অজ্ঞাতবাস কালে পাণ্ডবেরা কারাসোগা এসেছিলেন। আর এই দানা তাঁরাই মন্দিরে স্থাপনা করেছিলেন।
এত বছর পরে আজও দানাটি সামান্য কালচে হওয়া ছাড়া প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। গমের দানাটিকে মা অন্নপূর্ণার প্রতিভূ মানা হয়। এই দানার কারণে এখানে কখনও আকাল ও খাদ্যাভাব হয়নি বলে শোনা যায়। বিশ্বাস, যতদিন এটি সুরক্ষিত থাকবে ততদিনই এখানে অন্নাভাব ঘটবে না।
হিমাচল দেবভূমি বলে জানা যায়। এখানকার বাতাবরণে এমন কিছু রয়েছে যা লোককে অবাক করে দেয়! কখনও কখনও চোখ আর কানে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। এখানকার কিংবদন্তি, বিশ্বাস ও আস্থা-মনের ভেতরে এমন বিশ্বাস তৈরি করে থাকে যে, বলতেই হয় কিছু না কিছু অদৃশ্য শক্তি অবশ্যই আশপাশে রয়েছে।
এরকমই আস্থার কেন্দ্র হল কারাসোগার মমলেশ্বর মহাদেব মন্দির। পূজারিদের জিজ্ঞাসা করলে শুনবেন পরশুরাম ত্রেতা যুগে এই মন্দিরের স্থাপনা করেছিলেন। দ্বাপর যুগে পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসকালে এর জীর্ণোদ্ধার ও মন্দিরের বাহির অংশের নির্মাণ করেছিলেন। এখানকার সুরক্ষিত গমের দানা, ভীমের বাদ্যযন্ত্র বা অখণ্ড জ্যোতি যে-কোনও মানুষকে ভাবনার মধ্যে ফেলে দেবেই। এই ভাবনাকে আরও আঁটসাঁট করেছে পুরাতত্ত্ব বিভাগ। পুরাতত্ত্ব বিভাগ থেকে মন্দিরের সব কিছু অতি প্রাচীন বলে নির্দেশিত হয়েছে।
পাশেই একটি মন্দির রয়েছে যেখানে নরবলি দেওয়া হত
মমলেশ্বর মহাদেব মন্দিরের পাশেই আর একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে। মন্দিরটি অনেককাল বন্ধ রয়েছে। মান্যতা রয়েছে প্রাচীনকালে এই মন্দিরে 'মুণ্ডযজ্ঞ' করা হতো। সেকালে অসংখ্য নরবলি দেওয়া হয়েছে। এই মন্দিরে পূজারি ছাড়া আর কারও প্রবেশের অধিকার ছিল না। এখনও পুরোহিতবর্গ ছাড়া আর কারও এই মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি নেই।
(ঋণ: ভারতের আশ্চর্য শিবলিঙ্গ। শ্রীবশিষ্ঠ। সাধনা)