দুলাল দে, মস্কো: ম্যাচের সেরা তিনি তো কী! সাংবাদিক সম্মেলনে আসতেই হবে এরকম কোনও বাধ্যবাধ্যকতা নেই। বিশেষ করে তাঁর নাম আবার যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। মহাতারকাদের মুডের খবর কবে আর কে রাখতে পেরেছে? তার উপর তাঁকে যখন অহরহ ধাওয়া করছে বিশ্ব মিডিয়া।
ম্যাচ শেষে ফিফা কর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হল, সাংবাদিক সম্মেলনে পতুর্গাল টিমের কে আসছেন? একগাল গেলে হেসে মিডিয়া ম্যানেজার বললেন, “এর থেকে কঠিন প্রশ্ন আর বোধহয় হয় না। কোচ ফার্নান্দো স্যান্টোস আসবেন। এটুকুই আমরা জানি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আসা-না আসা তাঁর উপর নির্ভর করে।”
সাংবাদিক সম্মেলনে পাশের চেয়ারে বসেছিলেন পর্তুগিজ সাংবাদিক নুনো গোমেজ। বললেন, “ওকে ধরা যায় না। আমরা তো সব সময় কথা বলতে চাই। কিন্তু রোনাল্ডো না চাইলে কিছুতেই সম্ভব নয়। যখন ওর কিছু বলার ইচ্ছে হয় তখন নিজেই ডেকে নেয় আমাদের। আনপ্রেডিক্টেবল। যেমন ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতিনিধিকে প্রশ্ন করার জন্য ফিফার মিডিয়া ম্যানেজারের অনুমতি দেওয়া। বিশ্বকাপে সচরাচর ভারতীয় সাংবাদিক শুনলেই প্রশ্ন করার তালিকায় ব্যাক বেঞ্চে স্থান।
[ভাগ্যদেবী সহায়, ইরানকে হারিয়ে শেষ ষোলোর পথে স্পেন]
পর্তুগিজ সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকেই হাতে একটা ছোট জলের বোতল নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির রোনাল্ডো! আশপাশে কোথাও নেই পর্তুগাল কোচ। মুহূর্তের মধ্যে গোটা প্রেস কনফারেন্স রুমজুড়ে সাজ-সাজ রব। এই ম্যাচেই প্রবাদপ্রতিম পুসকাসকে টপকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইউরোপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৮৫) হয়েছেন রোনাল্ডো। হল ঠাসা সাংবাদিককুল দ্রুত প্রশ্নমালা তৈরি করতে ব্যস্ত। সকিন্তু কখন আর কাকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিয়েছেন রোনাল্ডো? কাউকে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বলতে শুরু করে দিলেন। আর মাঝেমাঝেই সেই পরিচিত বাঁকা মুচকি হাসি। এক হাত দূরে বসে সিআর সেভেন নিজের মতো করে বলে চলেছেন। আর মিডিয়া ভাবছে রোনাল্ডোর কথা শেষ হলেই যে যার প্রশ্নের মালা খুলে ফেলবে। কিন্তু কোথায় কী? গড়গড় করে যা বলার বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে হাসতে হাসতে সটান হলরুম ছেড়ে চলে গেলেন। উপস্থিত সাংবাদিকেরা সবাই ডাকছেন, ক্রিশ্চিয়ানো, ক্রিশ্চিয়ানো। কে শোনে কার কথা। পাশে বসা পর্তুগিজ সাংবাদিক বললেন, “ও এরকমই। নিজের দরকার ছাড়া মিডিয়ার মুখোমুখি হতে চায় না।”
[ত্রাতা সেই রোনাল্ডো, মরক্কোকে হারিয়ে নক আউটের দোরগোড়ায় পর্তুগাল]
এ বারের বিশ্বকাপে প্রথম দু’ম্যাচে চার গোল করে ফেলে এ দিন নিজে থেকে কী বলে গেলেন রোনাল্ডো? পরপর সাজিয়ে দেওয়া যাক…
…“ম্যাচটা জেতার জন্য সত্যিই ভীষণ খুশি। আমাদের জন্য ম্যাচটা খুব একটা সহজ ছিল না। মরক্কো দারুণ ডিফেন্ড করল আজ। হেরে গেলে বিশ্বকাপ থেকে ওদের বিদায় নিশ্চিত ছিল। তাই শেষ মিনিট পর্যন্ত গোল শোধের চেষ্টা করে গিয়েছে। আমার গোলটা যে শেষ পর্যন্ত পর্তুগালকে আজ জেতাতে পেরেছে, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিচ্ছে।” আজকের মতো দশ বছর আগে লুঝনিকি স্টেডিয়ামের বাঁ দিকের পোস্টেই কি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে গোল করেছিলেন রোনাল্ডো? ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে চেলসির জালে? তাঁর পাঁচটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথমটা জেতার পথে? দশ বছর বাদে লুঝনিকির গোল আবার রোনাল্ডোকে বসিয়ে দিল পুসকাসের উপর। তারপরেও যে তাঁর এ দিনের পারফরম্যান্স নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে কে ভেবেছিল? জবাবটা রোনাল্ডোর হয়ে কে দিলেন জানেন? এ দিনের পরাজিত মরক্কো দলের ফরাসি কোচ রেনার্ড। এমনই মাহাত্ম্য সিআর সেভেনের!
“ম্যাচের সেরা বাছার দায়িত্ব আমার নয় বটে। কিন্তু রোনাল্ডোর গোলের কাছেই তো আমরা আজ হেরে গেলাম। তাই না?” বললেন মরক্কো কোচ। আর পতুর্গাল কোচ ফার্নান্দো মিডফিল্ড থেকে সেভাবে বল না পেয়ে রোনাল্ডো কি ফাইনাল থার্ডে একা পড়ে যাচ্ছেন না? প্রশ্নে হাসতে হাসতে বললেন, “রোনাল্ডো একা হবে কেন? ওর পাশে পুরো পর্তুগালের মানুষ রয়েছে। আর আমাদের দল একটা পরিকল্পনামাফিক খেলছে। কেউ একা খেলছে না। পুরো দল খেলছে।”
[সুয়ারেজ কামড়ে বিক্ষত সৌদি, রাশিয়ার পর নক-আউটে নিশ্চিত উরুগুয়েও]
নক আউটে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় পতুর্গাল কোচ ছিলেন মুডে। রোনাল্ডোকে তুলনা করলেন পোর্ট ওয়াইনের সঙ্গে। “ক্রিশ্চিয়ানো হচ্ছে পোর্ট ওয়াইন। ভেবে-বুঝে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, ভালই জানে। টেকনিক, ফিটনেস সবই অসাধারণ। ক্রিশ্চিয়ানো জানে, ও কী করতে পারে।” ব্রাজিল ম্যাচে দেখেছি শুরু থেকে শেষ পুরো গ্যালারি চিৎকার করছে ওলে ওলে…ওলে ওলে। পতুর্গাল ম্যাচে গ্যালারি সারাক্ষণ চিৎকার করে গেল পোসিবা রুশিয়া (ধন্যবাদ রাশিয়া), ওলে..ওলে… ওলে। সত্যিই পোশিবা রুশিয়া! না হলে রোনাল্ডো-ম্যাজিক স্বচক্ষে তো দেখাই যেত না।
The post রোনাল্ডো যেন ঝাঁজালো পোর্ট ওয়াইন, ম্যাচ জিতে দিলখোলা কোচ স্যান্টোস appeared first on Sangbad Pratidin.
