একদিকে সমতল। আর একদিকে ছোটনাগপুর মালভূমির মাঝে যেন সেতুর মতো রয়েছে একটা আস্ত জেলা। লালমাটির সেই জেলাজুড়ে একসময় শুধুই উড়ত লাল পতাকা। রাজ্যের প্রায় সর্বত্র যখন একটু একটু করে ঘাসফুল ফুটতে শুরু করেছে, তখনও টেরাকোটার গা থেকে লাল আবিরের দাগ মোছেনি। বাসুদেব আচায্য, উপেন কিস্কু, অমিয় পাত্ররা স্তম্ভের মতো গড় ধরে রেখেছিলেন। সেই বাঁকুড়ায় তৃণমূল জমি দখল করতে না করতেই কখন যে শুরু হয়ে যায় পদ্মের গোপন খেলা, তা বোধহয় কেউই বুঝে উঠতে পারেননি। এই জেলায় তাই সবাই সজাগ। কোনও পক্ষ একটু ফাঁকি দিলেই, অপরপক্ষ যে কোন ফাঁকতালে ঢুকে পড়বে, তা বোঝাই কঠিন। আর এই পরিস্থিতিতে বাঁকুড়ার একাধিক বিধানসভা আসনে ভোট হবে আগামী ২৩ এপ্রিল। কোন ফুলে আস্থা রাখবেন এই জেলার মানুষ?
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বলাবাহুল্য একদা বামেদের অজেয় দূর্গ ছিল এই বাঁকুড়া। আর আজ সেই জেলাই বহুস্তর রাজনৈতিক সমীকরণের পরীক্ষাগার। লালমাটির বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১২টি বিধানসভা আসন যেন এক অদৃশ্য দাবার বোর্ড! ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১২টির মধ্যে মাত্র চারটি আসনে জয় পেয়েছিল ঘাসফুল শিবির। বাকি ৮টি আসনই দখল করেছিল পদ্মফুল। রানিবাঁধ, রায়পুর, তালডাংরা আর বড়জোড়া আসন বাদে সবটাই ছিল বিজেপির হাতে। সেই ফলাফল বহু দশকের বাম প্রভাবের যবনিকা ফেলে যেন এক নতুন রাজনৈতিক যুগ দেখিয়েছিল বাঁকুড়াকে। একসময়ের বাম দূর্গে আজ বামেরা কার্যত প্রান্তিক শক্তি। বিশেষত তৃণমূলের তারকা প্রার্থী মুনমুন সেনের কাছে বাসুদেব আচারিয়া হেরে যাওয়ার পর লালের শেষ ছিটেটুকুও মুছে যেতে শুরু করে। যদিও প্রতিটি আসনে প্রার্থী দিয়ে সংগঠন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে বামেরা।
বাসুদেব আচারিয়া
দুই ফুলে আড়াআড়ি ভাগ জেলা
লোকসভার রাজনীতিতেও বাঁকুড়া বারবার দেখেছে রং বদলের খেলা! ২০১৯ সালে জেলার দুটি লোকসভা আসনই হাতছাড়া হয়েছিল ঘাসফুল শিবিরের। একটি আসনে জয়ী হন চিকিৎসক সুভাষ সরকার, অন্য আসনে কংগ্রেস-তৃণমূল ঘুরে আসা সৌমিত্র খাঁ। কিন্তু ২০২৪-এ সেই খেলা ঘুরে যায়! বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুভাষ সরকারকে সরিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন ঘাসফুলের পুরনো নেতা অরূপ চক্রবর্তী। দলের পুরনো বিধায়কের হাত ধরে পদ্ম শিবিরে হানা দেয় তৃণমূল। কান পাতলে শোনা যায়, সুভাষ সরকারকে নিয়ে দলীয় কর্মীদের একাংশের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে, প্রান্তিক ভোটাররা হয়তো 'ডাক্তার' সাংসদের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তা পূরণ হয়নি বলেই দাবি। তবে বারবার দল বদল করা সৌমিত্র খাঁর প্রভাব অস্বীকার করতে পারেন না জেলার রাজনীতিকরা। বিচ্ছেদ-পুনর্বিবাহ বিতর্কে থেকেও গড় ধরে রেখেছেন তিনি। তবে তৃণমূলের এই জয় শুধু একটি আসনের সাফল্য নয়, বরং তৃণমূলের জেলা সংগঠনের মনোবল বাড়ানোর বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বর্তমানে জেলার দুই লোকসভা আসনের একটি পদ্মফুল এবং অপরটি ঘাসফুলের দখলে থাকায় বিধানসভা ভোটের আগে দুই পক্ষই সমান সতর্ক।
দুই ফুলের কাটাকুটির মাঝে চলছে অন্য অঙ্ক
