আগামী ১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার পুণ্য রথযাত্রা। উৎসবের এই আবহে শ্রীক্ষেত্রের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয় এক পরম পবিত্র দাম্পত্যলীলার সৌরভে। রথের চাকা ঘোরে। মাসির বাড়ি গুন্ডিচায় কেটে যায় দীর্ঘ ন’টা দিন। কিন্তু ভক্তের সেই চেনা আনন্দ-উৎসবে ব্রাত্যই থেকে যান শ্রীমন্দিরের মূল অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহালক্ষ্মী। স্বামী জগন্নাথদেব তাঁকে ছাড়াই ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে পাড়ি দেন সুদূর। এই অনাদর ও একাকীত্ব মেনে নিতে পারেননি শ্রীক্ষেত্রের লক্ষ্মীদেবী। রথের পঞ্চম দিনে তাই তিনি ব্যাকুল হয়ে ছুটে যান গুন্ডিচা মন্দিরে। এই পুণ্য তিথিই ইতিহাসে ‘হেরা পঞ্চমী’ নামে পরিচিত। কিন্তু সেখানে গিয়ে স্বামীর আনন্দ দেখে অভিমানে ও ঈর্ষায় ফেটে পড়েন দেবী। মনে মনে স্থির করেন, স্বামীকে এর পাঠ শেখাতেই হবে। তারপর?
ছবি: সংগৃহীত
এরপরই শুরু হয় এক পরম মধুর মান-অভিমানের পালা। গুণ্ডিচার ছুটি শেষে অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যা ‘নীলাদ্রি বিজয়’ নামে খ্যাত। মহাসমারোহে ভাইবোনকে নিয়ে মূল শ্রীমন্দিরে ফেরেন জগন্নাথদেব। বড়ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রা অনায়াসে মন্দিরে প্রবেশ করেন। কিন্তু যেই না জগন্নাথদেব সিংহদুয়ারে পা বাড়িয়েছেন, অমনি সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল মন্দিরের মূল কপাট। ক্রুদ্ধ মহালক্ষ্মী স্বয়ং রুদ্ধ করলেন স্বামীর পথ। জগৎসংসারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাকে তখন টানা তিন দিন কাটাতে হল মন্দিরের বাইরে, সম্পূর্ণ গৃহহীন অবস্থায়। দেব-দেবীর এই মধুর সামাজিক কলহকে শাস্ত্রে বলা হয় ‘মানভঞ্জন লীলা’।
ছবি: সংগৃহীত
অবশেষে স্ত্রীর কঠিন মান ভাঙাতে, তাঁর রোষ প্রশমিত করতে এক অভিনব মিষ্টি উপায় বের করলেন জগৎপতি। মহালক্ষ্মীর মান ভাঙাতে তিনি নৈবেদ্য হিসেবে দেবীর মুখে তুলে দিলেন ছানার তৈরি নরম, তুলতুলে রসগোল্লা। মিষ্টির সেই অমোঘ স্বাদ আর স্বামীর এমন আকুলতায় মুহূর্তের মধ্যে গলে গেল দেবীর অভিমানের জমাট পাহাড়। সিংহদুয়ারের বন্ধ কপাট আবার খুলে গেল। সগর্বে মন্দিরে প্রবেশ করলেন শ্রীজগন্নাথ। ওড়িশার এই সুপ্রাচীন লোকঐতিহ্যকে স্মরণ করেই প্রতি বছর রথযাত্রার শেষে পুরীতে মহাসমারোহে পালিত হয় ‘রসগোল্লা দিবস’। প্রেম, বিরহ আর মধুর মানভঞ্জনের এই চিরন্তন পৌরাণিক গাথা আজও শ্রীক্ষেত্রের রথযাত্রার এক পরম তৃপ্তিময় সমাপ্তি এনে দেয়।
