ফাল্গুনী পূর্ণিমার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৫৪০ বছর আগের কথা। চন্দ্রগ্রহণের বিশেষ সন্ধিক্ষণে নবদ্বীপধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। বৈষ্ণব সমাজের কাছে এ যেন এক অনির্বচনীয় পবিত্র তিথি! মহাপ্রভুর আবির্ভাবের সময় চলছিল চন্দ্রগ্রহণ। আর ধ্বনিত হচ্ছিল 'হরিবোল' ও 'হরিনাম' মন্ত্র। কেমন ছিল সেদিনের চালচিত্র? কলম ধরলেন বাগবাজার গৌড়ীয় মিশনের আচার্য্য ও সভাপতি শ্রীমৎ ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ।
ইতিহাস বলছে, ১৪৮৬ সালের সেই সন্ধ্যায় যখন মহাপ্রভুর জন্ম হয়, তখন আকাশ জুড়ে ছিল চন্দ্রগ্রহণ। নবদ্বীপের অলিগলি তখন মুখরিত ছিল হরিনাম সংকীর্তনে। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে গঙ্গাস্নান আর নামজপে মগ্ন ছিলেন আপামর মানুষ। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে মনে রেখেই এ বার গ্রহণকালীন সময়ে বিশেষ নামসংকীর্তনের আয়োজন করেছে গৌড়ীয় মিশন। মহাপ্রভুর আবির্ভাব কেবল এক মহাপুরুষের জন্ম নয়, এটি ছিল মানবসমাজে প্রেমধর্মের পুনর্জাগরণ। তাঁর শিক্ষা ছিল সহজ ও মানবিক। বিভেদহীন সমাজ গড়ার যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন, আজকের অস্থির সময়ে তার প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে।
মহাপ্রভুর ৫৪০তম আবির্ভাব তিথিকে স্মরণীয় করে তুলতে এবার সেজে উঠেছে মায়াপুর-নবদ্বীপ। আগামী গৌরপূর্ণিমায় স্বরূপগঞ্জ গৌড়ীয় মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। উৎসবের মূল আকর্ষণ মহাপ্রভুর আবির্ভাব বর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫৪০টি প্রদীপ নিয়ে এক বিশালাকার পদযাত্রা।
উৎসবের দিনটি শুরু হবে মঙ্গল আরতি ও শাস্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে। দিনভর চলবে ভক্তি সম্মেলন ও ধর্মসভা। দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার ভক্তের সমাগম ঘটবে স্বরূপগঞ্জের এই প্রাঙ্গণে। সন্ধ্যার ঠিক পরেই শুরু হবে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রদীপযাত্রা। সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী এবং গৃহী ভক্তরা প্রদীপ হাতে সংকীর্তনের সুরে নবদ্বীপের পথ পরিক্রমা করবেন। এই ৫৪০টি প্রদীপ কেবল আলোকসজ্জা নয়, বরং অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে হৃদয়ে প্রেমের শিখা জ্বালানোর এক প্রতীকী সাধনা।
বৈষ্ণব দর্শনে নবদ্বীপের নয়টি দ্বীপ ভক্তির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গের প্রতীক। উৎসবের দিনগুলিতে গঙ্গার ঘাট থেকে মন্দিরের চত্বর— সর্বত্রই যেন সেই আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতিফলন ঘটে। ‘তৃণাদপি সুনীচেন’ বা তৃণের চেয়েও নম্র হওয়ার যে দর্শন মহাপ্রভু দিয়ে গিয়েছেন, তাকেই সামনে রেখে পরিবেশিত হবে নামযজ্ঞ। মিশনের প্রবীণ সন্ন্যাসীদের মতে, চন্দ্রগ্রহণের সময় নামসংকীর্তনের যে মাহাত্ম্য শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, এই আয়োজন তারই এক জীবন্ত রূপ।
বিভেদ ও হিংসার যুগে মহাপ্রভুর প্রেমধর্ম এবং সর্বজনীন মানবতার আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই উৎসবের মূল লক্ষ্য। গৌড়ীয় মিশনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সামিল হতে ইতিমধ্যেই ভিড় জমাতে শুরু করেছেন ভক্তরা। ৫৪০টি প্রদীপের আলো আর হরিনামের ধ্বনিতে ফের একবার একাত্ম হতে চলেছে চৈতন্যভূমি।
