ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয়। তা অনায়াসে মিলিয়ে দিতে পারে ১৯৬১ ও ২০২৬ সালকে! গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার আগেই কিউবাতে কমিউনিস্ট সরকারের পতন চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যা মনে করিয়ে দিচ্ছে গত শতকের ছয়ের দশকের একদম শুরুর দিকের কথা। মার্কিন মসনদে তখন জন এফ কেনেডি।
৩৫তম প্রেসিডেন্ট মারা যাবেন আর বছর দুয়েক বাদেই। ডালাসে মোটর শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার সময় দূরের বহুতল থেকে আততায়ীর তপ্ত বুলেট ফুঁড়ে দেয় তাঁর শরীর। কেনেডির এই মর্মান্তিক পরিণতিই এরপর থেকে তাঁর সম্পর্কে মানুষের প্রথম স্মারণিক হয়ে রয়েছে। অথচ চাঁদে নভশ্চর পাঠানোর প্রথম ঘোষণা তিনিই করেছিলেন। পাশাপাশি কিউবায় চালিয়েছিলেন 'বে অফ পিগস ইনভেশন'। কেননা তাঁর মাথাব্যথা হয়ে উঠেছিল কিউবার নতুন সরকার। ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর গেরিলা বাহিনী একনায়ক জেনারেল ফুলগেনসিও বাতিস্তাকে গদি থেকে উৎপাটন করতে পেরেছিলেন! এটাই সহ্য হচ্ছিল না কেনেডির। কেননা আমেরিকার 'পুতুল' হয়ে সেদেশের সরকার চালাচ্ছিলেন বাতিস্তা। তাই কাস্ত্রোকে যেনতেনপ্রকারেণ সরিয়ে দিতে মরিয়া ছিলেন কেনেডি। কিন্তু তাঁর সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। মুখ থুবড়ে পড়ে 'বে অফ পিগস ইনভেশন'। হার মেনে নিয়েছিলেন কেনেডি। সব দায় নিয়েছিলেন নিজেরই কাঁধে। বলেছিলেন, ''একটা প্রবাদ রয়েছে, জয়ের একশো বাবা থাকে। কিন্তু পরাজয় অনাথ। আমিই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার।''
ফিদেল কাস্ত্রো
কেন শক্তিশালী আমেরিকার পক্ষে এঁটে ওঠা সম্ভব হয়নি? সেকথা বলতে গেলে আগে সেই সময়টাকে চিনে নেওয়া দরকার। সেটা ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। সোভিয়েত ইউনিয়ন (তখনকার রাশিয়া) এবং আমেরিকার মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব তখন চলছে পুরোদমে। এর মধ্যেই আমেরিকার নজর গেল 'উঠোনে'। ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের মাধ্যমে ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় এসেছেন। ক্ষমতায় থাকা মার্কিনপন্থী স্বৈরশাসক জেনারেল বাতিস্তাকে হটিয়ে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করে দিয়েছেন তিনি ও তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রো। আর সেই সঙ্গেই কিউবায় থাকা মার্কিন মালিকানাধীন সম্পত্তি ও কারখানাগুলো জাতীয়করণ করে ফেলেছেন। চিনির কল থেকে খনি, হোটেল সবই ছিল মার্কিন ব্যবসায়ীদের দখলে। কাস্ত্রো ক্ষমতায় এসে পুরো ছবিটা পালটে দিলেন। এবং দ্রুত। ব্যাপারটা আমেরিকার ভালো লাগার কথা নয়। লাগেওনি। ভালো লাগেনি বহু ধনী ও জোতদার কিউবানেরও। তাঁরাও মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেন দেশের বামপন্থী সরকারকে। ফলে মাত্র ৯০ মাইল দূরের ফ্লোরিডায় পাড়ি জমালেন তাঁরা।
এদিকে এখানেও ঢুকে পড়ল সোভিয়েতরা! কাস্ত্রো ক্রমেই তাদের আরও কাছে চলে গেলেন। অস্ত্র কিনলেন সেদেশ থেকে। কিউবার পড়ুয়ারা স্বল্পমূল্যের শিক্ষা পেতে মস্কোয় গেলেন। কেনেডি দেখলেন উঠোনে বামপন্থী এক দেশ, যাদের সঙ্গে ইউএসএসআরের গলায় গলায় 'বন্ধুত্ব'। সুতরাং কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু অন্য দেশের ব্যাপারে নাক গলানোয় ততদিনে আমেরিকার রীতিমতো 'বদনাম' বিশ্বজুড়ে। সেটা কোরিয়ার যুদ্ধ হোক, কিংবা গুয়াতেমালা অথবা লেবানন- বারবার ওযাশিংটন তাদের ল-অ-অ-অ-ম্বা নাক গলিয়ে ফেলেছে। কাজেই আমেরিকাকে ভাবতে হল অন্য পথ। সোজাসুজি নয়, বরং আড়াল থেকে। তখনও অবশ্য ক্ষমতায় আসেননি কেনেডি। মসনদে