shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

আন্দোলন ‘খবর’ হচ্ছে না, কলকাতায় বাসের টায়ার-ট্রাম পুড়িয়ে হেডলাইনে এসেছিল বিজেপি!

সিপিএম তখন ক্ষমতায়। রাহুল সিনহার ইচ্ছে হল যে, তিনিও একটা আন্দোলন সংগঠিত করবেন। বঙ্গভোটের ইতিহাসে আজ পর্ব ৭।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 12:45 PM Mar 18, 2026Updated: 03:05 PM Mar 18, 2026

৬ নম্বর, মুরলীধর সেন লেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের কাছেই এই পুরনো বাড়িটি বিজেপির সদর কার্যালয়। গলি দিয়ে ঢুকে এ বাড়ির দিকে তাকালে মনে হয় কত দশকের স্মৃতি বহন করে চলেছে সে। ১৯৪৬ সালে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যখন জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবছেন, সেই সময় তিনি সংগঠনের কাজকর্ম করার জন্য এই বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন।

Advertisement

জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, এই মুরলীধর সেন লোকটি কে ছিলেন? যাঁর নামে এই রাস্তা। জানা যায়, মুরলীধর সেন ছিলেন কলকাতার একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। উনিশ শতকে যাঁরা কলকাতায় বসবাস করতেন এবং সমাজসেবা মূলক কাজ করতেন, মানুষদের উপকার করতেন – মুরলীধর সেন তেমনিই একজন মানুষ ছিলেন।

১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর শ্যামাপ্রসাদবাবু জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু এ বাড়িটা তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। এটি ছিল তাঁর নিজের অফিসবাড়ি। কেননা, তিনি ১৯৪৬ সালে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবেননি। তবে ’৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই জহরলাল নেহরুর সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য, উদ্বাস্তু সমস্যা, কাশ্মীর সমস্যা – নানা বিষয়ে গড়ে উঠেছিল বিতর্ক। হয়তো তিনি মনে মনে অনেকদিন থেকেই একটা পৃথক দল গড়ার কথা ভেবেছিলেন।

কলকাতায় ৬, মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির আদি সদর দপ্তর।

এখন এই বাড়িটিতে বিজেপির সর্বভারতীয় বৃদ্ধির তুলনায় অনেকটা ছোট মনে হয়। পুরনো, খুব স্যাঁতসেঁতে ঘর, খুব সরু একটা সিঁড়ি। যেমনটা উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়িগুলোতে হত। কিন্তু যতই পুরনো বাড়ি হোক, ওই সিঁড়ি দিয়ে অটলবিহারী বাজপেয়ী থেকে শুরু করে লালকৃষ্ণ আডবাণী – কে না দোতলায় উঠেছেন? ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি নিজেও এই দলের অফিসে এসেছিলেন। তখনও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হননি।

কাজেই ৬ নম্বর, মুরলীধর সেন লেন একটি ‘প্রতীকী’ বাড়ি। একটি ঐতিহাসিক বাড়ি। যদিও এখন সল্টলেকে সেক্টর ফাইভে বিজেপির প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে। সেখানেই তৈরি করা হয়েছে নির্বাচনের রণকৌশল তৈরি করার জন্য ওয়াররুম। ২০২৩ সালে এই স্থানান্তর হয়তো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন সাধনের জন্য। যেমন দিল্লিতে অশোক রোড থেকে আজ বিরাট অত্যাধুনিক অট্টালিকা নির্মাণ হয়েছে দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে। যেখানে হয়েছে বিজেপির নতুন কার্যালয়।

জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, এই মুরলীধর সেন লোকটি কে ছিলেন? যাঁর নামে এই রাস্তা। জানা যায়, মুরলীধর সেন ছিলেন কলকাতার একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। উনিশ শতকে যাঁরা কলকাতায় বসবাস করতেন এবং সমাজসেবা মূলক কাজ করতেন, মানুষদের উপকার করতেন – মুরলীধর সেন তেমনিই একজন মানুষ ছিলেন। এহেন মুরলীধর সেনের বাড়িটি অবশ্য ‘পরিত্যক্ত’ নয়। সল্টলেকে ওয়াররুম তৈরি হলেও এই বাড়িটিতে এখন বিজেপির অত্যাধুনিক আইটি সেলের অফিস তৈরি হয়েছে। এই গলিতে ঢুকলেই নির্বাচনী রাজনীতির উত্তেজনা টের পাওয়া যায়। চারদিকে বিজেপির ব্যানার, পোস্টার, মোদি-অমিত শাহের ছবি। এসবই আজকের কথা।

একদিকে যখন কলকাতা পুরসভার সামনে বিজেপি কর্মীদের আবির খেলা চলছে, মনে হচ্ছে যেন কমিউনিস্ট শাসনে বিজেপি আঘাত হেনেছে। মুরলীধর সেন লেনেও চলছে আবির খেলা। আবার দিল্লির অশোক রোডে বসে লালকৃষ্ণ আডবাণী বিবৃতি দিলেন, ‘কলকাত্তা মে বিজেপিকা খাতা খোলা হ্যায়।’

আমরা কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে চেপে চলে এলাম কলকাতা পুরসভায়। মেয়র কমল বসু। কলকাতা পুরসভার নির্বাচন সদ্য সমাপ্ত। ভোটের রেজাল্ট বেরিয়েছে। বিজেপির কলকাতার কোনও ওয়ার্ডে কোনও কাউন্সিলর ছিল না। সেবার দু’টি ওয়ার্ডে জিতল বিজেপি। আর বিজেপির সেই দু’জন কাউন্সিলর জেতায় কলকাতা পুরসভায় গিয়ে দেখি আবির খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপির কর্মীদের কী উচ্ছ্বাস! ‘বিজেপি প্রথম কলকাতা পুরসভায় জিতেছে ভাই, জিতেছে’ বলে কর্পোরেশনের সামনে বিজেপির কর্মীরা নাচছে।

একদিকে যখন কলকাতা পুরসভার সামনে বিজেপি কর্মীদের আবির খেলা চলছে, মনে হচ্ছে যেন কমিউনিস্ট শাসনে বিজেপি আঘাত হেনেছে। মুরলীধর সেন লেনেও চলছে আবির খেলা। আবার দিল্লির অশোক রোডে বসে লালকৃষ্ণ আডবাণী বিবৃতি দিলেন, ‘কলকাত্তা মে বিজেপিকা খাতা খোলা হ্যায়।’ এভাবে বিজেপি তার যাত্রা শুরু করেছিল যখন, বাজপেয়ী-আডবাণী দিল্লিতে বিজেপিকে অনেক দূর নিয়ে গিয়েছেন। কংগ্রেসের উপর আঘাত হেনেছে বিজেপি। সেই জায়গা থেকে আজ বিজেপি ধাপে ধাপে বহু দূর অগ্রসর হয়েছে। বিজেপি আজ প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে। সিপিএমকে সরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতাসীন হয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর দখল করেছে বিজেপি। কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরিসর মমতা সবটাই নিয়ে নিয়েছেন। কার্যত কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক শতকরা ৫ ভাগে পর্যবসিত হয়েছে। আর সিপিএম এমন ধাক্কা খেয়েছে যে, এখনও উঠে দাঁড়াতে পারেনি। বিধানসভায় কংগ্রেস এবং সিপিএমের একটা বিধায়কও নেই।

৩৪ বছরের বাম শাসনের পতন ঘটিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।

১৯৮৪ সাল। আমি তখন কলকাতায় সাংবাদিকতা করছি। বিজেপির সর্বভারতীয় নেতা কেদারনাথ সাহানি কলকাতায় এসেছেন। কেদারনাথ সাহানি ছিলেন পাঞ্জাবের নেতা। আরএসএস করা লোক। দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। কাশ্মীরের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক কর্তা। কোনও একটা সভায় যোগ দিতে তিনি কলকাতায় এসেছেন। আমি বড়বাজারে কোনও একটি বাড়িতে, যেখানে কেদারনাথ সাহানি উঠেছিলেন সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি হয়েছিলেন। এই বাড়ুজ্যে মশাই হাওড়ায় থাকতেন। সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় খুবই সজ্জন, সৎ, নিপাট ভালমানুষ। ধুতি পরতেন। ওই মুরলীধর লেনের দোতলায় সভাপতির একটা ছোট্ট ঘর ছিল। তিনি তখন সেখানে বসতেন। আর স্বপ্ন দেখতেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একদিন আরও বড় দলে পরিণত হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একদিন ক্ষমতাসীন হবে।

