মুর্শিদাবাদের মানুষ মীরজাফরদের ক্ষমা করে না! ভোটের আবহে সাগরদিঘির অলিতে-গলিতে কান পাতলেই এই জনশ্রুতি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সাগরদিঘির আসল বেইমান, আসল মীরজাফর কে? বাইরন বিশ্বাস, বামেদের সমর্থনে যিনি কংগ্রেসের টিকিটে জিতে পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন? অধীর চৌধুরী, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ টাকার বিনিময়ে আসনটি তৃণমূলকে উপহার দিয়েছেন? নাকি মশিউর রহমান, যিনি তৃণমূল থেকে রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করে এখন বিরোধী শিবিরের 'সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য' প্রার্থী? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে সাগরদিঘির অঙ্ক।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচন। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ করানো এবং ভোট চলাকালীন বিএসএফের গুলিতে ৬ সংখ্যালঘু যুবকের মৃত্যু! এই দুই ফ্যাক্টর মুর্শিদাবাদ জেলার ভোটচিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়। একসময় কংগ্রেসের গড় মুর্শিদাবাদে দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি হাত শিবিরকে। গোটা রাজ্যেই শূন্য পায় বাম ও কংগ্রেস। সাগরদিঘি অবশ্য অনেক আগেই তৃণমূলের গড় হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই ২০১১ সালেই সেখানে জোড়াফুল ফোটান সুব্রত সাহা। একুশেও তিনি জিতলেন বিরাট ব্যবধানে। দ্বিতীয় স্থানে বিজেপির মাফুজা খাতুন। বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী নেমে যান তৃতীয় স্থানে।
কিন্তু দু'বছরেই সবটা বদলে গেল। সুব্রত সাহার অকালপ্রয়াণের জন্য উপনির্বাচন সাগরদিঘিতে। খানিক চমকপ্রদভাবে সেই উপনির্বাচনে শাসকদলের প্রার্থীকে হারিয়ে দিলেন কংগ্রেসের বাইরন বিশ্বাস। রাজ্যজুড়ে শাসকদল যখন দাপটের সর্বোচ্চ ধাপে, তখন বাইরনের সেই জয় শুধু যে ব্যতিক্রম ছিল তাই নয়, দ্বিমেরু রাজনীতিতে হতাশ বাম-কংগ্রেস সমর্থকদের জন্য বাইরন ছিলেন সোনালি রেখা, এক টুকরো আশার আলো। যদিও সেই আলো নিভতে বেশি সময় লাগেনি। বছর ঘোরার আগেই গোটা রাজ্যের বাম-কংগ্রেস সমর্থকদের হৃদয়ভঙ্গ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাইরন যোগ দিলেন তৃণমূল। তখন থেকেই যেন সাগরদিঘিতে তিনি 'গণশত্রু।' রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছে, বাইরনের সেই দলত্যাগ বাম-কংগ্রেস সমর্থকরা তো বটেই তৃণমূল এমনকী বিজেপির একটা বড় অংশও মানতে পারেননি। বাইরনের বিরুদ্ধে সেই ক্ষোভই এবারের নির্বাচনে হাতিয়ার বিরোধীদের। কিন্তু...! স্রেফ সেই ক্ষোভ দিয়েই কি বাজিমাত করা যাবে? আর যদি বাইরনকে হারাতে হয়, তাহলে হারাবেন টা কেন?
২০২৩-এ জোট প্রার্থী হিসাবে প্রচারে বাইরন। ফাইল ছবি।
সাগরদিঘির ভোটঅঙ্ক বলে এ কেন্দ্র বিজেপির জন্য উর্বর ভূমি নয় মোটেই। বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার প্রায় ২ লক্ষ ৩৭ হাজার। এর মধ্যে এসআইআরে বাদ পড়েছে ১৩ হাজার ৫০০ জনের নাম। এর বেশিরভাগই মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটার। তবে এই কেন্দ্রে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ৭২ হাজার! সেই সব ভোটারদের সমস্যা নিষ্পত্তির পর ভোট অঙ্ক বদলে যেতে পারে। আপাতত এখানে মুসলিম ভোটার ৬৩.৫ শতাংশ। হিন্দু ভোটার ৩৬.৫ শতাংশ। এর বেশিরভাগটাই আদিবাসী। এই কেন্দ্রে তৃণমূল আবারও প্রার্থী করেছে বাইরনকে। কংগ্রেসের প্রার্থী মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি মনোজ চক্রবর্তী। বিজেপির প্রার্থী তাপস চক্রবর্তী। লড়াইয়ের চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বাম এবং আইএসএফ সমর্থিত এসডিপিআই প্রার্থী মশিউর রহমান।
বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার প্রায় ২ লক্ষ ৩৭ হাজার। এর মধ্যে এসআইআরে বাদ পড়েছে ১৩ হাজার ৫০০ জনের নাম। এর বেশিরভাগই মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটার। তবে এই কেন্দ্রে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ৭২ হাজার! সেই সব ভোটারদের সমস্যা নিষ্পত্তির পর ভোট অঙ্ক বদলে যেতে পারে।
রাজ্যের অন্যান্য বিধানসভার মতো সাগরদিঘিতেও তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী। ১১টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ১০টি তৃণমূলের দখলে। বিরোধী জোটের দখলে মাত্র একটি। পঞ্চায়েত সমিতিও সংখ্যার নিরিখে শাসক দলের হাতে। তবে এলাকায় গোষ্ঠীকোন্দল চরমে। সাগরদিঘি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মশিউর রহমানও তৃণমূলের টিকিটপ্রার্থী ছিলেন। কিন্তু দল বাইরনকে প্রার্থী করায় তিনি ক্ষোভে দল ছেড়ে যোগ দেন এসডিপিআই-তে। এবং এসডিপিআইয়ের প্রার্থীও হন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণভাবে আইএসএফ এবং বামেরা এই কেন্দ্রে আলাদা প্রার্থী না দিয়ে মশিউরকেই সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি লড়বেন আইএসএফের খাম প্রতীক নিয়েই। এছাড়াও ছোটখাট গোষ্ঠীবাজি রয়েছে এলাকায়। তবে সেটাকেও ছাপিয়ে বাইরনের যেটা মূল সমস্যা সেটা হল 'মীরজাফর' তকমা। যা তৃণমূলে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নামের পাশে জুড়ে গিয়েছে। তাঁর দলবদলের সিদ্ধান্ত সাগরদিঘির মানুষ ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি। একটা সমস্যা যে হয়েছে সেটা মেনেছেন বাইরন নিজেও। প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, তাঁর দলবদলে বহু মানুষ কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর কথায়, "জানি অনেকে আমার জয়ের জন্য অনেকে উপোস করেছিলেন, অনেকে দোয়া করেছেন। কিন্তু এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে আমাকে দলবদল করতেই হত।" আরও ছোটখাট সমস্যা আছে। এলাকায় ভালো হাসপাতাল নেই, কর্মসংস্থান নেই, রাস্তাঘাট অনুন্নত। বহু মানুষকে এখনও ভিনরাজ্যে কাজ করে পেটের ভাত জোটাতে হয়। তাছাড়া বাইরনের জনসংযোগের ক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। শোনা যায়, বিধায়ক নিয়ম করে পার্টি অফিসে যান বটে, কিন্তু মাঠে নেমে জনসংযোগ বা এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা, এসব তাঁর ধাতে নেই।
বাইরনের তৃণমূলে যোগ।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও সাগরদিঘিতে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী শাসকদল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উন্নয়ন মডেলে' ভরসা রাখছে তৃণমূল। তাঁদের বক্তব্য, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষ পেয়েছে। তাছাড়া যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়ে লড়াই করেছেন, তা মানুষ দেখেছে। ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণও আমাদের পক্ষে যাবে।" তাছাড়া শাসকদলের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা বিরোধীদের ছন্নছাড়া অবস্থা। এখানে যার মূল চ্যালেঞ্জার হওয়ার কথা, সেই কংগ্রেস গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জীর্ণ। প্রায় ৬৪ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের এই কেন্দ্রে হাত শিবির প্রার্থী করেছে বৃদ্ধ-ব্রাহ্মণ মুখ তথা জেলা সভাপতি মনোজ চক্রবর্তীকে। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাকর্মীরা কোনওভাবেই ওই বহিরাগত ব্রাহ্মণ প্রার্থী মানতে নারাজ। মনোজ চক্রবর্তী শনিবার মনোনয়ন দিয়েছেন বটে, কিন্তু এলাকায় গিয়ে সেভাবে প্রচার শুরু করতে পারেননি স্রেফ গোষ্ঠীকোন্দলের জন্য। এলাকার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা সাইদুর রহমান, হাসানুজ্জামান বাপ্পারা বলছেন, স্থানীয় সংখ্যালঘু কাউকে প্রার্থী করা হলে সাগরদিঘিতে এবার বাইরনের হার নিশ্চিত ছিল। সাইদুররা বলছেন, "অধীর চৌধুরী টাকা নিয়ে বাইরনের কাছে এই সিটের টিকিট বিক্রি করেছেন।" বস্তুত অধীরের সঙ্গে বাইরনের সুসম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। বাইরন তৃণমূলে যাওয়ার পরও তাঁর প্রশংসা শোনা গিয়েছে অধীরের মুখে। সাগরদিঘির কংগ্রেস কর্মীরা তাই বাইরনের পাশাপাশি অধীরকেও মীরজাফরের চোখেই দেখেছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, প্রার্থী বদল না হলে ভোট বয়কট করবেন তাঁরা। কিন্তু জেলা নেতৃত্ব কোনওভাবেই প্রার্থী বদলে নারাজ। স্থানীয় কংগ্রেস কর্মীরা বলছেন, এভাবে একটি সম্ভাবনাময় আসন শেষ করা হল।
সাগরদিঘির কংগ্রেস কর্মীরা তাই বাইরনের পাশাপাশি অধীরকেও মীরজাফরের চোখেই দেখেছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, প্রার্থী বদল না হলে ভোট বয়কট করবেন তাঁরা। কিন্তু জেলা নেতৃত্ব কোনওভাবেই প্রার্থী বদলে নারাজ। স্থানীয় কংগ্রেস কর্মীরা বলছেন, এভাবে একটি সম্ভাবনাময় আসন শেষ করা হল।
কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী। ফাইল ছবি।
এবার আসা যাক বাইরনের দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জারের কথায়। বিজেপি। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে বিজেপির মাফুজা খাতুন দ্বিতীয় হন। কিন্তু এবার মাফুজাকে দল টিকিট দেয়নি। বদলে আনা হয়েছে তাপস চক্রবর্তীকে। তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি কিছুই নেই। বিজেপি কর্মীরাও আফসোসের সুরে বলছেন, মাফুজা প্রার্থী হলে কংগ্রেসের 'আত্মঘাতী' সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জার হওয়া যেত। স্থানীয়রা বলছেন, যে সুযোগ বিজেপি নিতে পারছে না, সেটাই এবার নিতে পারেন মশিউর রহমান। আগেই বলা হয়েছে মশিউর সাগরদিঘির খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তিনি এখনও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য। এখন বাম সমর্থিত এসডিপিআই প্রার্থী। সমর্থন রয়েছে আইএসএফেরও। তাছাড়া পাটকেলডাঙ্গা, কাবিলপুর এবং সাগরদিঘি গ্রামপঞ্চায়েতের একাংশে ভালো প্রভাব রয়েছে এসডিপিআইয়েরও। শোনা যাচ্ছে, কংগ্রেস যদি শেষমেশ প্রার্থীবদল না করে, তাহলে মশিউরের হয়ে ভোট করাতে পারেন নীচুতলার কংগ্রেস কর্মীরাও। সেটা হলে কিন্তু বাইরনের বিরুদ্ধে অঘোষিতভাবে বিরোধী জোটের প্রার্থী হয়ে যাবেন মশিউর। সেখানেই আশার আলো দেখেছে বামেরা।
তবে আপাতত সাগরদিঘির কংগ্রেস, বিজেপি, এমনকী তৃণমূল, সব দলের কর্মীরাই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, মীরজাফর কে?
