shono
Advertisement

Breaking News

WB Assembly Election 2026

মতুয়াদের নাম বাদই আসল ফ্যাক্টর! বাগদায় ননদ-বউদির ঝগড়ায় শেষ হাসি কার?

এমনিতে বাগদা কেন্দ্রটি তৃণমূলের পুরনো গড়। সেই ২০০৬ সালে ওই কেন্দ্রে জোড়াফুল ফোটান দুলাল বর। ২০২১ সালে বিশ্বজিত দাসের হাত ধরে ফের বাগদায় জোড়াফুল ফোটে।
Published By: Subhajit MandalPosted: 04:44 PM Apr 25, 2026Updated: 05:32 PM Apr 25, 2026

মাথায় ওড়না, ঘামে ভেজা মুখ। চাঁদিফাটা দুপুরে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন বছর ছাব্বিশের তরুণী। মধুপর্ণা ঠাকুর। ২০২৪ সালে উপনির্বাচনে জয়ের পর রাজনীতির ময়দানে তাঁর এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা। এবার তাঁর লড়াই যেমন রাজনৈতিক, তেমন পারিবারিকও। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁরই বউদি সোমা ঠাকুর।

Advertisement

মধুপর্ণা ঠাকুর। ছবি সোশাল মিডিয়া।

দক্ষিণ, বাগদা ও গাইঘাটা—এ বার নির্বাচনের আগে জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই চারটি আসনই বিজেপির দখলে গেলেও, পাঁচ বছর পর সেই জমি অনেকটাই নড়বড়ে হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সংগঠনের ভিতরে ক্ষোভ, প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ, উন্নয়ন ঘাটতির অভিযোগ এবং সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া—সব মিলিয়ে এ বার গেরুয়া শিবিরকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

চার কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে বাগদা বিধানসভা। উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুরের জয় এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এ বারও তৃণমূল তাঁকেই প্রার্থী করেছে। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হিসেবে তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আবেগঘন সংযোগ মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী করেছে ঠাকুরবাড়ির বৌ সোমা ঠাকুরকে। কিন্তু দলীয় কর্মীদের একাংশের মধ্যে তাঁকে ঘিরে ক্ষোভ রয়েছে বলে অভিযোগ। তার উপর বিজেপি নেতা দুলাল বর নির্দল প্রার্থী হওয়ায় ভোটভাগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রে বিজেপির লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

সোমা ঠাকুর। ফাইল ছবি।

এমনিতে বাগদা কেন্দ্রটি তৃণমূলের পুরনো গড়। সেই ২০০৬ সালে ওই কেন্দ্রে জোড়াফুল ফোটান দুলাল বর। অবশ্য ২০১১ ও ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে শাসকদল জেতেনি। দুলাল বর দল ছেড়ে কংগ্রেসে যাওয়ায় সমীকরণে বদল আসে। ২০২১ সালে বিশ্বজিত দাসের হাত ধরে ফের বাগদায় জোড়াফুল ফোটে। কিন্তু বিশ্বজিতও দল ছাড়েন বছর দুইয়ের মধ্যেই। তাঁর ছেড়ে যাওয়া আসনে ২৫ বছরের মধুপর্ণাকে প্রার্থী করে জিতিয়ে আনে তৃণমূল। এবারও সেই মধুপর্ণাই ভরসা তৃণমূলের। বছর ছাব্বিশের তরুণী পরিশ্রমও করছেন। সরু গলি, কাঁচা রাস্তা, পুকুরপাড়, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটে বেড়ানো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলা, হাত মেলানো, কারও অভিযোগ শোনা, কারও আশা জাগানো, এই নিয়েই চলছে প্রচার। ঠাকুরবাড়ির সদস্য, বড়মা বীণাপাণি ঠাকুরের নাতনি মধুপর্ণার সঙ্গে মতুয়াদের আত্মিক যোগ রয়েছে। শুধু পারিবারিক পরিচয়ের উপরে নির্ভর না করে, মাটিতে নেমে সেই সম্পর্ককে আরও পোক্ত করছেন। তাঁর প্রতিপক্ষ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী সোমা ঠাকুর। তিনিও জোরকদমে প্রচার করছেন। সোমার কথায়, “২০১৯ সালে স্বামীর পাশে থেকে প্রচার করেছি। তাই লড়াইটা আমার কাছে স্বাভাবিক।” শান্তনুর নিজস্ব জনসংযোগও তাঁর পক্ষে অ্যাডভান্টেজ। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধেও উন্নয়ন না হওয়ার অভিযোগও উঠছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুত বনগাঁ-বাগদা রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে সামনে এনে প্রচার চালাচ্ছে, যা বিজেপির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তৃণমূল-বিজেপির বাইরে লড়াইয়ে রয়েছে সিপিএম এবং কংগ্রেসও। তবে ঠাকুরবাড়ির দুই সদস্যের লড়াইয়ে তাঁরা খুব বেশি ফ্যাক্টর হবেন না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। 

এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বনগাঁ মহকুমার চারটি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৫৬৯ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। পাশাপাশি বিবেচনাধীন তালিকা মিলিয়ে আরও ৮৫ হাজার ৩৯৬ জনের নাম বাদ গিয়েছে। শুধু বাগদা কেন্দ্রেই ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ভোটারের মধ্যে ৫৫ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই বাদ পড়াদের মধ্যে বড় অংশই মতুয়া উদ্বাস্তু সম্প্রদায়ের। ফলে এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক নয়, সরাসরি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মতুয়া সমাজের একাংশের অভিযোগ, বিজেপি আগে আশ্বাস দিয়েছিল-কোনও হিন্দু মতুয়া উদ্বাস্তু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না। কিন্তু বাস্তবে বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এতে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এসবের মধ্যে আবার শান্তনু ঠাকুর হিন্দু হওয়ার প্রমাণ হিসাবে টাকার বিনিমিয়ে মতুয়া সার্টিফিকেট বিলি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেটা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। মতুয়া ভোটারদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মতুয়া ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা—তিনটিই স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাগদা মতুয়া ভোটাররাই দীর্ঘদিন ধরে ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। ফলে তাঁদের একাংশের ক্ষোভ বা সমর্থন দুই-ই সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে নির্বাচনের ফলাফলে। তাছাড়া প্রভাবশালী নেতা দুলাল বর নির্দল হওয়ায় বিজেপির চাপ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার পালটা বিজেপি বলছে, তৃণমূলও বিশ্বজিত বিশ্বাসকে তাঁর পুরনো আসন থেকে সরিয়ে অন্যত্র প্রার্থী করেছে। সেটার প্রভাব পড়বে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে শুধু দলীয় সংগঠন বা প্রচার নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে নাগরিকত্ব ও সিএএ নিয়ে প্রত্যাশা, অন্যদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বাস্তবতা—এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করতে পারে ভোটের রায়। সব মিলিয়ে, বাগদা কেন্দ্রেই এ বার লড়াই অত্যন্ত তীব্র ও অনিশ্চিত। মতুয়া ভোট কোন দিকে যাবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দিতে পারে কে এগিয়ে থাকবে আর কে পিছিয়ে পড়বে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement