শীত এলেই একসময় মুকুটমণিপুর জলাধার ছিল পরিযায়ী পাখির নিশ্চিত ঠিকানা। কিন্তু সাম্প্রতিক 'পক্ষী গণনা' সেই চেনা ছবিটাকে ক্রমশ বদলে দিচ্ছে। বাঁকুড়া দক্ষিণ বনবিভাগ ও পাখি-বন্যপ্রাণ গবেষণা সংস্থা 'উইংস'-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২১ সালে মুকুটমণিপুর জলাধারে পরিযায়ী ও আবাসিক পাখির মোট সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৬০০। ২০২৫-২৬ মরশুমে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৫২০০-এর কাছাকাছি। পাঁচবছরে প্রায় ৪০% কমেছে। সেইসঙ্গে ৩২ থেকে ২২ নেমেছে প্রজাতির সংখ্যাও। পরিসংখ্যান বলছে, কমেছে হাঁস ও জলচর পাখিদের সংখ্যা। গবেষকদের মতে, এটি শুধু সংখ্যার নয়, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য হারানোর ইঙ্গিত।
ফাইল ছবি।
পাখি ও বন্যপ্রাণ গবেষক ড. অর্কজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, "পরিযায়ী পাখিরা পরিবেশের সূচক। কিছু নতুন প্রজাতির আগমনের কথা হলেও, পুরনো ও সংবেদনশীল প্রজাতির সরে যাওয়া বড় সতর্ক সংকেত।" তাঁর মতে, জলস্তরের অনিয়মিত ওঠানামা ও খাদ্যচক্রের ভাঙন এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। বনদপ্তরের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টেও উঠে এসেছে একাধিক সমস্যা। জলাধারে বেড়েছে প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটনের চাপে অনিয়ন্ত্রিত বোট চলাচল পাখিদের বিশ্রাম ও খাদ্য সংগ্রহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। মাছ ধরার জন্য বিস্তৃত ফিশিং নেট জলচর পাখিদের চলাচলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ফাইল ছবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসবের জন্য পাখিরা বিকল্প জলাভূমির খোঁজে মুখ ফিরিয়েছে। জলাধারের চরিত্র বদলের দিকেও নজর দিচ্ছেন পরিবেশবিদরা। জলস্তরের আকস্মিক বৃদ্ধি ও হ্রাস বাসা বাঁধার উপযুক্ত উপযুক্ত অগভীর অঞ্চল নষ্ট করছে। ফলে শুধু পরিযায়ী নয়, কিছু আবাসিক পাখির সংখ্যাও প্রভাবিত হচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খলের এই ভাঙন দীর্ঘমেয়াদে জলাধারের জৈব বৈচিত্র্যকে আরও দুর্বল করতে পারে বলে আশঙ্কা। বনদপ্তর ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বাঁকুড়া দক্ষিণ বন বিভাগের এডিএফও অসিত দাস বলেন, "বনদপ্তরের সঙ্গে প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের যৌথ উদ্যোগ এই সমস্যা সমাধান হবে। আগামীতে মহকুমা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট বোটিং জোন ও প্লাস্টিক ব্যবহারে কড়াকড়ি করা হবে।" পরিবেশকর্মীদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে মুকুটমণিপুর শুধু পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নয়, পরিযায়ী পাখির মানচিত্র থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।
