shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

প্রথমবার বারাঙ্গনাদের প্রতিনিধি হয়ে ভোটের প্রার্থী!

১৯৯১ সালে লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির জি বি রোড থেকে নিম্মিবাঈ নিজেকে বারাঙ্গনাদের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে চাঁদনি চক কেন্দ্রে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান। বঙ্গভোটের ইতিহাসের আজ পর্ব ৮।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 05:58 PM Mar 26, 2026Updated: 06:43 PM Mar 26, 2026

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে ভর্তৃহরি ‘নীতিশত’কে রাজনীতিকে বারবনিতার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সত্যানৃতা চ পুরুষা প্রিয়বাদিনী চ হিংস্রা দয়ালুরপি চার্থপরা বদান্যা। নিত্যবায়া প্রচুরনিত্যধনাগমা চ বারাঙ্গণের নৃপনীতিরনেক রূপা।’ এর অর্থ হল, বারবনিতার মতো রাজনীতির অনেক রূপ – কখনও সে সত্য, কখনও সে মিথ্যা, কখনও সে কঠোরভাষী, কখনও সে প্রিয়ভাষী, কখনও সে হিংস্র, কখনও সে দয়ালু, কখনও সে ধনলোভী, কখনও সে বদান্য, কখনও সে মিতব্যয়ী, কখনও প্রতিনিয়ত তার প্রভূত ধনাগম। আসলে বারবনিতার জীবনের সঙ্গে রাজনীতির তুলনা ভর্তৃহরি করলেও রাজনীতিতে বারবনিতাদের কিন্তু দেখা গিয়েছে খুব কম।‌

Advertisement

স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সালে একটা অভিনব সংযোজন হয়েছিল। সেবার লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির জি বি রোড থেকে নিম্মিবাঈ (বয়স ৫০ বছর) তাঁর অগুনতি বারাঙ্গনা বোনেদের কয়েকটি মানবাধিকারের দাবিতে চাঁদনি চক লোকসভা কেন্দ্রে তিনি নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা, নিম্মিবাঈ নিজেকে বারাঙ্গনাদের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়েই ভোটে এগিয়ে এসেছিলেন। প্রার্থী হিসেবে নিম্মিবাইকে কেউ বিশেষ পাত্তা না দিলেও তাঁর এই সৎ সাহস ও মনোবলে অনেকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন।‌

১৯৯১ সালের লোকসভা ভোটে দিল্লির চাঁদনি চক থেকে নিম্মিবাঈ নিজেকে বারাঙ্গনাদের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়েই ভোটে এগিয়ে এসেছিলেন। ফাইল ছবি

স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সালে একটা অভিনব সংযোজন হয়েছিল। সেবার লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির জি বি রোড থেকে নিম্মিবাঈ (বয়স ৫০ বছর) তাঁর অগুনতি বারাঙ্গনা বোনেদের কয়েকটি মানবাধিকারের দাবিতে চাঁদনি চক লোকসভা কেন্দ্রে তিনি নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা, নিম্মিবাঈ নিজেকে বারাঙ্গনাদের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়েই ভোটে এগিয়ে এসেছিলেন। প্রার্থী হিসেবে নিম্মিবাইকে কেউ বিশেষ পাত্তা না দিলেও তাঁর এই সৎ সাহস ও মনোবলে অনেকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন।‌

মহাশ্বেতা দেবী নিম্মিবাঈয়ের প্রশংসা করে সে-সময় লিখেছিলেন, ‘এই নির্বাচনে এমন একজন প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছেন যাঁর কথা বলছি বলেই অনেকের নৈতিকতায় ঘা লাগতে পারে, আবার অনেকে শিউরে উঠতে পারেন।’ আমি ভাবছি, এই নির্বাচনী সংবাদ, নারী-মুক্তিকামী সংগ্রামের প্রবক্তা নারী সংগঠনগুলোর কাছেও কেন নিম্মিবাঈ গুরুত্ব পেল না! এই প্রার্থী যে পেশায় জড়িত, সেই পেশা এবং পেশাজীবী মহিলাদের নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা, তদন্তমূলক রিপোর্ট লেখা তো মাঝেমাঝে হয়ে থাকে।‌ কিছুদিন‌‌ আগে এক ঝকঝকে সুদর্শন মহিলা একটা ম্যাগাজিনে এদের বিষয়টিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন বটে!

রাজনীতির কুখ্যাত ‘রেডলাইট’ এলাকার একটা বাড়ির চারতলার ছোট অন্ধকার ঘরে বসে নিম্মিবাঈ ভোটের সময় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কেন তিনি নির্বাচনে লড়ছেন। এক রোগা শীর্ণ তরুণী তাঁর রুগ্ন শিশুকে নিয়ে খেলাচ্ছিল। এবং সে সমানে কাশছিল।‌ তাকে দেখিয়ে নিম্মিবাঈ বলেছিলেন, ‘‘কেন‌ লড়ছি? সেটা কি দুর্বোধ্য? ওকেই দেখুন না। কে ওকে দেখবে এখন? ওর ঘরে তো লোক আসে না। ওকে আর ওর বাচ্চাকে দেখবে এমন লোক তো‌ ওদের রইল না।’’ সাংবাদিক সম্মেলনে নিম্মিবাঈ বলেছিলেন, ‘‘গোটা দেশের সমস্ত বারাঙ্গনার আমি প্রতিনিধিত্ব করছি এই ভোটে।’’

আসলে মুম্বই থেকে উদ্ধার করে এদের কখনও মাদ্রাজে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানোনো হয়। তারপরে সেসব সংবাদ আর ছাপা হয় না। আসলে রাজনীতির কুখ্যাত ‘রেডলাইট’ এলাকার একটা বাড়ির চারতলার ছোট অন্ধকার ঘরে বসে নিম্মিবাঈ ভোটের সময় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কেন তিনি নির্বাচনে লড়ছেন। এক রোগা শীর্ণ তরুণী তাঁর রুগ্ন শিশুকে নিয়ে খেলাচ্ছিল। এবং সে সমানে কাশছিল।‌ তাকে দেখিয়ে নিম্মিবাঈ বলেছিলেন, ‘‘কেন‌ লড়ছি? সেটা কি দুর্বোধ্য? ওকেই দেখুন না। কে ওকে দেখবে এখন? ওর ঘরে তো লোক আসে না। ওকে আর ওর বাচ্চাকে দেখবে এমন লোক তো‌ ওদের রইল না।’’ সাংবাদিক সম্মেলনে নিম্মিবাঈ বলেছিলেন, ‘‘গোটা দেশের সমস্ত বারাঙ্গনার আমি প্রতিনিধিত্ব করছি এই ভোটে।’’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আছে যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে রূপ-যৌবন চলে গেলে গণিকাদের ধাত্রীর কাজে, অর্থাৎ যাকে কেউ আর উপভোগার্থে অর্থ দেয় না, এমন গণিকাদাসীকে রন্ধনশালার কার্যেও সেসময় নিযুক্ত করা হত।

অথচ পৃথিবীর এই আদিম ব্যবসাকে আইনত স্বীকৃতি দিতে হবে – এই দাবি নিম্মিবাঈ তুলেছিলেন। আসলে ভারতীয় সমাজে ভোটের সময় এঁরা কিন্তু ‘ভোটার’। আমার এখনও মনে আছে, কলকাতায় সোনাগাছিতে ভোটের সময় অশোক সেন নির্বাচনী প্রচারে গেলেন।‌ তখন ছোট সোনাগাছি তাঁর নির্বাচন কেন্দ্রের অধীনে। খবরের দিক থেকে চিত্তাকর্ষক। তাই অশোক সেনের সঙ্গে সেবার আমি সেখানে গিয়েছিলাম। ওই ভোটাররা অশোক সেনকে বলেছিলেন, ‘‘ভোটে জিতলে যৌনকর্মীদের যাতে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেজন্য আপনাকে দায়িত্ব নিতে হবে।’’

সময় এগিয়ে গিয়েছে। যৌনকর্মীদের এখন ‘পতিতা’, ‘বেশ্যা’ না বলে ‘যৌনকর্মী’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়।‌ কিন্তু দলিতকে ‘দলিত’ না বলে ‘তফসিলি’ বললেই কি দলিতদের অধিকার অর্জন হয়? নির্বাচন কমিশনার খুব ব্যস্ত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে।‌ কিন্তু কলকাতার এই যৌনকর্মীদের পাড়াগুলোতেও প্রচুর ন্যায্য ভোটারের নামও বাদ গিয়েছে। অতীতেও ভোটের সময় এই এলাকায় বিভিন্ন সংগঠন তাঁদেরকে মবিলাইজ করে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে নিয়ে আসতেন। জেলায় জেলায় এঁদের উপস্থিতি অনেক। কিন্তু কলকাতায় নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকরাও এই এলাকাগুলিতে সক্রিয় হয়ে ভোটার তালিকা নিয়ে চিরকালই কাজ করেছেন।‌