বড়বাজারে এক মাড়োয়ারি বিজেপির শুভানুধ্যায়ী ব্যবসায়ীর বাড়ি। সেই প্রথম উত্তর কলকাতার বসবাসকারী কোনও মাড়োয়ারির বাড়িতে গেলাম। বহু পুরনো বাড়ি। প্রায় ১০০ বছরের পুরনো হলেও বিস্মিত হব না। কালো পাথরের দেওয়াল। তাতে সুন্দর রং করা, টিপটপ সাজানো বাড়ি, পাথরের সিঁড়ি। ভিতরে একটু আলো কম, দিনের বেলাতেও লাইট জ্বালাতে হয়। বিরাট একটা ঘর, সেখানে সাদা ধবধবে ফরাস পাতা, অনেক তাকিয়া পাতা আছে। এই সাদা ফরাসের ওপর কেদারনাথ সাহানি বসে ছিলেন। আমি ওঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির কেন প্রয়োজন, সেটা ১৯৮৪ সালে কেদারনাথ সাহানি আমাকে বুঝিয়েছিলেন। তখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কার্যত কোনও অস্তিত্বই নেই। কিন্তু কেদারনাথ সাহানি বলেছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য। আরএসএসের একটা সমর্থক গোষ্ঠী আছে। মাড়োয়ারি সম্প্রদায়, গুজরাটি সম্প্রদায়, হিন্দিভাষী সম্প্রদায় কলকাতায় বসবাস করছেন বহু বহু দশক ধরে।

সত্যি কথা বলতে কী, ব্রিটিশ জমানায় মাড়োয়ারিরা রাজস্থান থেকে কলকাতায় চলে এসেছিল ব্যবসা করবে বলে। সেই কলকাতায় আসা মাড়োয়ারিদের ইতিহাস পড়তে গিয়ে জানা যায় যে, তারা গরুর গাড়ি করে কলকাতায় এসেছিল। রেল পত্তনের আগে গরুর গাড়িতে চেপে ঘর-সংসার সেখানে রেখে তারা কলকাতায় এসেছিল ব্যবসা করবে বলে। ঠিক কতদিন লেগেছিল জয়পুর থেকে কলকাতা পৌঁছতে, তার কোনও আন্দাজ অবশ্য দিতে পারব না। আপাতত কল্পনার অ্যাম্বাসাডরে করে হুস করে কেদারনাথ সাহানির কাছ থেকে চলে এলাম সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।

বলতে পারেন কে এই সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়?

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি হয়েছিলেন। এই বাড়ুজ্যে মশাই হাওড়ায় থাকতেন। আমি ওঁর বাড়িতেও গিয়েছিলাম। সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় খুবই সজ্জন, সৎ, নিপাট ভালমানুষ। ধুতি পরতেন। ওই মুরলীধর লেনের দোতলায় সভাপতির একটা ছোট্ট ঘর ছিল। তিনি তখন সেখানে বসতেন। আর স্বপ্ন দেখতেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একদিন আরও বড় দলে পরিণত হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একদিন ক্ষমতাসীন হবে। সেই সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানুষ সেইভাবে অতটা চিনত না। তখন সোশাল মিডিয়ার যুগ নয়। কোনও রিল-হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মাঝেমাঝেই লিখিত বিবৃতি দিতেন। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে সেটা প্রকাশিত হত না।

বঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি

কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপির তখন শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে। আর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে শ্রীবৃদ্ধির জন্য পশ্চিমবঙ্গের এই বিজেপি নেতারা আহ্লাদিত। তাঁরা দিল্লি ভাঙিয়ে সেদিন থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে উৎসাহী। সেই সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অনেক সভাপতি হয়েছে। কিন্তু কোনও নির্বাচনেই বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারেনি। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে বাজপেয়ী-আডবাণী দলের সভাপতি করেছিলেন। কাজেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তিলতিল করে বেড়েছে।

সেভাবে দেখতে গেলে শতকরা ভোট বাড়াতে পারলেও বিজেপি এতদিনেও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কখনও ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস বিদায় নিয়ে বামফ্রন্ট এসেছে। তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এসেছে। কিন্তু অন্য কোনও দল সেই পরিসরটি পায়নি।

২০২১ সালে বিজেপির শতকরা ভোট হয়েছিল ৩৮.১৪ ভাগ। অথচ এই বিজেপিই আটের দশকে ভোট পার্সেন্টেজ ছিল ০.৫১-এর মত। ১৯৯১ সালের পর থেকে বিজেপির শতকরা ভোট বাড়তে লাগল। মনে রাখতে হবে সেই সময় নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী হলেন। বাবরি মসজিদ ভাঙা হল। রামমন্দির আন্দোলন তীব্র হল। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, মণ্ডল কমিশন করা এবং তারপর কমণ্ডলুর রাজনীতি। এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বিজেপি কংগ্রেস বিরোধিতার যে রাজনৈতিক পরিসর, তা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দখল করল। কিন্তু সেভাবে দেখতে গেলে শতকরা ভোট বাড়াতে পারলেও বিজেপি এতদিনেও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কখনও ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস বিদায় নিয়ে বামফ্রন্ট এসেছে। তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এসেছে। কিন্তু অন্য কোনও দল সেই পরিসরটি পায়নি।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও। ফাইল ছবি

কল্পনার এই সাদা অ্যাম্বাসাডর আমাকে নিয়ে যাচ্ছে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীর কাছে। বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে দু-দু’বার রাজ্য সভাপতি হয়েছিলেন। বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীর সঙ্গে আমার একটা ভালো সখ্য গড়ে উঠেছিল। মাস্টারমশাই ছিলেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরও তিনি মাস্টারমশাই। কারণ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের পণ্ডিত। অটলবিহারী বাজপেয়ীর কবিতার বই বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। সবসময় লেখাপড়া করতেন। ছোটবেলা থেকে আরএসএস করেছেন। জেপি মাথুর ওঁর খুব বন্ধু। দিল্লিতে রাজেন্দ্র প্রসাদ মার্গের একটা বাংলোয় জেপি মাথুর এবং বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী – দু’জনে একই ঘরে থাকতেন। আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম তখন এই প্রবীণ আরএসএস নেতাদের জীবনধারণ আর পার্কসার্কাসে কমিউনিস্ট কমিউনে অনেক প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা যেমন আবদুল্লাহ রসুলদের জীবনপ্রণালী – একইরকম লাগত। পুরনো মূল্যবোধ ছিল। আবদুল্লাহ রসুলকে দেখতাম খালি গায়ে একটা সাদা লুঙ্গি বুকের কাছে গিঁট বেঁধে বিছানায় বসে। টেবিলটাকে বিছানার সামনে রেখে বইয়ের পাতায় নিমগ্ন। সন্ধেবেলায় সামান্য একটা বদল। একটা টেবিলল্যাম্পের আলো এসে পড়ত সেই বইয়ের উপর। তিনি একইরকম নিমগ্ন।

রাহুল সিনহাকে কেন্দ্র করে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। সিপিএম তখন ক্ষমতায়। রাহুল সিনহার ইচ্ছে হল যে, তিনিও একটা আন্দোলন সংগঠিত করবেন। রাহুল সিনহার নেতৃত্বে রীতিমতো বাসের টায়ার জ্বালিয়ে দেওয়া এবং ট্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। ধর্মতলায় এসব সংঘাত, সংঘর্ষ, বিদ্রোহ সেই সময় হয়েছিল। আডবাণীজির সেই সংঘাত কিন্তু পছন্দ হয়নি। কারণ এইরকম হিংসাত্মক পথে বিজেপি কেন যাচ্ছে, এইসব প্রশ্ন উঠেছিল।

