গোটা রাজ্যের বামপন্থীদের জন্য 'ক্যাপ্টেন।' তাঁকে সামনে রেখেই 'নিষ্ফলা' বঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে লালপার্টি। তিনি আবারও ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) ময়দানে। আগেরবার নন্দীগ্রামের মতো হেভিওয়েট কেন্দ্রে রাজ্যের দুই মহারথী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাঝে একপ্রকার পিষে যান তিনি। জুটেছিল মাত্র হাজার ছয়েক ভোট। এবারও শূন্যের গেরো কাটানোর আশায় যে জনা কয়েক প্রার্থীর উপর বাজি ধরছে সিপিএম, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (Minakshi Mukherjee)। এবার 'ক্যাপ্টেনে'র রণক্ষেত্র উত্তরপাড়া।
বস্তুত মীনাক্ষীকে নিয়ে সিপিএমের অন্দরে প্রবল টানাপোড়েন রয়েছে। কেউ কেউ তাঁর বাগ্মিতা, সাংগঠনিক দক্ষতার গুণমুগ্ধ। আবার কেউ কেউ বলেন, যেভাবে পার্টিলাইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে মীনাক্ষীকে ঘিরে 'ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা' তৈরি হচ্ছে, সেটা সিপিএমের মতো রেজিমেন্টেড পার্টিতে প্রত্যাশিত নয়। মীনাক্ষীকে সামনে রেখে যে বামেরা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটা ঠিক ভরসা করে উঠতে পারেন না সিপিএমের অন্দরের ওই নিন্দুক গোষ্ঠী। এবার উত্তরপাড়ায় তাই মীনাক্ষীর লড়াই সেইসব নিন্দুকদের ভুল প্রমাণ করারও। মীনাক্ষী জানেন, এবারের নির্বাচনে সাফল্য না পেলে দলের অন্দরে তাঁকে নিয়ে আরও প্রশ্ন ওঠা শুরু করবে। তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার আরও বেশি করে ধাক্কা খাবে। তাই লড়াইটা প্রাণপণ করছেন তিনি।
বনেদি শহর কোন্নগর এবং সংলগ্ন এলাকা একটা সময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছর টানা এই কেন্দ্রে বিধায়ক ছিলেন বামেদের। ২০০১ সালে একবার এখানে ঘাসফুল ফোটে।
কিন্তু এই লড়াইটা মোটেই সহজ নয়। একে তৃণমূল ও বিজেপির দ্বিমেরু রাজনীতিতে রাজ্যে বামেরা কোণঠাসা। ন্যারেটিভের অভাবে দল ধুঁকছে, তার উপর আবার সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া। এসবের মধ্যে আবার প্রতিপক্ষ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দক্ষ রাজনীতিক। শাসক শিবিরের প্রার্থী যতই ছেলে শীর্ষণ্য হোন না কেন, আসল লড়াইটা লড়ছেন কল্যাণ নিজেই। যার কর্মভূমি গোটা হুগলি জেলা। প্রার্থী হিসাবে আরও একজন ভালোরকম লড়াইয়ে রয়েছেন। তিনি বিজেপির দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। নিজেকে পরিচয় দেন প্রাক্তন এনএসজি এবং প্রাক্তন 'র' কর্তা হিসাবে। যদিও বিরোধীরা সেই দাবি নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে তাঁর ভাবমূর্তি খানিক ধাক্কা খেয়েছে। কংগ্রেসের প্রার্থী সুব্রত মুখোপাধ্যায় অবশ্য নিতান্তই প্রান্তিক খেলোয়াড়। মূল লড়াইটা প্রথম তিন জনের।
হুগলি নদীর তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ উত্তরপাড়ার অর্থনীতি মূলত শহরকেন্দ্রিক। বাসিন্দাদের বেশিরভাগই ছোটখাট চাকরি করেন। কিন্তু এলাকার কলকারখানাগুলির বেশিরভাগ বন্ধ। বিশেষ করে হিন্দমোটর বন্ধে হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সমস্যা রয়েছে। এলাকার বহু ছেলেমেয়েই এখন চাকরির খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। তাছাড়া স্থানীয় ইস্যুর মধ্যে পানীয় জলের সঙ্কট, বেআইনি নির্মাণ, যানজটের মতো ইস্যু রয়েছে। বিশেষ করে নিকাশি ও জঞ্জাল সাফাই অনিয়মিত। কোন্নগর শহরের আশেপাশে স্থায়ী কোনও ভাগাড় না থাকাটাও গুরুতর সমস্যার। যদিও তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, "অন্ধকারে ডুবে থাকা উত্তরপাড়া তৃণমূলের আমলে আলোর মুখ দেখেছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়ে আজ ইউনিয়নবাজি ও গুন্ডারাজ খতম।" উলটো কথা বলছে বিরোধী শিবির। বিজেপির এক নেতা বলছিলেন, "উন্নয়ন যা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কাটমানি যাচ্ছে মানুষের পকেট কেটে। শিল্প নেই।চাকরি নেই।" সিপিএম প্রার্থীর দাবি, "উত্তরপাড়া বনেদি এলাকা। সেখানে সিন্ডিকেট রাজ চালু করেছে তৃণমূল। মা-বোনের নিরাপত্তা নেই।"
যে তিনটি মূল দল লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেকের প্রার্থী বহিরাগত। গত কয়েকটি নির্বাচনে এটাই যেন উত্তরপাড়ার ভবিতব্য। দীর্ঘদিন ধরেই এই কেন্দ্রে বাজিমাত করে আসছেন বহিরাগতরাই।
এমনিতে বনেদি শহর কোন্নগর এবং সংলগ্ন এলাকা একটা সময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছর টানা এই কেন্দ্রে বিধায়ক ছিলেন বামেদের। ২০০১ সালে একবার এখানে ঘাসফুল ফোটে। দু'বছর বাদেই ওই কেন্দ্র চলে যায় বাম দখলে। তবে রাজ্যে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোন্নগরের হাওয়াও বদলায়। ২০১১ থেকে এই কেন্দ্রে বিধায়ক রয়েছে তৃণমূলের। এখনও শাসকদলের সংগঠন ওখানে চূড়ান্ত শক্তিশালী। উত্তরপাড়া, কোন্নগর দুই পুরসভাই তৃণমূলের দখলে। কানাইপুর, নবগ্রাম পঞ্চায়েতও তৃণমূলেরই দখলে। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে ৩৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূলের কাঞ্চন মল্লিক। কিন্তু তারপর সেভাবে তাঁকে এলাকায় দেখা যায়নি বলে অভিযোগ ওঠে। একুশে তৃতীয় হলেও সেবার বামেরা পেয়েছিল ৪২ হাজারের বেশি ভোট। বিজেপি পায় প্রায় ৫৮ হাজার ভোট। ২০২৪ সালে খানিকটা ভোট কমে শাসকদলের। সিপিএম কিছুটা ভোট বাড়ায়।
বস্তুত উত্তরপাড়ায় সিপিএমের জনভিত্তি আছে। সেই জনভিত্তিকে হাতিয়ার করেই ওই কেন্দ্রে মীনাক্ষীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেন মহম্মদ সেলিমরা। আশা ছিল, দলের পুরনো ভোটভিত্তির সঙ্গে মীনাক্ষীর ভাবমূর্তি ভোটবাজারে তাঁকে খানিকটা লড়াইয়ে রাখবে। প্রচারেও বেশ সাড়া ফেলেছেন সিপিএমের 'ক্যাপ্টেন'। নিজে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, ঘরের মেয়ের মতো সবার সমস্যা শুনছেন, নিজে জিতে এলে উত্তরপাড়ায় কী করবেন, নিজের হাতে সেই লিফলেটও বিলি করেছেন। সিপিএমের দাবি, প্রচারে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এলাকার পুরনো বামপন্থীরাও প্রাণপাত করছেন মীনাক্ষীর জন্য। প্রচারে সরাসরি শীর্ষণ্যর বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র ইস্যুতে তোপ দেগে বামদের একাংশ স্লোগান তুলছেন, 'যে ছেলে বাবার হাত ছাড়া চলতে পারে না। সে উত্তরপাড়ার উন্নয়ন কী করবে?" তবে হিন্দমোটর বন্ধ হওয়াটা মীনাক্ষীর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। বাম আমলে ক্ষয়রোগীর মতো ধুঁকে ধঁকে ২০১৪ সালে অবশেষে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে কারখানাটি। যার জের এখনও বইতে হচ্ছে উত্তরপাড়াকে।
বিজেপির প্রার্থী দীপাঞ্জন এলাকায় সেভাবে পরিচিত নন। তবে গত কয়েক বছরে এলাকায় সংগঠন বেড়েছে গেরুয়া শিবিরের। তাছাড়া প্রাক্তন এনএসজি হিসাবে বাড়তি মাইলেজও পাচ্ছিলেন একটা সময়। কিন্তু তাঁর প্রাক্তন সেনাকর্তা বা প্রাক্তন এনএসজি হওয়ার দাবি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় ভাবমূর্তি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। যদিও দীপাঞ্জন ঘনিষ্ঠ মহলে বলছেন, "তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে।" তবে বিরোধী দুই শিবিরের চেয়েই লড়াইটা এগিয়ে শুরু করছেন তৃণমূলের শীর্ষণ্য। কারণ একাধিক। একে তো ওই এলাকায় দলের সংগঠন খুব শক্তিশালী, তার উপর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজস্ব ভাবমূর্তি বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে তাঁর ছেলেকে। দলের বাইরে কল্যাণের নিজস্ব কিছু অনুগামীও রয়েছেন ওই এলাকায়। তিনিও কাজ করছেন জোরকদমে। বলে রাখা ভালো, উত্তরপাড়ায় অ-বাংলাভাষী মানুষ প্রায় পঁচিশ শতাংশ। এলাকার পরিচিত মুখ আচ্ছেলাল যাদবের ভোটের (West Bengal Assembly Election 2026) আগে টিকিট না পেয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়াটা কিছুটা ধাক্কা হতে পারে তৃণমূলের জন্য। যদিও শাসক ঘনিষ্ঠদের দাবি, আচ্ছেলালের আর এলাকায় তেমন প্রভাব নেই। বরং তিনি বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় লাভই হয়েছে তৃণমূলের।
উত্তরপাড়াবাসী অবশ্য এখন সবপক্ষের কথাই শুনছেন। তবে তাঁদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, যে তিনটি মূল দল লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেকের প্রার্থী বহিরাগত। গত কয়েকটি নির্বাচনে এটাই যেন উত্তরপাড়ার ভবিতব্য। দীর্ঘদিন ধরেই এই কেন্দ্রে বাজিমাত করে আসছেন বহিরাগতরাই। এবারও সম্ভবত বহিরাগত বিধায়কই পাবে উত্তরপাড়া। যদিও শীর্ষণ্য ঘনিষ্ঠদের দাবি, বাবার লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে আসন। উত্তরপাড়া তাঁর পর নয়।