আসুন, এবার নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করি। এর আগের নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে শাসকদলের যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এবারেও হচ্ছে। কিন্তু আমরা কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে এখন অতীতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের চেহারা দেখতে যাব। আসুন, আমার সঙ্গে।

আসলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাটা পণ্ডিত জহরলাল নেহরু প্রথম অনুধাবন করেন।‌ ‘নির্বাচন কমিশন’ নামক সাংবিধানিক সংস্থা তৈরির গুরুত্ব দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু অনুধাবন করে সুকুমার সেনকে প্রথম ‘নির্বাচন কমিশনার’ হিসেবে মনোনীত করেন।‌ ১৯৫০ সালে ‘ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’-এর গণিতের অধ্যাপক সুকুমার সেন এলেন। তিনি সেই গণিতজ্ঞ পণ্ডিত মানুষটিকে প্রথমে দায়িত্ব দেন। সুকুমার সেনের‌ দ্বিধা ছিল, তিনি এই কাজটা পারবেন কি না। নেহরুর এই বঙ্গসন্তানকে আরও পছন্দ হয়েছিল এই কারণে যে, তিনি সংখ্যাতত্ত্বের বিশারদ ছিলেন।‌ এত বড় দেশ, এত জনসংখ্যা। কোন‌ রাজ্যে কত জন ভোটার – অনেক অঙ্ক কষার ব্যাপার‌ ছিল। এখনও কোন রাজ্যে কত ভোটার? বৈধ ভোটার, অবৈধ ভোটার? সেখানে কোন রাজ্যে কত আশা, সামরিক বাহিনী যাবে? সেসব এখনও নির্বাচন কমিশনকে ঠিক করতে হয়।‌ এই যে বারবনিতাদের ভোটাধিকার নিয়েও আলোচনা, সেও কিন্তু শুরু করেছিলেন সুকুমার সেন নিজেই।

দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। ফাইল ছবি

ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১ সালে।‌ তখন তিনজন কমিশনারকে এই সাংবিধানিক সংস্থা দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। একজনই যথেষ্ট ছিল। ক্রমশ আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে যখন ভয়ংকরভাবে স্ট্রিট পলিটিক্সের অনুপ্রবেশ হল তখন বিভিন্ন দলের নেতাদের মৌরসিপাট্টা, শাসকদলের নিয়ন্ত্রণ – এসব এসে গেল।‌ হীরেন্দ্রনাথ দত্তের একটা রচনায় পড়েছিলাম, স্বাধীনতার আগে অনেক বেশি দায়িত্বসম্পন্ন ছিলাম।‌ তিনি বলেছিলেন, যখন স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম তখন স্বাধীনতাকে একটা ফালতু জিনিস মনে করতে শুরু করলাম। সেটাকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট কর্তব্যপরায়ণ হলাম না।

যাক সেসব দুঃখের কথা। ফিরে আসি‌ নির্বাচন কমিশনের আলোচনায়।

এর আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন‌ও হেরে গিয়েছিলেন।‌ মুখ্যমন্ত্রীদের পরাজয় যে কখনও হয়নি, তা কিন্তু নয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর নিজেরই মুখ্যসচিব মণীশ গুপ্তের কাছে পরাস্ত হয়েছেন।‌ তিনি বামফ্রন্ট আমলে মুখ্যসচিব ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে যোগ দেন। বিধায়ক হন।‌

২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ফাইল ছবি

নির্বাচন কমিশন আসলে একটা স্বয়ংশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা।‌ নির্বাচন কমিশনের সমস্ত কাজের নোডাল বিভাগ হচ্ছে কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকের মধ্য দিয়েই ঠিক হয় রাজ্যে কবে ভোট হবে? কীভাবে ভোট হবে? সেখানে কত আধাসামরিক বাহিনী যাবে? কীভাবে নির্বাচনটাকে শান্তিপূর্ণভাবে করা যায়? এইসব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকেই সমন্বয় রক্ষা করে করতে হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক রাজ্য সরকারের সঙ্গে এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেই কাজ করে।

সুকুমার সেন ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার’ হয়েছিলেন, ১৯৫০ সালের ২১ মার্চ। ১৯৫৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ আট বছর তিনি নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।‌ তখনও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিকভাবে সময়সীমা স্বীকৃত ছিল না। একটানা সেই সময় লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪৮৯। আর যেটা ৫৪৩। প্রথম ভোট হয়েছিল ১৯৫১-’৫২ সালে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখে। বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনের কাছে নির্বাচনের দিনক্ষণের প্রস্তাব জানায়। এই দিনে ভোট হলে ভালো হয়। নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে।‌ কারণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকেও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা বা অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী ভোটের আগে রাজ্য নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। রাজ্য নির্বাচন কমিশন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সুতরাং যে-সরকারটা বিদায়ী সরকার – সেটা কার্যত একটা তদারকি সরকারে পরিণত হয়। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রভূত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

আসলে সুকুমার সেন ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার’ হয়েছিলেন, ১৯৫০ সালের ২১ মার্চ। ১৯৫৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ আট বছর তিনি নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।‌ তখনও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিকভাবে সময়সীমা স্বীকৃত ছিল না। একটানা সেই সময় লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪৮৯। আর যেটা ৫৪৩। প্রথম ভোট হয়েছিল ১৯৫১-’৫২ সালে। সুকুমার সেন ১৮৮৯ সালে জন্মেছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন। তারপর তিনি অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করতে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে চলে যান।‌ উনি আইসিএস সার্ভিসে ১৯২১ সালে যোগ দেন। সেই সময় যে কোনও ভালো ছেলেরাই আইসিএস পরীক্ষা দিত।‌ তখন ব্রিটিশরাজ চলছে। তিনি কিছুদিন বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থাতেও কাজ করেছিলেন। হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যসচিবও।‌ সেই সময়ই তিনি নেহরুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৫৪ সালে ওঁকে 'পদ্মভূষণ'ও দেওয়া হয়েছিল। সুদানে দেশের ভোট পরিচালনা করতে গিয়েছিলেন। অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।

২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ – প্রত্যেকটা স্তরে অনেকরকম হিংসা প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয় বলে বিজেপি অভিযোগ তোলে।‌ রাজ্যে অতীতে নির্বাচনের পাশাপাশি ২০১৮-র রক্তক্ষয়ী পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীরা প্রত্যেকটা বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার আর্জি জানাতে শুরু করে।

এবার আমরা কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চড়ে চলে আসি ১৯৭২ সালে। ’৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক রিগিং, ছাপ্পা এবং হিংসা। পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হল, পশ্চিমবঙ্গ মানেই নির্বাচনী হিংসা। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভোটের যে-আবহ, তা ২০১৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল।‌ সেখানে একটা হিংসার পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। যে-নির্বাচনে ৩৪% আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ – প্রত্যেকটা স্তরে অনেকরকম হিংসা প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয় বলে বিজেপি অভিযোগ তোলে।‌ রাজ্যে অতীতে নির্বাচনের পাশাপাশি ২০১৮-র রক্তক্ষয়ী পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীরা প্রত্যেকটা বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার আর্জি জানাতে শুরু করে।

১৯৫২ থেকে ১৯৮৯ সাল – ব্যালট পেপারে গণনা।‌ মানুষ মূলত রেডিও সংবাদের মাধ্যমে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের ফল জানতে পারত। ১৯৭৭ থেকে কলকাতা দূরদর্শন ঘণ্টায় ঘণ্টায় নির্বাচনী সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। সেই সময় ইডেনের ক্রিকেট খেলায় যেমন কাঠের বোর্ড ব্যবহার করে স্কোর দর্শকদের জানানো হত, তেমনই দূরদর্শনের বোর্ডের নম্বর পরিবর্তন করে বিভিন্ন দলের ফলাফল দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হত।

টিএন শেষন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর একের পর এক ভোট সংস্কারের কাজ শুরু করে‌ন। তিনি এই সংস্কার এমন সাংঘাতিকভাবে করেছিলেন, সেটা এখন আমরা বুঝতে পারি। ১৯৯৯ সালে ব্যালট পেপারের বদলে তিনিই প্রথম ইভিএম অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে ব্যালট পেপার গণনার একটা ক্লান্তিকর কর্মযজ্ঞের পরিসমাপ্তি ঘটে। ভোট গণনায় শুরু হয় নতুন যুগ। ইভিএমে ভোটগণনা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এক একটা বিধানসভা বা লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফল মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাগরিকদের জানানো সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে বুথভিত্তিক ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার জন্য নতুন সমস্যাও উঠে আসে। কোন ‌দল কোন‌ বুথে হেরেছে বা কে জিতেছে, তার উপর ভিত্তি করে নতুন করে তৈরি হয় রাজনৈতিক আর জাতিগত দ্বন্দ্ব।

ইভিএমে ভোটগ্রহণের পরও অনেক রাজনৈতিক দল বলতে শুরু করে, এতেও কারচুপি সম্ভব।

১৯৮৯ সালে নির্বাচন‌ থেকে সারা দেশের ভোটগণনাকে লাইভ সম্প্রসারণ করার কাজও শুরু করেছিল দূরদর্শন।‌ ওই পর্যায়ে ব্যালট পেপারে ভোট হয়েছিল। ব্যালট পেপারে মিশ্রিত করে গণনার প্রক্রিয়া চলেছিল। ফলে গণনার সময়টাও আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কয়েক দিন ধরে দূরদর্শনে‌ লাইভ সম্প্রসারণের মাঝে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য সিনেমা পর্যন্ত দেখানো হত। এই প্রজন্মের ভোটাররা এটা ভাবতেই পারবেন না! পঞ্চাশোর্ধ্ব সব ভোটারের কাছে ১৯৮৯ সালে দীর্ঘ গণনাপর্ব, দূরদর্শনে লাইভ দেখানো, সিনেমা দেখার স্মৃতি এখনও আমার মতোই হয়তো সমুজ্জ্বল।‌

ইভিএম আসার পর, ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু তারপরই ইভিএম মেশিন নিয়েও শুরু হল সন্দেহ। অনেক দল বলতে লাগল, ইভিএম মেশিনে ভোটে রিগিং সম্ভব। কোনও কোনও দল দাবি জানাতে শুরু করল, ইভিএমে ভোটগণনার থেকে পুরোনো ব্যালটই ভালো। ২০১৭-এ উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরেও অধিকাংশ অ-বিজেপি দল দাবি তুলেছিল, যে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পেপার দিয়ে ভোট করানো হোক।

এখন নির্বাচনের গণনাকে কেন্দ্র করে একটা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলপ্রকাশের বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা যেমন ছিল, তেমনই ভিভিপ্যাটের স্লিপ গণনাকে কেন্দ্র করেও নানা বিতর্ক!‌

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন পুরনো ব্যালট পেপারে ফিরে যেতে নারাজ। এই অবস্থায় সমাধান সূত্র হিসেবে ইভিএমের সঙ্গে ভিভিপ্যাট যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভিভিপ্যাট যুক্ত হওয়ায় ভোটার যাকে ভোট দিয়েছেন, সেখানে ভোট পড়েছে কি না, ভোটার তা সরাসরি চাক্ষুষ করতে পারবেন।‌ ভিভিপ্যাটে যে-পাত্র থাকে, সেটা ভোটদানের পর প্রদত্ত ভোটের একটা ছোট স্লিপ ওখানে জমা হয়। বিরোধীদের দাবি ছিল যে, ভিভিপ্যাটের অন্তত ৫০ শতাংশ স্লিপ ইভিএমের পাশাপাশি ভোটগণনা করে দেখতে হবে। সেই দাবিতে প্রথমে দিল্লি হাইকোর্টে, পরে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট লোকসভার অন্তর্গত প্রতিটি বিধানসভার অন্তত পাঁচটা ভিডিপ্যাট নমুনা হিসেবে গণনা করে ভোটের ফলের সঙ্গে যাচাই করে দেখার কথা বলেছিল।

এখন নির্বাচনের গণনাকে কেন্দ্র করে একটা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলপ্রকাশের বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা যেমন ছিল, তেমনই ভিভিপ্যাটের স্লিপ গণনাকে কেন্দ্র করেও নানা বিতর্ক!‌

অতীতে নির্বাচন কমিশনের শুধু কলকাতাতেই নির্বাচন পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হত। কারণ কলকাতায় যৌনকর্মীদের ভোটাধিকারের সমস্যা থেকে শুরু করে মশা, মাছি, কুকুর, জমিজমা, বাড়িঘর নিয়ে দুর্নীতি যুগ যুগ ধরেই। হক সাহেবের বাজারেও (আজকের নিউ মার্কেট) দুর্নীতি নিয়ে সেই সময়কার সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।‌ আমরা নির্বাচন কমিশনের বর্ধিত ক্ষমতা দেখছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন দুম করে আজকের এই নির্বাচন কমিশনে পরিণত হয়নি। টিএন শেষন প্রথম জেলাশাসক বদলি করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, নির্বাচন কমিশনের কিন্তু ক্ষমতা আছে ভোটের সময় জেলাশাসকদের বদল করার। আজ সেই নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement