আমেরিকার চাপে ইরানের চাবাহার বন্দর ছাড়ার কথা ভাবছে ভারত! সম্প্রতি একাধিক রিপোর্টে তেমনটাই দাবি করা হচ্ছে। যদিও নয়াদিল্লি এই দাবিতে সিলমোহর দেয়নি। তবে বিদেশমন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, চাবাহার বন্দরে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য় আমেরিকা যে ছাড় দিয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে এপ্রিল মাসে। এই মেয়াদ বৃদ্ধি করার জন্য ভারত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।
গত একমাসের উপর আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত চলছে। তেহরানের আকাশে ক্রমেই ঘনাচ্ছে যুদ্ধের মেঘ। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যে সমস্ত দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে আমেরিকা। এরপরই চাবাহার বন্দর নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে, মার্কিন চাপে কি চাবাহার ছেড়ে দেবে ভারত?
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যে সমস্ত দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে আমেরিকা। এরপরই চাবাহার বন্দর নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসে গোটা বিশ্বের উপর ক্ষমতা কায়েম করতে চাইছেন ট্রাম্প। ইরানের উপরও তিনি একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, গত বছর অক্টোবর মাসে চাবাহার নিয়েও ভারতকে 'রক্তচক্ষু' দেখান ট্রাম্প। 'শুল্ক-জুজু' দেখিয়ে কার্যত নির্দেশ দেন, ভারত যেন চাবাহার বন্দরে কোনও রকম কার্যক্রম না করে। ইরানের সঙ্গেও যেন ছিন্ন করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। কিন্তু ভারতের কাছে চাবাহার বন্দর কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘ আলোচনার পর ৬ মাসের ছাড় মেলে। সেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৬ এপ্রিল। এরপর কী হবে? সেটাই প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভারত যাতে চাবাহার বন্দর থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়, তার জন্যই ৬ মাস সময় দিয়েছিল আমেরিকা। এই পরিস্থিতিতে গোটা বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে বিদেশমন্ত্র। জানানো হয়েছে, মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভারত যাতে চাবাহার বন্দর থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়, তার জন্যই ৬ মাস সময় দিয়েছিল আমেরিকা।
এদিকে সম্প্রতি পেশ করা কেন্দ্রীয় বাজেটে এই প্রথমবার চাবাহার বন্দরে শূন্য বরাদ্দ করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। অতীতে চোখ রাখলে দেখা যাবে ইরানের মাটিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে আসছে কেন্দ্র। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল নয়াদিল্লি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেট প্রাথমিক ভাবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাড়িয়ে ৪০০ কোটি করা হয়। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে চাবাহার বন্দরের জন্য এক পয়সাও বরাদ্দ করল না কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার। বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকার কূটনৈতিক চাপ।
সম্প্রতি পেশ করা কেন্দ্রীয় বাজেটে এই প্রথমবার চাবাহার বন্দরে শূন্য বরাদ্দ করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।
চাবাহারকে কেন্দ্র করে ভারতের এহেন আচরণ নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধীরা। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সংসদে বিরোধীদের জবাব দিয়েছে কেন্দ্র। বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং এক লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, চাবাহার প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘ আলোচনার পর চাবাহারে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ৬ মাসের ছাড় মেলে। সেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
২০১৬-র মে মাস। তখনই ভারত-ইরান-আফগানিস্তান এই তিন দেশ চাবাহার নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত তথা জলসীমার খুব কাছে অবস্থিত চাবাহার বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত। বিনিময়ে মেলে চাবাহার বন্দর ব্যবহারের অধিকার। এরপরই চাবাহার প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে ইসলামাবাদ। অভিযোগ করে, পাকিস্তানের মাটিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করার লক্ষ্যেই ভারত এই বন্দর তৈরি করছে। চাবাহার নিয়ে উদ্বেগে চিনও।
চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) অঙ্গ হিসেবে আরব সাগরের তীরে পাকিস্তানের গুয়াদরে ইতিমধ্যেই একটি বন্দর তৈরি করেছে চিন। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের স্বার্থে পাকিস্তানের মাটিতে চিনা উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বন্দরের উপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে নির্ভর করতে হবে বলে চিন আশা করেছিল। কিন্তু গুয়াদর থেকে জলপথে ২০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত চাবাহারে ভারত যে পালটা বন্দর তৈরি করবে, তা চিন-পাকিস্তান আশা করেনি।
উল্লেখ্য, কৌশলগত দিক থেকে চাবাহার ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে আর পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক জোরদার করতেই ইরানের চাবাহারে সমুদ্রবন্দর গড়ে তুলেছিল ভারত। দিয়েছিল মোট ৫০ কোটি ডলার।
