সূর্যের আলোয় তোলা চা পাতার থেকে নাকি জ্যোৎস্না-স্নাত চায়ের স্বাদ অনেক বেশি। কোজাগরী রাতে বাগানে বাগানে থাকে তুমুল ব্যস্ততা। কিন্তু গত বছর সেই কোজাগরীর ঠিক আগের রাতে নেমে এসেছিল 'অভিশাপ'। ক্রুদ্ধ তিস্তা বেয়ে নেমে এসেছিল সাক্ষাৎ মৃত্যু! একবার নয়, বারবার কোজাগরী নিয়ে এসেছে বিপর্যয়। চা বাগানের পুরনো 'ক্ষত' দগদগে হয়েছে আরও। তিস্তার দু-পারে শোনা গিয়েছে হাহাকার। মেঘ সরলেই যেখানে উঁকি মারে কাঞ্চনজঙ্ঘা, গহীন জঙ্গলে কান পাতলে শোনা যায় চিতাবাঘের পায়ের শব্দ, সেই জেলার জনজীবন মোটেই রূপকথার নয়। তবু আশা নিয়েই বোধহয় বারবার বিভিন্ন দলকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে জলপাইগুড়ির চা শ্রমিক, কৃষক কিংবা পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তথ্য বলছে, দুটি পাতা-একটি কুঁড়ির মাঝে ক্রমশ পাপড়ি মেলেছে পদ্ম। আবার সব হারানোর রোষে বিজেপি সাংসদ, বিধায়ককেও রেয়াত করেনি তারা। তাই কোন ফাঁকে রাজ্যের বর্তমান শাসক দল খেলা ঘুরিয়ে দেবে, তা বলা কঠিন।
উত্তরের যে জমি বিজেপি দিনে দিনে উর্বর করেছে, তাতে জলপাইগুড়ির অংশ অনেকটাই। হয়ত আলোর আশায় বিরোধী শিবিরকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেন এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভোটার তথা চা শ্রমিকরা। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়, ওরা থাকে সেই আঁধারেই। জানুয়ারি, ২০২৬। রাজা চা বাগানে ঝুলল নোটিস। ফেব্রুয়ারিতে আবার বাগান খোলে। অনিশ্চয়তার মেঘ বুকে চেপেই ফের নেমে পড়ে ওরা। ডিসেম্বর, ২০২৫। হাজারের বেশি শ্রমিকের ঘরে নামে অন্ধকার। রায়বাড়ি চা বাগান আজও সচল হয়নি। গত বারের পুজোর ঠিক আগে এক রাতেই তিন বাগানের মালিকপক্ষ উধাও হয়ে যায়। উৎসবের আবহে প্রদীপের নিচের অন্ধকারে ডুবে যায় রেডব্যাঙ্ক, সুরেন্দ্রনগর, চামুর্চি। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, 'ওদের টাকা নিয়ে কেউ খেলার চেষ্টা করছে।'
শুধুই বোনাস নয়, চা শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি, চা বাগানে ক্রেশ তৈরির দাবি, চা শ্রমিক সহ অন্যান্য শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, এই সব দাবিই ভোট-আবহে ঘুরেফিরে সামনে আসছে এবারও। আর সেই সঙ্গে গত অক্টোবরের দগদগে স্মৃতি। 'টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া'র তথ্য বলছে, প্রায় ১০০ কোটির ক্ষতি হয়েছিল ওই সময়। ভেসে গিয়েছিল ৪০০ হেক্টর জমি। জলপাইগুড়ির অন্তত ৪০টি চা বাগানে যে বিপুল ক্ষতি হয়েছিল, তা পূরণ হল কি? সে খবর কে রাখে?
যদিও খবর নিতে ছুটে গিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নেহাতই আনন্দে নয়, দুঃখেও যে তিনি আছেন, সেই বার্তা চা বলয়ে বারবার দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চা সুন্দরী প্রকল্পে তৈরি করেছেন ২০০-র বেশি বাড়ি। বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে তৃণমূল সরকার। তৈরি করা হয়েছে স্কুল, মিলেছে জমির পাট্টা। শুধু তাই নয়, ভোট ঘোষণার বেশ কিছুদিন আগে পাশে জেলায় দাঁড়িয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায় দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা করার কথা ঘোষণা করে দিয়ে এসেছেন। এখন সেই বিশ্বাসে শ্রমিক পরিবারগুলি তৃণমূলের সঙ্গে থাকবে? নাকি এবারও টলানো যাবে না গেরুয়া শিবিরকে?
উত্তরবঙ্গের বন্যার ছবি।
কোথায়, কার জমি শক্ত
২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তন হলেও জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) জেলায় বামফ্রন্টের ফল ভালো ছিল। ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি এবং মালবাজার আসন ছিল বাম শরিকদের দখলে। ২০১৬ থেকে খেলা ঘুরতে শুরু করে। জলপাইগুড়ি কেন্দ্র বাদে বাকি ৬ কেন্দ্রই চলে যায় তৃণমূলের দখলে। বিজেপি তখনও তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় হওয়ার লড়াই লড়ছে। তবে নাগরাকাটা বা ধূপগুড়ির মতো জায়গায় তারা উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে শুরু করেছিল বিজেপি। এদিকে, অনন্তদেব অধিকারী ততদিনে আরএসপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তবে ২০২১-এর ফলাফল বুঝিয়ে দেয়, তিস্তাপাড়ে হাওয়া ঘুরছে। চা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আসন ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, নাগরাকাটা তো বটেই, এমনকী ডালগ্রাম-ফুলবাড়িতে তৎকালীন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী গৌতম দেবকেও ধরাশায়ী করে দেয় বিজেপি। তৃণমূলের কাছে থেকে যায় জেলার জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ আর মাল। কিন্তু সেই তিন জায়গায় বিজেপির ভোট শতাংশ তৃণমূলের কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। জলপাইগুড়িতে তৃণমূলের প্রদীপ কুমার বর্মা এক হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তৃণমূল-বিজেপি দুই দলেরই ভোট প্রায় ৪২ শতাংশ। রাজগঞ্জে খগেশ্বর রায় এক লক্ষের বেশি ভোট পেলেও বিজেপি প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট পায় ওই আসনে। আর চা বলয়ের আরও একটি কেন্দ্র মালে বিজেপির ঘরে যায় প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট।
নজরকাড়া প্রার্থী
হারানো ধূপগুড়ি ২০২৩-এ তৃণমূলকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নির্মলচন্দ্র রায়। কিন্তু লোকসভা ভোটে ওই বিধানসভা আসনে ছ'হাজারের বেশি লিড পায় বিজেপি প্রার্থী। অথচ অভিষেকের দেওয়া কথা রাখতে এই নির্মলচন্দ্রই নতুন মহকুমা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। বিজেপির নরেন্দ্র চন্দ্র রায় তাঁর প্রতিপক্ষ। এদিকে, 'বিদ্রোহী' খগেশ্বর সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্নার পাশে থাকবেন কি না, তা খুব বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজগঞ্জে স্বপ্নার নাম ঘোষণা হতেই যেভাবে চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছিলেন, যেভাবে বলেছিলেন 'টাকার কাছে হেরে গেলাম', তা তৃণমূলের জন্য খুব সুখকর ছিল না। তড়িঘড়ি ফোন করতে হয়েছিল তৃণমূল সুপ্রিমোকে। কোনওরকমে সামলানো যায় পরিস্থিতি। স্বপ্নার প্রতিপক্ষ বিজেপির হারাধন সরকার। স্বপ্না রাজনীতিতে নব্য হলেও হারাধন পুরনো রেসের ঘোড়া। স্বাভাবিকভাবেই উন্নয়ন বনাম পরিবর্তনের জোর লড়াই। জেতার ব্যাপারে দুজনেই আশাবাদী।
নজর থাকবে স্বপ্না বর্মনের দিকে।
তবে চা বাগানের দিন-আনা দিন খাওয়া পরিবার থেকে উঠে আসা বুলু চিকবরাইকের উপর এবারও ওই কেন্দ্রেই ভরসা রেখেছেন মমতা। ঘাসফুলের হাতে যদি থাকে চা-শ্রমিক প্রার্থী, তাহলে বিজেপির হাতেও আছে রাজবংশী প্রার্থী। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার নজির থাকলেও ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় অন্যদের থেকে এগিয়ে অনন্তদেব অধিকারী। তৃণমূলের কৃষ্ণ দাসকে চ্যালেঞ্জ করবেন তিনি। ময়নাগুড়িতে প্রার্থী নিয়ে বিজেপি শিবিরে কোন্দল অব্যাহত। ফলে খোলা ময়দানে প্রচার সারছেন তৃণমূল প্রার্থী রামমোহন রায়।
আলাদা করে নজর থাকবে হেভিওয়েট প্রার্থী তথা মেয়র গৌতম দেবের কেন্দ্রে। ডাবগ্রাম ফুলবাড়ি আসনে ২০১১ সালে ১১হাজার, ২০১৬ সালে ২৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন গৌতম। ২০১৯ সালে এই কেন্দ্রের রাজনীতির সমস্ত অঙ্ক গুলিয়ে দেয় বিজেপি। লোকসভায় তৃণমূলের সঙ্গে ৮৬ হাজার ১০৭ ভোটের ব্যবধান তৈরি হয় বিজেপির। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সেই গৌতম দেবকে হারিয়ে দেন বিজেপির শিখা চট্টোপাধ্যায়। উত্তরে তৃণমূলের অন্যতম ভরসার মুখ গৌতম আসন ফিরিয়ে দিতে পারবেন কি না, সেটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন।
ফ্যাক্টর-
সকালে উঠে যে চায়ের কাপ হাতে না নিলে বাঙালির আলসেমি কাটে না, সেই চা শ্রমিকদের দুর্ভোগ যেন কাটেই না। তাদের রুটি-রুজি জোগানোর কথা বলেই ময়দানে নামে সব পক্ষ। জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) চা বলয়ে এভাবেই প্রতিটি ভোট আসে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোটের আগেই মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। প্রচারের শুরুর দিকেই বাগানে ঘুরে এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, বিজেপি, যারা ওই অঞ্চলে ভোট-অঙ্কে এগিয়ে, তারা গত পাঁচ বছরে কী করল, তার হিসেব নিশ্চয় কষবে শ্রমিকদের পরিবার। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কেন ডুয়ার্সের চা বাগান ও গ্রামাঞ্চল থেকে কাতারে কাতারে যুবক যুবতীরা ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে চলে যান? কেন বাজেটে শ্রমিকদের কথা বলে না কেউ?
যে কোজাগরীর বিপর্যয়ের কথা শুরুতেই বলা হয়েছে, তা কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে আটকানোর কথা নয়। কিন্তু 'আফটারম্যাথ'ই আসল কথা। ২০২৫-এর ভয়াবহ বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছিল জলপাইগুড়ি। চা বাগান থেকে একরের পর একর কৃষিজমি, ক্ষতি হয়েছিল বিপুল। ঘর-বাড়ি ভেসে গিয়েছিল তিস্তার দুই পারের মানুষজনের। মুখ্যমন্ত্রী ছুটে গিয়েছিলেন, ছুটে গিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বও। পরিদর্শনে গিয়ে কীভাবে বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু আর বিধায়ক শংকর ঘোষকে আক্রান্ত হতে হয়েছিল, তা অনেকেরই মনে থাকবে। দুদিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় পরিবারপিছু। কিন্তু তিস্তার দু-পারে যারা ঘর হারালেন, তাঁদের মাথায় ছাদ দেবে কে? তিস্তা বা করলার নাব্যতা যেভাবে কমছে, তাতে আর কতদিন ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর ভোটবাক্সে খুঁজতে পারেন সাধারণ মানুষ।
কোচবিহারের পাশেই জলপাইগুড়ি, তাই এই জেলায় রাজবংশী ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর। মূল ইস্যুগুলোর বাইরে এই ভোটব্যাঙ্কে নজর থাকে সব পক্ষেরই। কিন্তু নজিরবিহীনভাবে এবার মুখ্যমন্ত্রীর চার্চে যাওয়া, অনেককেই খ্রিস্টান ভোটারদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বিগত ১৫ বছরে প্রথমবার টিয়াবন সংলগ্ন একটি চার্চে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। পাদ্রী ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মমতার কথোপকথন খুব সাধারণ বিষয় বলে মনে করছে না রাজনৈতিক মহল। সংখ্যালঘু হিসেবে খ্রিস্টান জনসংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে খুব বেশি না হলেও জানা যায়, বাংলার মোট খ্রিস্টান জনসংখ্যার অনেকটাই রয়েছে জলপাইগুড়িতে। এছাড়াও এসআইআর এই জেলায় বড় ফ্যাক্টর। বহু রাজবংশী-সহ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এমনকী গত বন্যায় বহু মানুষের নথিও হারিয়ে গিয়েছে। ফলে অনেকেই তা জমা দিতে পারেনি। ফলে এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষের একটা বড় ক্ষোভ রয়েছে। যা ভোটের বাক্সে প্রতিফলন ঘটতে পারে বলে একটা শঙ্কা রয়েছে।
এত সমস্যার মধ্যেও না উল্লেখ করলেই নয় কলকাতা হাই কোর্টের সার্কিট বেঞ্চের কথা। দীর্ঘদিনের দাবি মেনে রাজ্যের দেওয়া জমিতে তৈরি হয়েছে 'দ্বিতীয় হাইকোর্ট'। গত বছরই সেই নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই জেলার মানুষকে আর ছুটতে হয় না কোথাও।
তবে অতীতের অঙ্ক যাই বলুক, পাঁচ বছরের ভবিষ্যৎ হিসেব করেই ভোট দেবে রেডব্যাঙ্ক, ভোট দেবে রায়বাড়ি। তিস্তা পারের ভোট-উৎসবে আবার পদ্মের জয় নাকি পাঁচ বছরে সব ছিদ্র মেরামত করে ফেলেছে ঘাসফুল শিবির, তা সময়ই বলবে। যদিও এবার জেলার প্রত্যেক বিধানসভা আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জলপাইগুড়ি সদরের তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাস। তাঁর কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নই এবার মূল হাতিয়ার এই জেলায়। অন্যদিকে বিজেপির রাজগঞ্জ বিধানসভা আসনের প্রার্থী হারাধন সরকার বলেন, মানুষ এবার পরিবর্তন চাইছে। পরিত্রাণ চাইছে এই সরকারের হাত থেকে। আর সেই ফলাফল এই জেলাতেও দেখা যাবে।