দিল্লিতে রাজেন্দ্র প্রসাদ মার্গের বাড়িতে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী আর জেপি মাথুরকেও দেখতাম, এককোণে কোনওরকম ভাবে থাকতেন তাঁরা। পড়াশোনা করতেন খুবই। বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী তো এমনিতেই মাস্টারমশাই। পশ্চিমবঙ্গে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী কিন্তু দু-দু’বার রাজ্য সভাপতি হয়েছিলেন। পরে যখন জনসংঘ প্রতিষ্ঠা হল এবং তা থেকে যখন বিজেপি হল, তখন প্রথম রাজ্য সভাপতি হয়েছিলেন হরিপদ ভারতী। বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে লালকৃষ্ণ আডবাণী একটা সময় সরিয়ে দিয়ে তপন সিকদারকে রাজ্য সভাপতি করলেন। লালকৃষ্ণ আডবাণী যে তপন সিকদারকে খুব পছন্দ করতেন, তা নয়। কিন্তু বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী তাঁদের খুব ঘনিষ্ঠও ছিলেন। পরবর্তীকালে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে সরিয়ে তপন সিকদারকে যখন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির রাজ্য সভাপতি করা হল তখন আমি আডবাণীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘আপনি বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে সরিয়ে তপন সিকদারকে কেন রাজ্য সভাপতি করলেন? বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী তো আপনার খুব ঘনিষ্ঠ।’’ আডবাণীজী বলেছিলেন, ‘‘দেখ, পশ্চিমবাংলায় নির্বাচন করতে গেলে আর বিজেপিকে বাড়াতে গেলে একটা জিনিস আমি বুঝেছি যে, ‘শাস্ত্রী’ পদবি দিয়ে বিজেপিকে বাড়ানো কঠিন, উনি যতই ভালো মানুষ হন না কেন। সেজন্য আমাদের একজন ‘বাঙালি’ সভাপতি দরকার। আর যাই হোক, তপনের মধ্যে বাঙালিয়ানা ভরপুর।’’

একথা ঠিক, তপন সিকদার কিন্তু একদম মাছে-ভাতে বাঙালি ছিলেন। তিনি খেতে ভালোবাসতেন, খাওয়াতে ভালোবাসতেন। দিল্লিতে মন্ত্রী হয়ে যখন ছিলেন তখনও আমাদের দিল্লির সাংবাদিকদের মাঝেমাঝেই তপনবাবুর বাড়িতে পিকনিক হত। নানারকম মাছের পদ দিয়ে রান্না হত এবং দেদার খাওয়াতেন।

আটের দশকে দমদম থেকে তপন সিকদার আর কৃষ্ণনগর কেন্দ্র থেকে সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় লোকসভায় বিজেপির দু’জন সাংসদ হয়েছিলেন। ফাইল ছবি

সেইসব দিনের কথা এখনও মনে পড়ে। এমনকী, সেবারের দমদম থেকে আর কৃষ্ণনগর কেন্দ্র থেকে জলুদা – অর্থাৎ সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় লোকসভায় বিজেপির দু’জন সাংসদ হয়েছিল। দমদমে তপন সিকদারের জিতে যাওয়াও এক ঐতিহাসিক ঘটনা! জলুদা এবং তপন সিকদার – দু’জনেই নির্বাচনে জিতলেন এবং দু’জনেই মন্ত্রী হলেন। কিন্তু তাঁদেরকে রাজ্যসভার মন্ত্রী করা হল। ক্যাবিনেটে তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী হয়ে এলেন। রাহুল সিনহাও বেশ কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির রাজ্য সভাপতি ছিলেন। তিনি মুরলীধর লেনে বসতেন।

রাহুল সিনহাকে কেন্দ্র করে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। সিপিএম তখন ক্ষমতায়। রাহুল সিনহার ইচ্ছে হল যে, তিনিও একটা আন্দোলন সংগঠিত করবেন। রাহুল সিনহার নেতৃত্বে রীতিমতো বাসের টায়ার জ্বালিয়ে দেওয়া এবং ট্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। ধর্মতলায় এসব সংঘাত, সংঘর্ষ, বিদ্রোহ সেই সময় হয়েছিল। আডবাণীজির সেই সংঘাত কিন্তু পছন্দ হয়নি। কারণ এইরকম হিংসাত্মক পথে বিজেপি কেন যাচ্ছে, এইসব প্রশ্ন উঠেছিল। রাহুল সিনহা দিল্লিতে আসলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। রাহুল সিনহা বলেছিলেন, ‘‘দেখুন আডবাণীজি, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সংস্কৃতিটা একটু আলাদা। ওখানে এতদিন নীরবে যে এত আন্দোলন করেছি কোনও প্রচার হয় না, কোনও গুরুত্বও পায় না। কিন্তু আমাদের কর্মীরা বাসের দুটো টায়ার জ্বালিয়েছে – সেটা সমস্ত খবরের কাগজে হেডলাইন হয়ে গিয়েছে। এতটাই প্রচার হয়েছে যে, আপনার মনে হচ্ছে কী কাণ্ডই না একটা হয়ে গিয়েছে।’’

বর্তমানে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহা। ফাইল ছবি

এটাই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বৈশিষ্ট্য। কী করা যাবে? সুতরাং কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হবে। এই ঘটনাটা আমার এখনও খুব বেশ মনে পড়ে। এখনও প্রশ্ন এই যে, বিজেপিরও বিরোধী দল হিসেবে বাড়ছে। কিন্তু যে-রাজনীতি এবং সংস্কৃতি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসতে চাইছে বা যে-ধরনের আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে, সেটা কিন্তু ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে বিজেপি সেভাবে করে না।

ভোটের আগে অটলবিহারী বাজপেয়ীও কলকাতায় এসে জনসভা করেছিলেন। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। রাজভবনে এসে উঠতেন। আমি বাজপেয়ীজির সঙ্গে কলকাতা এলাম। মনে আছে, ধর্মতলাতে জনসভা হল। তখনও তিনি আজকে যেমন নরেন্দ্র মোদি পরিবর্তনের কথা বলেন, অটলবিহারী বাজপেয়ীও বক্তৃতা দিতেন আর পরিবর্তনের কথা বলতেন। পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন প্রয়োজন। সিপিএমকে সরানো প্রয়োজন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অটল বিহারী বাজপেয়ীর সুসম্পর্ক ছিল। ফাইল ছবি

সেদিন সেই জনসভাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকতেন না। কারণ সেটা এনডিএ-র জনসভা ছিল না। ছিল বিজেপির জনসভা। মমতা এবং বিজেপির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত ছিল। বিশেষ করে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর মমতা প্রতিবাদী ছিলেন। মমতা যখন এনডিএ-তে যোগ দিয়েছিলেন তখনও কিন্তু তাঁর শর্ত ছিল ৩৭০, বিভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং রামমন্দির নির্মাণ - এই তিনটে নিয়ে বিজেপি কোনওরকম কিছু করতে পারবে না। শিকেয় তুলে রাখতে হবে। সেই কারণে সেই সময় বিজেপির যে এনডিএ-র কর্মসূচি সেটাই নির্বাচনী ইস্তেহার হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, এগুলো আমাদের এজেন্ডা। কিন্তু বিজেপি যেহেতু নেই, এনডিএ সরকার গড়েছে, সেই জন্য আপতত এই তিনটে বিষয়কে বিজেপি শিকেয় তুলে রাখছে।

সেই শিকেয় তুলে রাখার রাজনীতিতে সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবথেকে সক্রিয় ছিলেন। বিজেপিকে দিয়ে সেটা করতে দেননি।

কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চড়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ইতিহাসে বিজেপির সেদিন আর আজ, একঝলকে দেখে নিলাম কিন্তু।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement