সৃঞ্জয় বোস, মস্কো : দিদিয়ের দেশঁর মনে থাকার কথা। দিদিয়ের দেশঁর পক্ষে ভোলা অসম্ভব। ফ্রান্সের বিখ্যাত রাজপথ সাঁজেলিজের ব্রহ্মতালুতে যে অপূর্ব স্থাপত্যকার্য দিন-রাত দাঁড়িয়ে থাকে, সেই আর্ক দে টিরম্ফের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য আছে। আর্ক দে টিরম্ফ আদতে ফরাসি বিপ্লব এবং নেপোলীয় যুদ্ধের জীবন্ত দলিল। সে সব যুদ্ধে যাঁরা লড়েছিলেন এবং লড়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, প্রত্যেকের নাম লেখা আছে আর্ক দে টিরম্ফের গায়ে। ফরাসি ফুটবলের ওরকম কোনও আর্ক দে টিরম্ফ নেই। কিন্তু থাকলে দিদিয়ের দেশঁ নামটা তাতে অবশ্যই থাকত। মিশেল প্লাতিনি। তিগানা। জিনেদিন জিদানদের সঙ্গে। কে জানে, হয়তো উপরের দিকেই থাকত।
[ কার দখলে যাবে বিশ্বকাপের সোনার বল, মেসি-রোনাল্ডোর পর কে এগিয়ে দৌড়ে? ]
১৯৯৮ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স অধিনায়ক তো দিদিয়ের-ই ছিলেন! আঠানব্বইয়ের পর থেকে বিশ্বকাপে ফ্রান্স যতবার নেমেছে, অবধারিত তুলনা হয়েছে দেশঁ-জিদানদের টিমটার সঙ্গে। ফ্রান্স বলে, দেশের ফুটবল ইতিহাসে নিঃসন্দেহে ওটা তাদের শ্রেষ্ঠ টিম। রাশিয়ায় বিশ্বকাপ কভার করতে আসার আগে একটা জায়গায় পড়লাম, টিমটার একটা নামকরণও হয়েছিল। রেনবো টিম। রামধনু টিম। রেনবো টিম কারণ-দেশঁর টিমে শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামি- নানা গাত্রবর্ণের ফুটবলারের সমাগম ঘটেছিল। কেউ ফ্রান্সের। কেউ আফ্রিকার। কেউ আলজিরিয়ার। কেউ আর্মেনিয়ার। বিশ্বজয়ের কুড়ি বছর পর আজ শুক্রবার, কোচ দিদিয়ের যে টিমটা নিয়ে নিঝনি নভগরদে নামবেন, সেটাও আশ্চর্যজনক ভাবে ‘রেনবো’ টিম! পল পোগবা, এনগোলো কঁতে, আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতানো কিলিয়ান এমবাপে, রাফায়েল ভারান- এঁদের কারও ধমনিতে নিখাদ ফরাসি রক্ত নেই। পোগবা গিনিজাত। কঁতে মালির। এমবাপের পূর্বপুরুষরা নাইজেরিয়ার। ভারান আবার মার্টনিক নামে যে দ্বীপে জন্মেছেন, তার অর্ধেক মালিকানা ফ্রান্সের। অর্ধেক ক্যারিবিয়ান।
[ জুভেন্তাসে রোনাল্ডোর সইসাবুদ শেষ! রিয়ালে বদলি হিসেবে আসছেন এমবাপে? ]
কিন্তু প্রশ্ন হল, অধিনায়ক দিদিয়ের যে গর্বের মুকুট কুড়ি বছর আগে পরিয়ে দিয়েছিলেন দেশকে, কোচ দিদিয়ের তা পারবেন কি? শোনা যায়, আটানব্বইয়ে বিশ্বজয়ের পর আত্মহারা হয়ে আর্ক দে টিরম্ফের ছাদে উঠে পড়েছিল লোক, সঁজেলিজে ধরে হেঁটেছিল লক্ষাধিক। দেশঁর যা মনে থাকা উচিত। আগামী ১৫ জুলাই, ২০১৮-তেও কি একই জিনিস ঘটবে? আর্ক দে টিরম্ফের ছাদে উঠে আবার জাতীয় সঙ্গীত ‘লা মার্সেই’ গাইবে ফ্রান্স? ‘আলে লে ব্ল্যু’ চিৎকারে কর্ণগহ্বর আবার ফাটিয়ে দেবে রাতের সঁজেলিজে? কোচ দিদিয়ের পারবেন কি না-র উত্তর আজ থেকে শুরু। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে শুক্রবার কোয়ার্টার ফাইনালে আদতে দিদিয়েরের প্রি টেস্ট। জিতলে ১০ জুলাইয়ের সেমিফাইনাল নামক টেস্টে বসবেন। আর সেটা জিতলে ১৫ জুলাই ফাইনাল পরীক্ষা। একদিক থেকে দেখতে গেলে, কাগজে-কলমে ফরাসি কোচের কাজটা সবচেয়ে কঠিন। সেমিফাইনালে ব্রাজিল যদি পড়ে, সাম্প্রতিক রেকর্ড থাকবে ফ্রান্সের দিকে। কিন্তু উরুগুয়ে? আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি হোক বা বিশ্বকাপ- দু’জায়গাতেই ফ্রান্সিসকোলির দেশের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের রেকর্ড বেশ খারাপ। লুই সুয়ারেজদের টিমের বিরুদ্ধে নামার চব্বিশ ঘণ্টা আগে দেখলাম, ফ্রান্সেরই এক কাগজ উরুগুয়েকে ‘মোস্ট হেটেড অপোনেন্ট’-এর তকমা দিয়েছে। স্বাভাবিক। দেশঁ ফ্রান্সের কোচ হয়ে আসার পর উরুগুয়েকে দু’বার খেলেছেন। একবার ড্র। একবার হার। বিশ্বকাপে দেখা হয়েছে আজ পর্যন্ত তিন বার। ১৯৬৬। ২০০২। ২০১০। ছেষট্টিতে হার। শেষ দু’বার ড্র। প্রথমে তো রেকর্ড। তার উপর দ্বিতীয় খবরটাও ফরাসি কোচকে মোটেও প্রসন্ন করবে না।
বোঝা যায়, ফরাসি কোচ এবং মিডিয়া-দু’পক্ষই এমবাপেকে সম্ভাব্য অস্ত্র করে কোয়ার্টার ফাইনাল যুদ্ধ জিততে চাইছে। কিন্তু ঘটনা হল ফর্মে, কাগজে-কলমে যেমন ফ্রান্স এগিয়ে। তেমন কয়েকটা আবার অস্বস্তির কাঁটাও তাদের রয়েছে।
যেমন, ইতিহাস। যেমন, ওসমান দেম্বেলে। যেমন, উরুগুয়ের ‘এল মায়েস্ত্রো’ এবং ‘এল পিস্তলেরো।’ লুই সুয়ারেজদের বিরুদ্ধে নামার চব্বিশ ঘণ্টা আগে দেখলাম, ফরাসি কাগজ-টাগজ উরুগুয়েকে ‘মোস্ট হেটেড টিমের’ তকমা দিয়েছে। আর দেশঁর ‘মোস্ট হেটেড প্লেয়ার’ নাকি দেম্বেলে। শেষেরটা আগে বলে নিই। বরুসিয়া ডর্টমুন্ড ছাড়ার সময় যে আচরণ দেম্বেলে করেছিলেন, তা ভাল লাগেনি ফ্রান্স কোচের। এ দিন প্রায় ফেটে পড়ে বলে দিয়েছেন, “প্লেয়ারের এ রকম মানসিকতা আমি সহ্য করতে পারি না। ও ক্লাবকে তো বটেই। জাতীয় দলকেও ভুগিয়েছে।” আর সমগ্র ফ্রান্সের কাছে উরুগুয়ের ‘মোস্ট হেটেড টিম’ হওয়ার কারণ রেকর্ড। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে জিদানের দেশের রেকর্ড খারাপ নয়, অতীব খারাপ। আজ পর্যন্ত দু’দেশের সাক্ষাতে ফ্রান্স জিতেছে কি না মাত্র একবার! দেশঁ ফরাসি কোচের সিংহাসনে আসার পর একবারও উরুগুয়ের বিরুদ্ধে জেতেননি। একবার ড্র। একবার হার। বিশ্বকাপে তিন বার দেখা হয়েছে উরুগুয়ের সঙ্গে। ১৯৬৬, ২০০২, ২০১০। ছেষট্টিতে হার। পরের দু’বার ড্র। সহজে, বিশ্বকাপে ফ্রান্সিসকোলির দেশের বিরুদ্ধে কোনও জয় নেই।
[ মেসিদের যুগ শেষ! রোনাল্ডোর মতে, এবার দুনিয়া কাঁপাবে নেইমার ]
এর সঙ্গে কোথা থেকে আবার জুড়ে গিয়েছে এডিনসন কাভানি নাটক! এতদিন বলা হচ্ছিল, কাভানি পারবেন না। পর্তুগাল ম্যাচের চোট তাঁর এখনও সারেনি। বুধবার পর্যন্ত তাই-ই ঠিক ছিল। কিন্তু এ দিন শুনলাম, সব ঘুরে গিয়েছে। কাভানি প্র্যাকটিসে নেমে পড়েছেন! দেশঁ ধরেই রাখছেন, কাভানি খেলবেন। বলেও দিলেন, সেই মতো টিম নামাবেন। কিন্তু কাভানি নামবেন কি? কে জানে। উরুগুয়ে কোচ অস্কার তাবারেজকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করামাত্র তো তিনি প্রবল চটে গেলেন। বললেন, “আপনাদের যা ইচ্ছে লিখুন। আমার পক্ষে কাভানি নিয়ে বলা সম্ভব নয়।” তাবারেজ পরিষ্কার করে কিছু বললেন না। কিন্তু কাভানি না পারলেও তাবারেজের মগজাস্ত্রকে অস্বীকার করবে কে? স্টুয়ানির নাম পরিবর্ত হিসেবে শোনা যাচ্ছে। সুয়ারেজ-কাভানির প্রতাপে যিনি নাকি এত দিন চাপা পড়েছিলেন। তা সে শেষ পর্যন্ত কাভানিই হন বা স্টুয়ানি- কিছু একটা তো ভেবে রেখেছেন উরুগুয়ে ফুটবলের ‘এল মায়েস্ত্রো।’ নার্ভের রোগে আক্রান্ত তাবারেজ আর হাঁটতে পারেন না। কার্টে করে প্র্যাকটিসে আসেন। কিন্তু শোনা যায়, একাত্তর বছরেও তাঁর মোটিভেশনাল স্পিচগুলো আজও বড় জীবন্ত। দিয়েগো ফোরলান প্রিয় কোচকে নিয়ে একবার লিখেছিলেন, ‘উনি বলেন, তোমরা এগারো জন মাথা উঁচু করে মাঠে ঢুকছ। আমি দেখতে চাই, এগারো জনই মাথা উঁচু করেই বেরোচ্ছ!’ তাবারেজের স্পিচগুলো নাকি সংক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু তাতে প্লেয়ারের অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়ে। যে স্পিচে আবার একজন আজ তেতে গেলে দেঁশর মুশকিল। তিনি-সুয়ারেজ, লুই সুয়ারেজ। ডাকনাম- এল পিস্তলেরো। ইংরেজিতে ‘দ্য গানম্যান।’
দেশঁ যেমন নতুন ‘রেনবো’ টিম নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের চূড়ো ছুঁতে চাইছেন। লুই সুয়ারেজ তেমন নামবেন ব্যক্তিগত টার্গেটবোর্ড নিয়ে। শাপমুক্তির টার্গেটবোর্ড। চার বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ইতালি ম্যাচে কিয়েলিনিকে কামড়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র ধিক্কারের সামনে পড়েছিলেন সুয়ারেজ। ফিফা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে নির্বাসিত করে দিয়েছিল। ব্রাজিল বিশ্বকাপে উরুগুয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল ঠিকই। কিন্তু ‘নির্বাসিত’ সুয়ারেজের নামা হয়নি, টিমও কলম্বিয়ার কাছে হেরে গিয়েছিল। সুয়ারেজ ফিরেছিলেন অভিশাপ আর মনুষ্যরূপী ‘নরখাদকের’ বিশেষণ নিয়ে। দেখতে গেলে, চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপ সুয়ারেজের সামনে শাপমুক্তির শ্রেষ্ঠ মঞ্চ এনে ফেলেছে। কাভানি না পারলে, আর তিনি একার দক্ষতায় পারলে, যা আরও বেশি মর্যাদা পাবে। লোকে বলবে, আক্রমণের জোড়া শ্বদন্তের একটা ছাড়াই তো পারল উরুগুয়ে। পারলেন সুয়ারেজ। পারবেন সুয়ারেজ? ‘দ্য গানম্যান’ আজ পারবেন ‘গুলি’তে ফরাসি ফুটবল নামক কবিতাকে ধ্বংস করে দিতে? পারবেন ল্যুভরে রক্ষিত মোনালিসার চোখে দুঃখের বাষ্প জমা করতে? ‘নরখাদক’ বিশেষণটা লুই সুয়ারেজের আজ কিন্তু মনে পড়ার কথা। লুই সুয়ারেজের পক্ষে তা ভোলা যে অসম্ভব।
The post আজ দেশঁ বনাম তাবারেজ, সুয়ারেজ-এমবাপে দ্বৈরথের জন্য মুখিয়ে বিশ্ব appeared first on Sangbad Pratidin.