সারা রাজ্যের নজর যখন দুই ফুলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, তখন বাঁকুড়ার পাহাড়-জঙ্গলে চলছে এক অন্য অঙ্ক কষা। যেভাবে লালমাটিতে কেশরী ছড়িয়ে পড়েছে, তার কৃতিত্ব যে শুধু একা বিজেপির নয়, তা বাঁকুড়ার পাথুরে মাটিও জানে। গত কয়েক বছরে গ্রামীণ এলাকায় সঙ্ঘের প্রভাব বেড়ে চলায় রাজনৈতিক সমীকরণে তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ছাতনা, শালতোড়া, তালডাংরা ও রাইপুর অঞ্চলে সঙ্ঘের বিস্তার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা কম নয়। সাংগঠনিক শক্তির এই নীরব বিস্তার যে পদ্ম শিবিরকে তৃণমূল স্তরে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা। উত্তরের জেলায় গেরুয়া শিবির শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে অনেকদিন ধরেই। কিন্তু রাঢ়বঙ্গে সঙ্ঘের সাহায্য ছাড়া বিজেপি আদৌ কিছু করতে পারত কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।
নজরকাড়া প্রার্থী
দলবদল করে প্রার্থী হওয়ায় অনেকের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৃণমূলের কর্মীরা। বাঁকুড়াতেও রয়েছে তেমন নজির। ২১-এ বিজেপির টিকিটে জয়ী হওয়া হরকালী প্রতিহারের নাম এবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় জ্বলজ্বল করছে। মজার কথা শুধু দলবদল নয়, গত বিধানসভা নির্বাচনে কোতুলপুরের যে বাড়িকে নির্বাচনী কার্যালয় করে তৃণমূল প্রার্থী সঙ্গীতা মালিক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, এবার সেই বাড়িরই রং বদলে নির্বাচনী কার্যালয় করেছেন কোতুলপুরের বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার।
এদিকে, পদ্মের সাংগঠনিক জোরের মুখে তৃণমূলের হাতিয়ার সমাজের প্রতিষ্ঠিত নাম। তালিকায় তাকালেই দেখা যাবে, পোড় খাওয়া নেতাদের মাঝে নজর কাড়ছেন দুই চিকিৎসক ও এক অধ্যাপিকা। বাঁকুড়ার প্রার্থী মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অপথ্যালমোলজির শিক্ষক-চিকিৎসক অনুপ মণ্ডল। অন্যদিকে সোনামুখীতে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে প্রচার সারছেন চিকিৎসক কল্লোল সাহা। রানিবাঁধের জ্যোৎস্না মাণ্ডির জায়গায় যিনি টিকিট পেয়েছেন সেই তনুশ্রী হাঁসদা, পেশায় অধ্যাপিকা। তাঁর জন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রচার করেছেন জ্যোৎস্না।
তৃণমূলে যোগ দিয়েই টিকিট পান তনুশ্রী হাঁসদা।
এই জেলায় গত বিধানসভা নির্বাচনে তারকা প্রার্থী হিসেবে লড়েও জায়গা পাননি সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বাঁকুড়ায় তৃণমূল ডাক্তার প্রার্থী দিলেও বিজেপির ভরসা পুরনো বিধায়ক নীলাদ্রিশেখর দানার উপরেই। গত নির্বাচনে জয়ী হওয়া নীলাদ্রির বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরেই দুর্নীতি ও বেনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এমনকী কল্যাণী এইমসে দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সিআইডি তদন্তও হয়েছে। তবে, জাতপাত বড় বালাই। তাই, বাঁকুড়ার জয়পুর আসনটি আদিবাসী কুড়মি সমাজকে ছেড়ে দিয়েছে বিজেপি। সেখানে বিজেপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিশ্বজিৎ মাহাতো, যিনি কুড়মি নেতা অজিত মাহাতোর ছেলে। সোনামুখী কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দিবাকর ঘরামি।
কোন ফ্যাক্টরে নির্বাচন
বাউরি ভোটব্যাঙ্ক: জাতিগত বৈচিত্র্যে হয়তো সব জেলাকেই পিছনে ফেলে দেবে বাঁকুড়া। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই জেলার বেশিরভাগ আসনই তফসিলি জাতি বা উপজাতির জন্য সংরক্ষিত। তবে ভোটের অঙ্কে বাঁকুড়ার সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে বাউরি সমাজ। আনুমানিক দেড় লক্ষের বেশি বাউরি ভোটার ছড়িয়ে রয়েছে বড়জোড়া, তালডাংরা, রাইপুর, ইন্দাস, সোনামুখী ও কোতুলপুর কেন্দ্রে। ভোট-অঙ্কে এই ভোটব্যাঙ্ক ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।
এই বাউরি সমাজের মানুষ মূলত শ্রমজীবী। এই সমাজ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থায়ী কর্মসংস্থানে পিছিয়ে। ফলে পৃথক উন্নয়ন পর্ষদের দাবি এখন রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সভামঞ্চে নেতৃত্বের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে সে কথা। ভোটের সময় কেউ কেউ কথা শোনে, ভোট পেরলেই কোথায় যেন সে সব মিলিয়ে যায়! এর আগে কুড়মি আন্দোলনের মতো বৃহত্তর আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে বাংলার মানুষ। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আর সেই ক্ষোভ যদি ভোটে প্রতিফলিত হয়, তাহলে অন্তত ছয় থেকে সাতটি আসনে পাশা উলটে যেতে পারে। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, বাউড়িদের পাশাপাশি এই জেলায় কুড়মিদের উপস্থিতির হারও নেহাত কম নয়। আদিবাসী কুড়মি সমাজের সংগঠনও রয়েছে এই জেলায়।
শিল্পাঞ্চলে অনিশ্চয়তা: শিল্পাঞ্চল ও খনি অঞ্চল বাঁকুড়ার ভোট রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বড়জোড়া শিল্পাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। স্পঞ্জ আয়রন, রোলিং মিল ও ক্ষুদ্র শিল্পে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে। অন্যদিকে মেজিয়া-শালতোড়া অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে কয়লা ও পাথর খনি এলাকা হিসেবে পরিচিত। চাকরি আছে, রোজগার আছে, কিন্তু সমস্যাও আছে। শিল্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দূষণ। কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। যদিও এই পরিস্থিতিতে গত কয়েকমাস আগেই ভোটপ্রচারে গিয়ে খনি শ্রমিকদের পাশে থাকার বার্তা দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী বন্ধ থাকা খনিগুলি চালুর বার্তা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই শিল্পাঞ্চলগুলিতে বাউরি, মাহাতো ও শ্রমিক শ্রেণির মিশ্র ভোট প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এই অঞ্চলের ভোট শাসক এবং বিরোধী, দুই দলের কাছে বড় ফ্যাক্টর হতে চলেছে।
জল ও পরিবেশ: কংসাবতী ও দামোদর নদীর উপর দুর্গাপুর ব্যারেজ ও মুকুটমণিপুর জলাধার থাকলেও ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। জেলার একাধিক গ্রামে গরম পড়লেই পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়। যা নিয়ে এই জেলার মানুষের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। অন্যদিকে রয়েছে হাতির ভয়। খাতড়া, রানিবাঁধ ও রাইপুর অঞ্চলে বুনো হাতির উপদ্রব এখন নিয়মিত সমস্যা। গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, ফসল নষ্ট ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য এখন সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। এই দুই ইস্যু মিলিয়ে গ্রামীণ ভোটে ক্ষোভ জমে থাকলে তা ভোটের ফলাফলেও প্রতিফলিত হতে পারে বলে মত রাজনৈতিকমহলের।
বিজেপির ভরসা পুরনো বিধায়ক নীলাদ্রিশেখর দানার উপরেই।
অন্যদিকে যে বাঁকুড়ায় একটা সময় মাও আতঙ্ক কাজ করত, সেখানে আজ তৈরি হয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাও। যা বাঁকুড়ার অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মুকুটমণিপুর, বিষ্ণুপুর, শুশুনিয়া ও বিহারীনাথ পাহাড় ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটন সার্কিট। পর্যটনকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসা, হোটেল ও পরিবহন পরিষেবায় কর্মসংস্থান বেড়েছে। আর এজন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে স্বীকার করে নিচ্ছেন সেখান মানুষজন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের এও দাবি, উন্নয়নের সুফল যেন শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছায়।
সমীকরণ
আসনভিত্তিক জাতিগত সমীকরণ দেখলে বোঝা যায়, এই জেলার ১২টি আসনের অঙ্ক আলাদা। শালতোড়া ও কোতুলপুরে বাউরি ও অন্যান্য তফসিলি ভোট মিলিয়ে ৫০ শতাংশের বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। ছাতনা ও ওন্দায় মাহাতো-কুর্মি ভোট রয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। তারাই এখানে নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। রানিবাঁধ ও রাইপুরে আদিবাসী ভোট ৫০ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ায় উন্নয়ন ও বনাঞ্চল সংক্রান্ত ইস্যুই বড় ফ্যাক্টর। বড়জোড়া ও তালডাংরায় শিল্পাঞ্চল ও শ্রমিক ভোটের প্রভাব প্রবল। অন্যদিকে বিষ্ণুপুর ও বাঁকুড়া শহর আসনে শহুরে ভোট ও উন্নয়নমূলক ইস্যুই বড় ভূমিকা নিতে পারে। ইন্দাস ও সোনামুখীতে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সেচব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে আসছে।
তবে, সব সমীকরণের মধ্যে প্রার্থী নির্বাচনের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শাসকশিবির একদিকে সংগঠনে পারফরম্যান্স দেখানো কর্মীদের গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মুখকেও প্রাধান্য দিয়েছে। পদ্মফুল শিবিরও একই কৌশল নিয়েছে। সাংগঠনিক শক্তি আর সামাজিক প্রভাবের মধ্যে সমতা রাখার চেষ্টা করেছে। দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রার্থী তালিকা সাজানোর চেষ্টা চলছে। বাম ও কংগ্রেসও প্রতিটি আসনে প্রার্থী দিয়ে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছে। যদিও তাদের প্রভাব এখন সীমিত। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বাঁকুড়ায় যে লড়াই হতে চলেছে, তা নিছক দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার এক জটিল সমীকরণ।
২০২৬: কার পাল্লা ভারী?
২০২৬ সালের ভোটে বাঁকুড়ার লড়াই যে কঠিন, সে কথা সাফ বলে দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাউরি সমাজের দাবি, দাবি আংশিক পূরণের বার্তা যদি দিতে পারে তৃণমূল, তাহলে শাসকদলের পাশে থাকতে পারেন তারা। বিশেষ করে বড়জোড়া, তালডাংরা, কোতুলপুর, সোনামুখী ও ইন্দাসে বাউড়ি ভোটই এনে দিতে পারে অনায়াস জয়। অন্যদিকে, পদ্মফুল শিবির যদি সঙ্ঘভিত্তিক সংগঠন শক্তি এবং গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে পারে, তবে শালতোড়া, ছাতনা, রানিবাঁধ ও রাইপুরের মতো আসনগুলি তাদের কাছে খুব সহজ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ২০২৬-এ বাঁকুড়ায় “হাং ব্যাটেল”-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ, একতরফা ফলের বদলে আসনভিত্তিক ছোট ছোট ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে। তবে এই জেলায় লড়াই যে দ্বিমুখী, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। ১২ আসনে ১২ সমীকরণ। আর সেই সমীকরণের শেষ উত্তর লুকিয়ে আছে ভোটবাক্সের ভিতরেই।
তবে উন্নয়নের পক্ষেই মানুষ এবার রায় দেবে বলে দাবি তৃণমূলের। তৃণমূলের বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন পুরপ্রধান অলকা সেন মজুমদার বলেন, “গত এক দশকে বাঁকুড়ায় পানীয় জল, রাস্তা, স্বাস্থ্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। মানুষ সেই উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন। ২০২৬ সালের ভোটে মানুষ উন্নয়নের পক্ষেই রায় দেবেন এবং আগের চেয়ে বেশি আসনে তৃণমূল জয়ী হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
অন্যদিকে বিজেপির বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলার সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “এবার বাঁকুড়ার মানুষ পরিবর্তন চান। গ্রামীণ এলাকায় আমাদের সংগঠন অনেক শক্ত হয়েছে। কর্মসংস্থান, শিল্প ও কৃষকদের সমস্যাকে সামনে রেখেই আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি। ২০২৬ সালে বাঁকুড়ায় বিজেপি আগের সাফল্য ধরে রাখবে।”