প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার। যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন সেনাবাহিনীর জেনারেল ছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি সিআইএ-কে নির্দেশ দিলেন, কী করে কাস্ত্রোকে গদিচ্যুত করে নিজেদের 'শিবিরের লোক'কে মসনদে বসানো যায় তার পরিকল্পনা করতে। ফ্লোরিডার মায়ামিতে সিআইএ নির্বাসিত কিউবানদের নিয়োগ করল। এই 'বিদ্রোহী'রা চাইছিলেন নিজেদের দেশ ফেরত পেতে। আমেরিকা তাঁদের বন্দুক দিল, বোট দিল। গুয়াতেমালায় ও নিকারাগুয়ায় গোপন শিবিরে প্রশিক্ষণও দিল। সব মিলিয়ে ১৪০০ যোদ্ধার এক দল। নাম দেওয়া হল ব্রিগেড ২৫০৬। তাদের লক্ষ্য ছিল কিউবার বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলা চালানো। এবং সেই সঙ্গেই কিউবার ভূমিতে ঢুকে পড়ার।
বে অফ পিগস ইনভেশন
'বে অফ পিগস ইনভেশন' কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল শেষমেশ। যার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল গোয়েন্দাদের তুমুল ব্যর্থতা। ততদিনে মার্কিন মসনদে কেনেডি। তাঁর কাছে খবর ছিল, কিউবার জনতা কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে সহজেই তেতে উঠবে। কিন্তু সিআইএ এমন বললেও এই ধারণা ছিল সর্বৈব ভুল। কাস্ত্রো ছিলেন সাধারণ কিউবানদের 'হিরো'। দরিদ্র কৃষকদের জমি দেওয়া এক নায়ক। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে জনগণেশকে প্ররোচিত করা মোটেও সহজ ছিল না। এই মোক্ষম ভুলটাই করেছিলেন কেনেডি। দ্বিতীয়ত, যখন আকাশপথে বিমান দিয়ে সাহায্য করতে রাজি ছিলেন না কেনেডি। খাদ্য ও বুলেটের অভাবও ছিল একটা কারণ। তার উপরে যে পথে প্রবেশ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল সেটাও ছিল ঘন জলাভূমি। সবচেয়ে বড় কথা শত্রুকে যে কখনও লঘু করে দেখতে নেই, এই চরম আপ্তবাক্যটিই ভুলে বসেছিলেন কেনেডি। ফল ভুগতে হয়েছিল সেই কারণেই। একই ভুল সম্প্রতি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
এই প্রসঙ্গে বলতেই হয় 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস'-এর কথা। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ও হামলার আশঙ্কায় সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবার সুরক্ষার জন্য গোপনে সেখানে পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৩ দিনব্যাপী এক অচলাবস্থার পর কিউবায় আক্রমণ না করার বিষয়ে মার্কিন প্রতিশ্রুতির পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। হাঁফ ছাড়ে বিশ্ব। অনেকেই সেই সময় বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা করেছিলেন। তবে সোভিয়েতের মদতে সেবারও আমেরিকাকে নাকানি চোবানি খাইয়ে ছেড়েছিল কিউবা।
জন এফ কেনেডি
পরবর্তী সময়েও পরিস্থিতি বিশেষ উন্নতি হয়নি। কিন্তু নয়ের দশকে সোভিয়েতের পতনের পর কিউবাকে প্রবল সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। ব্যাপক আর্থিক চাপ ছিল দেশটার উপরে। কিন্তু শেষপর্যন্ত মার্কিনীদের কাছে নতিস্বীকার করেনি তারা। এত বছর পেরিয়ে এসে এবার ট্রাম্পের রক্তচক্ষুর সামনে ফের কিউবা। রাজনৈতিক মহলের দাবি, ট্রাম্প আসলে প্রমাণ করতে চাইছেন যে তাঁর শাসনকালে আমেরিকার ঘোষিত শত্রুদের অন্তত একজনের স্থায়ী নিষ্পত্তি হয়েছে। কিউবায় কমিউনিস্ট সরকারের পতন হলে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন বড়সড় ধাক্কা খাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে পুরো পশ্চিম গোলার্ধে একচেটিয়া দখল প্রতিষ্ঠা হবে আমেরিকার। কিন্তু ইতিহাস বলছে কিউবা বরাবরই লড়াই করে নিরস্ত করতে পেরেছে সাম্রাজ্যবাদের থাবা। এবার যা ঘটবে তা চোখের সামনেই। তবে আপাতত ইতিহাসের সাক্ষ্য যে কিউবাকে বুকে বল দিচ্ছে তা মানতেই হবে।
