shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

বিজেপির পক্ষে থাকবে মতুয়া ভোট? বনগাঁ-বসিরহাটে তৃণমূলের কামব্যাকে কাঁটা শাহজাহান!

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। আক্ষরিক অর্থেই অনেক বৈচিত্র্য এই জেলায়। বনগাঁ-বসিরহাট এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া।
Published By: Suhrid DasPosted: 07:33 PM Apr 25, 2026Updated: 08:23 PM Apr 25, 2026

চিত্র ১, কিছুদিন আগেই বারুনি মেলা ছিল। এলাকা তো বটেই দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন ঠাকুরবাড়িতে। এখনও আশপাশের এলাকা থেকে ভিড় করছেন বহু মানুষ। এদিন ঠাকুরবাড়ি থেকে বেরলেও মুখে হাসি নেই এক মাঝবয়সী মহিলার! কোনও সমস্যা? ওই মহিলা জানান, এসআইআরে নাম বাদ পড়েছে। ট্র‍্যাইবুনালে কীভাবে আবেদন করা যায়, সেই জানতেই সেখানে আসা। গোবরডাঙা স্টেশনের সামনেই টোটো স্ট্যান্ডে জনা কয়েক স্থানীয় আড্ডা দিচ্ছেন। ভোটের হাওয়া কেমন জিজ্ঞেস করতেই, তাঁরা হেসে ওঠেন। "ভোট তো ঠাকুরবাড়ি ঘিরে। তৃণমূল আগে ভোট পেত। এখন বিজেপি পায়।" স্পষ্ট কথা এক ব্যক্তির৷ আরেক ব্যক্তি বলে ওঠেন, "তৃণমূল-বিজেপির লড়াই। এসআইআর-এ বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। তবে শেষপর্যন্ত মানুষের রায় বিজেপির দিকেই থাকার সম্ভাবনা বেশি।" 

Advertisement

চিত্র ২, মিনাখাঁ বিধানসভার বাঁকসা এলাকা৷ সন্ধ্যা প্রায় নিভু নিভু। বিদ্যাধরী নদীর ফেড়িঘাটের দিকে প্রায় হাঁটাদৌড় দিচ্ছিলেন মনোজ ভুইয়া নামে এক ব্যক্তি। কথা বলতে যেতেই, তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, "লঞ্চ না পেলে আর ওপাড়ে যেতে পারব না৷ পরে কথা হবে...।" বলেই এবার তিনি ছুট লাগালেন। স্থানীয়রাই জানালেন, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেষ ফেরি চলে যাবে। না পেলে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। না হলে অনেক ঘুরপথে যাওয়া, টাকাও বিস্তর খরচ হবে৷ কেবল এই এলাকাই নয়, অনেক জায়গাতেই ফেরি চলাচল সন্ধের আগে বন্ধ হয়ে যায়৷ উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি এলাকায় একাধিক এমন জায়গা আছে৷ উন্নয়ন হলেও এখনও অনেক বাকি। জানাচ্ছেন এলাকারই বাসিন্দারা। 

বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস ৷ নিজস্ব চিত্র

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। আক্ষরিক অর্থেই অনেক বৈচিত্র্য এই জেলায়। বনগাঁ-বসিরহাট এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দিয়ে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। আবার কোথাও বাড়ির উঠোন হিসেব মতো বাংলাদেশে, আর রান্নাঘর ইন্ডিয়ায়! এছাড়াও আছে প্রচুর সংখ্যায় নদীপথ ও একদম জেলার শেষ সীমায় সুন্দরবনের একাংশ। একাধিক দ্বীপে বহু পরিবারের বাস। এবারও বিধানসভা নির্বাচনের (WB Assembly Election 2026) উত্তাপ এইসব অঞ্চলে বাড়ছে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনের বদল কি ঘটবে? এলাকায় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বিজেপি, তৃণমূলের নেতারা। ভোটের ফলপ্রকাশের পরের দিনগুলিতে কি উন্নত পরিষেবা পাওয়া যাবে? উন্নয়নের জন্য ১০০ শতাংশ কাজ হবে এলাকায়? প্রশ্ন শুনে হাসতে থাকেন স্বরূপনগর এলাকার এক প্রৌঢ়।

