রবিঠাকুরের (Rabindranath Tagore) প্রয়াণের পর কেটে গিয়েছে ৮৪ বছর। এত বছরে তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে বহু কিছু। ভবন হোক বা সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক বা মেট্রো স্টেশন, কী নেই কবিগুরুর নামে! বাঙালির হৃদয়ে তাঁর গুরুত্ব চির অমলিন। কিন্তু আস্ত একখানা প্রাণীর নামের সঙ্গেও যে তিনি জড়িয়ে, সে খবর জানতেন কি? তাও আবার যে-সে প্রাণী নয়, পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ান বিশালাকায় ডাইনোসর!
কলকাতায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটের অন্তর্গত জিওলজি মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সরোপড গোত্রীয় ডাইনোসরের কাঠামো। সরোপড অর্থাৎ লম্বা গ্রীবার তৃণভোজী ডাইনোসর। ঘটনাচক্রে আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস ছিল তাদের। গলার মতো এদের লেজও দীর্ঘ। মাথা তুলনায় ছোট, পা চওড়া থামের মতো।
কলকাতার জিওলজি মিউজিয়ামে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে বড়পাসরাস টেগোরাই-এর রাজকীয় কঙ্কাল। তার অতিকায় চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের নেহাতই তুচ্ছ মনে হবে নিজের প্রাণ। প্রায় ১৮ মিটার দীর্ঘ সমগ্র কাঠামোটি।
বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর নানান জায়গা থেকে ডাইনোসরের ফসিল পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের তত্ত্বাবধানে ভারতের জিয়োলজিকাল স্টাডিজ ইউনিটেও শুরু হয়েছিল এ ধরনের এক গবেষণা। সাল ১৯৫৮। ডাইনোসরের জীবাশ্মের খোঁজে মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায়, বিশেষত প্রানহিতা-গোদাবরীর উপত্যকায় খননকাজ শুরু হয়। সেখানকার লাল পলিমাটি খুঁড়তে খুঁড়তে আচমকা বেরিয়ে এল বিরাট এক হাড়। প্রায় দেড় মিটার লম্বা এই হাড় আসলে উরুতে থাকা ফিমার। কর্মরত ফিল্ড টিমের সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন এক গাড়ির চালক। প্রকাণ্ড হাড়খানা দেখে উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আরে সাহাব ইয়ে তো বহত বড়া পাও-ওয়ালা জানোয়ার হ্যায়!’ মজার ব্যাপার, এই ঘটনাকে মাথায় রেখেই উদ্ধারকৃত ডাইনোসরটির প্রজাতির নামকরণ করা হল ‘বড়পাসরাস’।
কিন্তু তার নামের সঙ্গে রবিঠাকুর জুড়লেন কীভাবে? সেও এক গল্প বটে! ওই একটি হাড় খুঁজে পাওয়ার পর ১৯৬১ নাগাদ একেবারে জোরকদমে শুরু হয় খননের কাজ। ডাইনোসরটির ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করতে, কোমর বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েন গবেষকরা। সেই বছরই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের শতবর্ষ। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে জুরাসিক আমলের এই প্রাণীর নামে জুড়ে যায় ‘টেগোরাই’ শব্দটি। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কবিগুরুর। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এমন নামের পিছনে রয়েছে সেই সম্পর্কের প্রভাব।
কলকাতার জিওলজি মিউজিয়ামে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে বড়পাসরাস টেগোরাই-এর রাজকীয় কঙ্কাল। তার অতিকায় চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের নেহাতই তুচ্ছ মনে হবে নিজের প্রাণ। প্রায় ১৮ মিটার দীর্ঘ সমগ্র কাঠামোটি। এ তো আর পাজল নয় যে এক ঝলক দেখলেই বুঝতে পারা যাবে যে কোন হাড়ের পরেই জুড়তে হবে কোন হাড়। তাই প্রায় ১৩ বছর লেগেছে তিলে তিলে তা একের সঙ্গে এক জুড়ে সামগ্রিকভাবে দাঁড় করাতে। এমনকী এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম ‘মাউন্টেড ডাইনোসর স্কেলেটন’ (প্রদর্শনের জন্য দাঁড় করানো কঙ্কাল) এটিই।
