গাজা যুদ্ধে নারকীয়তার সীমা ছাড়িয়েছিল ইজরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাজায় মানুষ মারতে ব্যবহার করা হয়েছিল ভয়ংকর 'ভ্যাকিউম বোমা' বা 'থার্মোবেরিক বোম'। ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ তৈরি করা মারণ এই বোমায় নিমেষে বাষ্প হয়ে যান ২৮৪২ জন মানুষ। গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেওয়া ভয়াবহ এই রিপোর্ট সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্জিয়ান'।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজায় ইজরায়েলের হামলার পর কমপক্ষে ২৮৪২ জনের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। গাজার সিভিল ডিফেন্স টিমের দাবি অনুযায়ী, এত সংখ্যক মানুষ কোনও মারণ বোমা হামলায় বাষ্পীভূত হয়ে যান। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই মারণ বোমা ইজরায়েলকে সরবরাহ করেছিল আমেরিকা। 'ভ্যাকিউম বোমা'র মারণ ক্ষমতা এতটাই যে হামলার সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি হয়। ফলে মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া বা শনাক্ত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
থার্মোবেরিক বোমা আসলে কী?
ভয়ংকর থার্মোবেরিক বোমা 'ভ্যাকিউম বোমা' বা 'অ্যারোসল বোমা' নামেও পরিচিত। সাধারণ বোমার তুলনায় এই বোমা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কেবল বিস্ফরিত হয় না বরং বাতাসের অক্সিজেন শোষণ করে এক বিরাট আগুনের গোলা তৈরি করে। বিস্ফোরণের পর চারপাশের অক্সিজেন শোষণ করে এটি এক বিরাট শূন্যস্থান তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের দাবি অনুযায়ী, বিস্ফোরণের পর এর তাপমাত্রা ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। সাধারণত লোহা গলাতে প্রয়োজন হয় ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। ফলে অনুমান করা যায় এই বোমার থেকে উৎপন্ন হওয়া তাপ কতটা ভয়াবহ। এই তীব্র তাপ নিমেষের মধ্যে মানুষের হাড়-মাংস ছাই করে দিতে পারে। গাজার স্বাস্থ্যমন্ত্রকের প্রধান ডাঃ মুনির আল-বুরশে বলেন, মানুষের শরীরে ৮০ শতাংশ জল থাকে। ফলে ৩০০০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় এই জল নিমেশের মধ্যে ফুটে উঠে বাষ্পে পরিণত হয় এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়।
বিরাট এলাকা জুড়ে থাকা সমস্ত মানুষ নিমেষে বাষ্প হয়ে যান। এর থেকে রেহাই পায় না বাঙ্কারও। যারা সরাসরি বিস্ফোরণের আওতায় আসেননি ফুসফুস ফেটে মৃত্যু হয় তাঁদেরও।
কীভাবে কাজ করে এই বোমা?
জানা যাচ্ছে, ভ্যাকিউম বোমা মূলত কাজ করে দুটি পর্যায়ে। প্রথম ধাপে বোমায় জ্বালানি বিচ্ছুরণ ও ছোট একটি বিস্ফোরণ ঘটে। যার জেরে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং টাইটানিয়ামের মতো সূক্ষ্ম ধাতব কণা বাতাসে মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণে এই সমস্ত ধাতব জ্বালানির মেঘে আগুন ধরে ও বিরাট আগুনের গোলা তৈরি হয় এবং ওই অঞ্চলকে অক্সিজেন শূন্য করে দেয়। বিরাট এলাকা জুড়ে থাকা সমস্ত মানুষ নিমেষে বাষ্প হয়ে যান। এর থেকে রেহাই পায় না বাঙ্কারও। যারা সরাসরি বিস্ফোরণের আওতায় আসেননি ফুসফুস ফেটে মৃত্যু হয় তাঁদেরও।
সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার তরফে সরবরাহ করা এমন ৩টি বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল গাজায়। গাজা সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল ব্যাখ্যা করেন কীভাবে এক্ষেত্রে মৃতের সংখ্যা গণনা করেছিলেন তাঁরা। দাবি অনুযায়ী, "যদি কোনও পরিবার দাবি করেন তাঁর পরিবারে ৫ জন ছিলেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ জনের দেহ পাওয়া যায় তবে এই ঘটনায় তাঁদের নিখোঁজ বলে ঘোষণা করা হয়। তবে যদি দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে রক্তের ছিটা বা মাংসের ছোট টুকরো পাওয়া গিয়েছে তাহলে তাঁরা বাষ্পীভূত হয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হয়।" আল-তাবিন স্কুলে এই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে, সেখানকার বহু পরিবার শেষকৃত্যের জন্য একটিও মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। কারণ সবকিছু ছাই হয়ে যায়।