এবার জেলার এই দুই অংশে ভোটের হাওয়া কেমন? তৃণমূল নাকি বিজেপি? কার পাল্লা ভারী? বেশিরভাগেরই বক্তব্য, এসআইআর প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষের নাম বাদ গিয়েছে৷ হিন্দু ভোটও বাদ গিয়েছে, মুসলমান ভোটও৷ ফলে এবার অনেকক্ষেত্রেই হাওয়া বোঝা কঠিন। যদিও তৃণমূলের বক্তব্য, মতুয়ারা বিজেপিকে বিশ্বাস করে ঠকেছে। এবার মতুয়া গড়ে বিজেপির থেকে মানুষ সরে আসবে। তৃণমূল এই মহকুমায় ভালো ফল করবে। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি, রাজ্যজুড়েই এবার বদল হবে। সন্দেশখালিতে শেখ শাহজাহানের 'অত্যাচারের' কথা সামনে এসে গিয়েছে! মানুষ এবার তৃণমূলের আতঙ্ক থেকে বেরতে বিজেপিকে ভোট দেবে।

জেলার রাজনীতি...

রাজনৈতিক দিক থেকে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ ও বসিরহাট এই দুই মহকুমা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। একদিকে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় অংশের বসবাস। মতুয়া ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্র করে বনগাঁর রাজনীতি গত দুই দশক ধরে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ২০১১ সালের পর থেকে উত্তর ২৪ পরগনা শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম গড় হয়ে ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির বড় মা বীণাপাণি দেবীর সুসম্পর্ক ছিল। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝোঁকে। ঠাকুরবাড়ির বীণাপাণি দেবীর দুই পুত্র কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর ও মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর যোগ দিয়েছিলেন রাজ্য রাজনীতিতে। সিপিএম ও তৃণমূলের মন্ত্রী, রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন তাঁরা। বলা বাহুল্য, সেখান থেকেই এই ঠাকুর পরিবারে একের পর এক বিবাদ। 

বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে প্রচারে বিজেপি অশোক কীর্তনিয়া ৷ নিজস্ব চিত্র

সিপিএম ও তৃণমূল দুই শিবিরে সেসময় ঠাকুরবাড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের পুত্র শান্তনু ঠাকুর বিজেপিতে যোগদান করেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। বিজেপি-তৃণমূল বিভাজন দেখা যায় ঠাকুরবাড়িতে। এবারও ঠাকুরবাড়ি থেকে দুই শিবিরের প্রার্থী ভোটে লড়ছেন। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক প্রায় সবটাই বিজেপির দিকে ঝুঁকে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তিনি জিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হন। SIR-এর পরে কার পক্ষে মতুয়ারা? সেই প্রশ্ন রয়েছে।

বনগাঁ মহকুমায় বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ, গাইঘাটা ও বাগদা--এই চারটি বিধানসভা রয়েছে। এছাড়াও রানাঘাটের একটা অংশ বনগাঁর গাঁ ঘেঁসে রয়েছে। এই গোটা এলাকাটি মতুয়া গড় হিসেবে পরিচিত রাজ্য রাজনীতিতে। শুধু তাই নয়, গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে এই এলাকার বড় অংশের ভোট পদ্মফুলে গিয়েছে। এই মুহূর্তে দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি রানাঘাট-বনগাঁ এলাকা। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ। এবার ভোটে কী হবে? স্থানীয়দের অনেকেরই মতে, উন্নয়ন থেকে সীমান্ত এলাকার মানুষের দুরবস্থা বছর বছর একই থেকে যায়। বনগাঁ স্টেশন এলাকার কয়েক জন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তৃণমূলের একের পর দুর্নীতি আর বিজেপির প্রতিশ্রুতি। এই দু'য়ের জাতাকলে এলাকার মানুষজন যেন আটকে আছে। কিছু হওয়ার উপক্রম নেই!

বসিরহাট মহকুমা এলাকা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উলটো। এই মহকুমায় আটটি বিধানসভা কেন্দ্র। বসিরহাটে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক অন্যতম ফ্যাক্টর। সব বিধানসভা আসনেই ৩০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে বলে খবর। আটটি কেন্দ্রের সাতটিতেই তৃণমূল কংগ্রেস গতবার জয় পেয়েছিল। এই এলাকা তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। এমনই মনে করে রাজনৈতিক মহল। তবে গত দু'বছরে সন্দেশখালি রাজ্য-রাজনীতির অন্যতম চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ বিজেপি নেতাদের ভাষণে বারবার উঠে এসেছে সন্দেশখালি প্রসঙ্গ। গত লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের অন্যতম ইস্যু ছিল সন্দেশখালি। শেখ শাহজাহানের 'অত্যাচার', 'নারী নির্যাতনে'র ভয়াবহ অভিযোগের কথা সামনে আসে৷ শাহজাহান এলাকার বেতাজ বাদশা, সেকথাও জানা গিয়েছিল। ভয়ে মানুষজন মুখবন্ধ রাখতেন। ওই তৃণমূল নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হয়েছিল ইডির আধিকারিকদের। এখন শাহজাহান আদালতের নির্দেশে গরাদের ওপারে। শাহজাহানহীন সন্দেশখালিতে 'ভয়মুক্ত' ভোট কি হবে এবার? মানুষ কি নিজের মতামত রাখতে পারবে এবার? তৃণমূলের কাঁটা হয়ে উঠবে না তো শেখ শাহজাহান? সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। 

বনগাঁ দক্ষিণে প্রচারে বিজেপির স্বপন মজুমদার। নিজস্ব চিত্র

এবারের নির্বাচনে নজরকাড়া মুখ...

বনগাঁ, গাইঘাটা, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, কল্যাণী, হরিণঘাটা মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকা। এই মুহূর্তে বনগাঁ, রানাঘাট এলাকা বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি। এই এলাকার সবক'টি বিধানসভা কেন্দ্রেই ২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল গেরুয়া শিবির। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও জোড়াফুল সেভাবে এইসব এলাকায় প্রভাব ফেলতে পারেনি। বনগাঁ মহকুমা এলাকায় বিজেপির দিকে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক ঝুঁকে রয়েছে। এসআইআর হওয়ার পরেও গেরুয়া শিবির ও শান্তনু ঠাকুরের প্রভাব যথেষ্ট তাদের উপর রয়েছে। এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা অংশ। অন্যদিকে, বীণাপানি দেবীর পুত্রবধূ মমতাবালা ঠাকুর এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ। তিনি নিজেও এলাকার তৃণমূল নেত্রী। বলাবাহুল্য এই মুহূর্তে ঠাকুরবাড়ি বিজেপি ও তৃণমূল দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। 

বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী ঋতুপর্ণা আঢ্য। বিজেপির হয়ে লড়ছেন স্বপন মজুমদার। বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে বিশ্বজিৎ দাস তৃণমূলের প্রার্থী। ওই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়া। বাগদা কেন্দ্রে লড়াইয়ে ঠাকুরবাড়ির দুই মুখ। ওই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুর। বিজেপির হয়ে লড়ছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী সোমা ঠাকুর। ননদ ও বউদি ওই কেন্দ্রে লড়ছেন। হিঙ্গলগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী সন্দেশখালি আন্দোলনের মুখ রেখা পাত্র। মিনাখাঁয় তৃণমূলের মুখ ঊষারানি মণ্ডল। 

বাগদা কেন্দ্রে প্রচারে বিজেপি প্রার্থী সোমা ঠাকুর। নিজস্ব চিত্র

শান্তনু ঠাকুর জানিয়েছেন, মতুয়ারা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে এই বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সঙ্গে রয়েছে। ফলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এসআইআরে যাদের নাম বাদ গিয়েছে, তারা নাগরিকত্ব আইনে আবেদন করতে পারবেন। পরে দেশের নাগরিক করা হবে। অনেকের কাছে নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট ইতিমধ্যেই এসে গিয়েছে। যদিও মমতাবালা ঠাকুর জানিয়েছেন, এসআইআরের নামে হাজার হাজার মতুয়ার নাম বাদ গিয়েছে। এজন্য দায়ী শান্তনু ঠাকুর ও বিজেপি সরকার। মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

বসিরহাট মহকুমা অঞ্চলে গত ১৫ বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের একচেটিয়া প্রভাব দেখা গিয়েছে। ২০২১ সালে আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল জোড়া ফুল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ফল যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল৷ এই মহকুমায় হিন্দু ও মুসলমান ভোটের ফারাক রয়েছে বহু কেন্দ্রে৷ সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক বরাবর তৃণমূলের দিকে গিয়েছে। এদিকে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। ফলে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিজেপি ভালো ফল করতে পারে। এমন সম্ভাবনার কথা মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

কোন ফ্যাক্টরে এবার ভোট?

এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, সীমান্তপারের সমস্যা, সাধারণ মানুষের রুটিরুজি থেকে এসআইআর একাধিক বিষয়--এবারও নির্বাচনে উঠে এসেছে। বনগাঁ ও বসিরহাটের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ও মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এসআইআরে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, বসিরহাট এলাকায় এসআইআরে বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রে ৫০ হাজার নাম বাদ পড়েছে। বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ আসনে মোট ৭৮ হাজার মানুষের নাম কাটা গিয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই গোটা এলাকা বিজেপির দখলে ছিল। বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় বিজেপির ভোটব্যাঙ্কেও ধাক্কা লাগবে, এমনই বলছে রাজনৈতিক মহল। বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে ধাক্কা লাগলে গতবারের ফলাফল উলটে যাবে কি? সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। 

মধুপর্ণা ঠাকুর। ছবি সোশাল মিডিয়া।

বনগাঁ-গাইঘাটা এলাকা মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকে মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে বিজেপি প্রচার করছে। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ থেকে বিজেপির তাবড় নেতারা মতুয়াদের জন্য বহু সময় বার্তা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনও কার্যকারিতা সেভাবে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। বনগাঁ মহকুমায় প্রায় ৬ শতাংশ মতুয়া ভোট রয়েছে বলে খবর। শান্তনু ঠাকুরের আমলে প্রায় সবটাই বিজেপির ঝুলিতে জমা হয়। কিন্তু এসআইআর পরবর্তী সময়ে গোটা এলাকায় এই মুহূর্তে মতুয়াদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে তৃণমূল নাকি বিজেপি? কাদের পক্ষে তাঁরা দাঁড়াবেন? সেই চর্চা বিভিন্ন এলাকায় এই সম্প্রদায়ের মানুষজন করছে। বিজেপির থেকে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক কি তাহলে সরবে? নাকি এবারও গেরুয়া শিবিরের প্রতি ভরসা রাখবে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ অনুগামীরা? শান্তনু ঠাকুর বলেন, "নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ জানিয়েছেন, মতুয়াদের কাউকে বাংলাদেশে যেতে হবে না। নাগরিকত্ব আইনে সকলে এদেশের নাগরিক হবেন।"

বনগাঁ, গাইঘাটা এলাকাজুড়ে বহু ক্ষেত্রেই অনুন্নয়নের অভিযোগ উঠেছে। এলাকার মানুষজনের দাবি, মহিলাদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রয়েছে। কন্যাশ্রীর টাকা পাচ্ছে মেয়েরা। বেকার যুবকদেরও এখন মাসে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসবে কি এলাকার সার্বিক উন্নয়ন সেভাবে হচ্ছে? চাষের খরচ বাড়ছে প্রতি মরশুমে। এদিকে ফসলের দাম সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না! কাজের আরও সংস্থান প্রয়োজন। এমনই মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা৷ "রাজনীতির নেতাদের থেকে কেবল প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়৷ মানুষের জীবন আরও অন্ধকারে যাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, সংসার চালানো কষ্টের ব্যাপার। শাসক দলের লোকজন চমকায়, আর বিজেপি প্রতিশ্রুতি দেয়!" হাসতে হাসতে এমনই মন্তব্য এক প্রৌঢ়ের। 

হিঙ্গলগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র। নিজস্ব চিত্র

এই জেলার আরও একটি মহকুমা বসিরহাট। সন্দেশখালি গত দু'বছর ধরে রাজ্য রাজনীতির চর্চায়। প্রাক্তন তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের দাপটে এলাকার মানুষ ভয়ে মুখবন্ধ করে রাখত। মানুষের চাষের জমি, মাছের ভেড়ি লুট হয়ে যেত বলে অভিযোগ। এলাকার মহিলাদের সম্মানও বেআব্রু হত! একাধিক অভিযোগ সামনে আসে৷ একসময় এলাকার মানুষজন প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। মহিলারা সামনের সারিতে ছিলেন। সেসময়ের আন্দোলনের অন্যতম মুখ রেখা পাত্র এবার হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপির প্রার্থী। শেখ শাহজাহান এখন জেলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, শেখ শাহজাহানের ছেলেরা এখনও ঘোরাঘুরি করে৷ ওদের নজর সব দিকেই আছে। তবে সেই প্রতাপ কিছুটা কমেছে। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এলাকায় বছরের পর বছর দুর্নীতি চলছে৷ জমি, মাটি লুট চলছে। নদীর থেকে মাটি তোলা হচ্ছে। মাছের ভেড়ি জোর করে দখল নেওয়া হচ্ছে। এইসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির জোরালো লড়াই। এবার পরিবর্তনের পক্ষেই মানুষ রায় দেবেন বলে দাবি বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্রের। বসিরহাট মহকুমার আটটি বিধানসভা কেন্দ্র। মহিলা ভোটারের সংখ্যা পুরুষদের প্রায় সমান সমান। এবারের নির্বাচন মহিলাদের আত্মসম্মানের৷ বসিরহাটের মহিলারা এবার বিজেপির সঙ্গে আছে। এমনই দাবি রেখার।

সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, বসিরহাট উত্তর ও দক্ষিণ, বাদুড়িয়া, স্বরূপনগর, মিনাখাঁ, হাড়োয়া এই আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের একাধিক ইস্যু রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা হওয়ায় বসিরহাটে অনুপ্রবেশ দীর্ঘকালের সমস্যা। বহু সময় সাধারণ মানুষদের উপর আক্রমণ, অত্যাচার হয়। এমনই অভিযোগ বড় অংশের বাসিন্দাদের। শুধু তাই নয়, সীমান্ত এলাকায় পাচার সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। একসময় সীমান্ত দিয়ে গরুপাচার হলেও এখন বন্ধ। তবে কফসিরাপ, সোনার বিস্কুট, টাকা, অস্ত্র বিভিন্ন সময়ে পাচার হয়ে থাকে। আড়কাঠিরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়েছিটিয়ে। 

বসিরহাটে প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র

একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়েছে বসিরহাট এলাকার প্রান্তিক অঞ্চল সুন্দরবন লাগোয়া সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, হাড়োয়া, মিনখাঁ, স্বরূপনগর প্রভৃতি অঞ্চলে। ঘূর্ণিঝড়ের সেই ধ্বংসলীলার ভয় মানুষের স্মৃতিতে। আয়লার সময় গোটা এলাকা তছনছ হয়েছিল। পরবর্তীকালে যশ ও আমফান দুই ঘূর্ণিঝড় গোটা এলাকায় ফের ধ্বংসলীলা চালায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘূর্ণিঝড়ের পর বহু জায়গায় নদীবাঁধ দুর্বল হয়ে গিয়েছে। বাঁধ সারাই হলেও সব জায়গায় কাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলে অভিযোগ। জোয়ারের সময় বাঁধ ভেঙে সমুদ্রের নোনা জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় বহু এলাকা। জল ঢুকে এলাকার বহু চাষজমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে৷ নদীর কাছাকাছি বাসিন্দারা সবসময়ই ভয়ে থাকেন। বছরের নির্দিষ্ট দিনগুলিতে কোটালের সময় আজও বহু এলাকা ভেসে যায়। বর্ষা ও বিপর্যয়ের সময় স্থানীয় স্কুলবাড়িতে মানুষজনকে আশ্রয় নিতে হয়।

তৃণমূলের তরফে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, ১০০ দিনের কাজ, যুব সাথী, কন্যাশ্রী-সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের প্রচার হয়। বসিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় দুয়ারে সরকার ক্যাম্পও হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ভোটের সময় মানুষ প্রকল্পগুলির সুবিধা পাচ্ছে। আগামী দিনে আরও এলাকায় উন্নতি হবে। এমনই দাবি তৃণমূল নেতৃত্বের। মানুষ তাদের সঙ্গে আছে, এমনই জানাচ্ছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতা। যদিও সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ তৃণমূলের দুর্নীতির বিষয়টিকেই সামনে রাখছেন। এলাকায় পঞ্চায়েত স্তরে একাধিক দুর্নীতি হয়েছে, সে কথা জানাচ্ছেন গ্রামের একাধিক সাধারণ মানুষ৷ তবে গোটা বসিরহাট মহকুমার সব জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। রাস্তাঘাটের উন্নতি হয়েছে। জাতীয় সড়কের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রাস্তাগুলিও এখন অনেক ভালো। সেই কথা এক বাক্যে স্বীকার করেছেন এলাকার মানুষজন।

 

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement